মানুষ চিহ্নিত হয় ব্যতিক্রমী আচারে। সড়ক চিহ্নিত হয় কিলোমিটার ফলকে। একটি দেশের ছায়া থেকে আরেকটি দেশের ছায়া আলাদা করা যায় তার দেহের আকার এমনকি প্রাকৃতিক র্নিযাতনে তার সুরৎহাল দিয়েও। এখন আমরা যাকে ব্রান্ডেড হওয়া বলি। আবার একটি দেশের চারিত্রিক স্খলন অথবা তার চিহ্নায়ন সম্ভব হয়। চিহ্নায়ন চলে সে দেশের অভ্যন্তরের শিল্প, সাহিত্য, চিত্রকলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে এবং সে দেশের যেসব মানুষ দেশের মানচিত্রের বাইরে আছেন তাদের আচার আচরণে।
বাংলাদেশের মানুষের অবদানের ফল, এর স্বাদ, ঘ্রাণ, স্বর ও অনুভব যা শুরুতে ছিল সুষ্পষ্ট তা গত দেড় দশক হলো অস্বচ্ছ হতে শুরু করেছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণ বা রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরাই তার বিরোধিতা করার ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছেন না। সময় অতিক্রান্ত সেল-বাই-ডেট রাজনৈতিক অভিব্যক্তি করছে তার বির্নিমাণ। যে আসে বা যারা আসেন তাদের দেখে বুঝে নিতে পারি, গুণগত কোনো পরিবর্তন হলো কী না।
দেরি হয়ে গেছে অনেক। দেশের মানসিক ক্ষতি হয়েছে বিস্তর। ধর্মের নামে মানুষের যুক্তির মূলধন চুরি হয়ে যাচ্ছে। দেরির অবসরে কিছু লোক ছত্রাকের মতো প্রতিনিয়ত মাইকে, জনসমাগমকে শুধু বিভ্রান্ত নয় তাদের সংহারমুখী করে তুলছে। পুরুষকে নারী বিদ্বেষী করে তুলছে। অগ্রসরমান সমাজকে পিছিয়ে নিয়ে চলেছে, বৈশ্বিক বাংলাদেশকে সবার কাছ থেকে বিচ্যুত স্থানিক ও কালিক করে তুলেছে। নিজ পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে, সর্বোপরি মানুষের সহজাত কর্ম ও ধর্মকে অকল্যাণকর কাজে প্রবাহিত করছে। এদের সাজার বা এর যথাযথ আইনী ব্যবস্থা না নিলে বর্তমানে দেশ দেখভাল করার দায়িত্বে আছেন যাঁরা তারা দেশের কাছে দায়ী থাকবেন।
আমার যাপিত সৃষ্টিশীল জীবনের অর্ধেক বাংলাদেশে ও অর্ধেক ইংল্যান্ডে কেটেছে। কিন্তু...
"যতদূরেই যাইনা কেন
সেই পিচ্ছিল ঘাট, নোংরা উঠান,
এঁদো পুকুর-পাড়ের বাঁশঝাড়,
ভস্ম হয়ে যাওয়া তাদের ছায়া
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছেই,
স্পর্শ করছেই..."
আমার এই পংক্তিমালা একুশকেন্দ্রিক চেতনার প্রতিসরণ এবং তা 'প্রবাস' নামের এক ভিনদেশ থেকেই উচ্চারিত। আমার মতো প্রায় এক কোটির কারণেই বাংলাদেশের ভৌগোলিক মানচিত্র এতদূর অবধি ব্যাপ্ত হয়ে আছে। আমরা যতদূর যাই – দেশ যায় ততদূর। বাংলাদেশের এ বির্মূত মানচিত্রের ভেতরেই আমাদের আয় অর্জন। সবই জমা হয় মায়ের কাছে যা আদতে যায় দেশে। তাই অবস্থান নয় – অবদানেই আমরা চিহ্নিত হবার দাবি করি। দাবি করি সমান স্বীকৃতিরও।
আর দেশেও তাই করা দরকার।
গত বছরের গোড়ার কথা। তখনো কোভিডের তাণ্ডব শুরু হয়নি। শান্তি নিকেতনে গিয়েছিলাম। সকালটা ছিল কুয়াশাময় কিন্তু দুপুরটা ছিল একদম নিরাক পড়া। কিন্তু শিল্পকলা বিদ্যালয়ে দর্শকগণ ঘুরে ঘুরে শিল্প দেখছেন। দেখছেন পুরো মাঠে ছড়িয়ে থাকা শিল্পকর্মগুলো। যার প্রতিটি পরতে রয়েছে অতীতের দাগ। সুনসান কেবল একটি বৃক্ষের নিচে দেহাতি এক গায়ক আপন মনে গান গাইছেন। রোদের গায়ে ভর করে তার গানের কথা ও সুর ছড়িয়ে যাচ্ছিল। তিনি গানের সঙ্গে বাজাচ্ছিলেন দেশি বাদ্যযন্ত্র। হয়তো তা তাঁরই তৈরি। তিনি চোখ বুঁজে গাইছেন,
"তোমায় হৃদ মাজারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না
ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌর আর তো পাবো না।"
মনে হচ্ছিল কলিজার থোড় ছিঁড়ে যাচ্ছে।
ছিঁড়তে না দিতে চাইলে আজ থেকেই নিজ জ্ঞাতি বা সন্তানদের খাওয়া-দাওয়া ও পড়াশোনার সঙ্গে নিজ সংস্কৃতি, রুচি এমনকি দেশপ্রেমটাও ধর্মজ্ঞানে শেখাতে হবে। না হলে ধনে মানে বড়ো হলেও একদিন নিজেকে হতদরিদ্র জ্ঞান হবে আর তখন যে তারা বাবা-মা'কে যে দায়ী করবেন না – তা কে বলতে পারে? পারে না।
আরে ভাই খারাপ কার নেই? কিন্তু ভালো তো কিছু আছে নাকি? সেই কিছুটাই নাহয় বলুন। সব নাহয় না-ই বললেন। বলুন পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে লিখিত, স্বীকৃত ও চিহ্নিত সেই একটি গল্পই! বেচারাদের বড়ো হতে সাহায্য করুন। মুক্তিযুদ্ধ কি ও কেন হয়েছিলো নিদেনপক্ষে শুধু তাই বলুন। আর বাংলায় কথা বলুন।

পরিচিতি: কবি ও লেখক। বাংলাদেশ।