প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

সত্যি, সত্যি, সত্যি...!



পল্লল ভট্টাচার্য


নববর্ষের গোড়ায় বাঙালির তিন সত্যির কথা। বলি ভাই, মিথ্যা ভাষণে আমার সায় নাই।

প্রথম সত্যি – তার 'খাই খাই'। সে সব কিছুই খায়, গেলে না কিছু। অনুরোধেও সে ঢেঁকি গেলে না। "জল খায়, দুধ খায়, খায় যত পানীয়" (সুকুমার)। আরো খায় 'ধোঁয়া', আর দেয় 'ধোঁকা'। শেষে খায় মার, যাতা, গুঁতো। "শিং নেই তবু নাম তার সিংহ/ ডিম নেই তবু অশ্বডিম্ব –" (গৌরীপ্রসন্ন)! এই ডিম্ব প্রসবে তার জুড়ি নেই।

ছুতো তার এক বড়ো খাবার। ছলছুতোয় যা নয় খাওয়ার তাও খায়। যেমন, হাওয়া। গায়ে হাওয়া লাগানো তার রোজকার অভ্যাস; 'হাওয়া বদলানো' পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা! পঞ্চবার্ষিক এখন বর্জিত; যাসব পরিকল্পনা তাসব ভোটের আগে আগে নেওয়া। শীত তার পছন্দ নয় বলে সে 'গরম হাওয়া'র পথে হাঁটে; মিছিলে সবার আগে তার মুখ ফোটে।

এই করে করে "...তার কৈশোর গেল, যৌবন গেল,/ এখন তার মাথার সব চুল সাদা, হাতের পাঁচ আঙুলে মাঘের শীত" (বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)। 'হাওয়ায় হাওয়ায়' এখন সে আর মৃদুমন্দ ছন্দের স্বাদ পায় না।

দ্বিতীয় সত্যি – তার জানা-অজানা। "জানার কোনো শেষ নাই", বাঙালির ক্ষেত্রে খাটে না। "বিদ্যা বাঙালির স্বতঃসিদ্ধ, তজ্জন্য লেখাপড়া শিখিবার প্রয়োজন নাই" (বঙ্কিম)। ভোট, জোট, ঘোটে সে পাকা। এও জানে পাকা, কী করে ঘোরাতে হয় চাকা।

চাকা তার চলার নয় ফুটোর প্রতীক। সর্বত্র তার ফুটো; হৃদয়ে জোনাকির নেই ঠাঁই, বুক হারিয়েছে ভালোবাসা, গোলেমালে মস্তিস্কে বিঁধে আছে কাঁটা, মনে নেই যাতনার জোয়ার। ভাটায় যে তরী ভাসায় সে তাই সোনার হয় না! বরং, সে "নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়" (বিনয় মজুমদার)।

তৃতীয় সত্যি – মতি নেই, তার গতিও নেই। হাঁটে কিন্তু ছোটে না। নাকের সামনে মুলো ঝোলালে তবেই যা একটু ছোটে। তাতেও দম কম, কারণ মুলোটা তার চেখে দেখার সুযোগ ঘটে না। মুলোর ফন্দিও সে বুঝে উঠতে পারে না। তবুও "গোলগাল বিশু নন্দী/ দিনরাত আঁটে ফন্দি..." (গৌরীপ্রসন্ন)।

এই ফন্দি তার ওজনের মানদণ্ড। ঝোঁক তার তাই নিক্তিতে। ওজন যেন মার না যায়। পাল্লা যেন হেলে না পড়ে একদিকে। বুঝে নেয়া চাই পাল্লার অধিকার। মনোমত পাল্লার দাবিতেই তার যত হল্লা!

পেন্ডুলামের মতো দুলতে দুলতে সে চলে ঘুরপথে। ঘুরপথে গেলে গন্তব্যে পৌঁছুতে যে দেরি হতে পারে, বারবার ভুল করেও সে তা শেখে না। যে শেখাতে যায় উল্টে তারই হিতে বিপরীত ঘটে। নইলে কী পাঠশালা সব খোঁয়াড় হয়; শিশুদের 'মধ্যাহ্ন ভোজ' টিকটিকিতে খায়!

ঔপন্যাসিক শংকর জানিয়েছিলেন, ব্রিটিশদের বড়ো ভুল কী ছিল; ওরা আমাদের শিক্ষিত করতে গিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে এনেছিল। নইলে ওদের সাম্রাজ্যে এখনো সূর্য অস্ত যেতো না। সবটা না হলেও অস্ত যে গেছে সেটা ঠিক। দুর্ভাগ্য, সেই সঙ্গে বাংলার সূর্যও নিভে গেল।

"খেলা হবে" তার এখনকার বুলি; এই বুলিতেই সে খেলে রক্তের হোলি! "এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ/ পরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা!" (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)।

আমিও বাঙালি, তাই "শুনি ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে অতল জলের আহ্বান" (রবি)। এই আহ্বান ডুবে মরার আহ্বান; থাকি তাই আড়ালে, অন্ধকার গৃহকোণে। সলতে জ্বালাতে গেলেও লাগে ভয়। ভয় আজ পাতায় পাতায়, মনে মনে, বনে বনে...।

"চতুর্দিকে অন্ধকার, তারই মধ্যে ইতস্তত আলো..."; তাতে কী লাভ হোল? "এর চেয়ে বরং/ সবাই একসঙ্গে অমাবস্যার ভিতরে ঢোকা ভালো" (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)। ঠিক? মিথ্যে তো নয় মনে হয়!

বাকি সত্যি – হে বাঙালি... "এই কথাটি জেনো খাঁটি/ বেড়াল খোঁজে নরম মাটি" (অন্নদাশঙ্কর রায়; ১৯৭৪)। ও বাবুমশায়, "সাবধানে থেকো ভাই"!

পরিচিতি: প্রাক্তন সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, গদ্যকার। নিবাস: কলকাতা।