ফেব্রুয়ারি মাস। মাত্র দিনকয়েক আগেই অরুণাচল বেড়িয়ে ফিরেছি। আপাতত মন গৃহবন্দী। একটু ভুল হল। শয়নে, স্বপনে, জাগরণে জিয়া ভরলি, জাং জলপ্রপাত, বুমলা আর সেলার গল্পগাছা টইটুম্বুর। মাঝেমধ্যেই ল্যাপটপে চোখ মেলে ছবি দেখা আর সময় ছুঁয়ে আসা।
এ অবস্থায় আবার পথের ডাক। যে ডাকে গলা মেলায় বিবাগী মন, হারিয়ে যেতে চায় অজানা ঠিকানায়। অতএব, সে পথে আবার বেরিয়ে পড়া। সদ্য সুকুমারী সাংতি আর শেরগাঁওয়ের পদ্যঘর দেখে আসা মন বলেছে, এবারের যাত্রা যেন ইতিহাস ছুঁয়ে আসে। ইচ্ছেখাতায় জমে থাকা কত কুঠি, কত রাজবাড়ির নাম এল, গেল। কিন্তু পকেট গড়ের মাঠ। মন বলল, চলো পঁচেটগড়।
এরপর বেরিয়ে পড়া। শহর ছাড়তেই মন বানজারা। সাঁতরাগাছি, কোলাঘাট, খড়্গপুর পেরিয়ে ডেবরা, পটাশপুর হয়ে পঁচেটগড়। বিশাল মাঠের ওপর স্কুলের কচিকাঁচাদের হইচইয়ে মন প্রফুল্ল। তার ঠিক পেছনদিকেই প্রায় ৪০০ বছর বয়সের রাজবাড়ি। গাড়িতে বসে যখন প্রবেশদ্বার পেরোলাম, মনে হল, আমিও সেই বাড়ির মেয়ে। কেমন একটা রাজকুমারী গোছের অনুভূতি। নিজের মনেই হেসে নিলাম একচোট। সঙ্গীরা অবশ্য বুঝলেন না আমার হাসির কারণ। ততক্ষণে হাসিমুখে এগিয়ে এসেছেন রাজবাড়ির দায়িত্বে থাকা মানুষেরা। ব্যাগ ব্যাগেজ গেল তাঁদের জিম্মায়। আর আমরা প্রবেশ করলাম ইতিহাসের দালানে। বহু বছরের পুরোনো কেদারা, টেবিল, ঝাড়বাতি, মোমদানি, হ্যারিকেন সবকিছু সযত্নে রক্ষিত। স্বাগত পানীয় হিসেবে এল আমের সরবত। মেয়ের তো মন খিলখিল। সরবত খেয়ে ব্যাগ ব্যাগেজের তোয়াক্কা না করে শুরু টইটই। যেন রাজবাড়ির অলগলি তস্য গলি তার চেনা। দোতলার ল্যান্ডিং-এ এক মস্ত খাঁচায় বেশ কিছু রংবেরঙের পাখি দেখে মেয়ের মন খারাপ। কেন মানুষ বন্দী করে রাখে এমন সুন্দর পাখিকে? উড়তে মানা নারীর মুখোমুখি মেলতে মানা ডানা পাখির কষ্ট যেন একাকার ব্যথা হয়ে বাজে। কিন্তু মেয়ের তো কিচ্ছুটি করার নেই। তাই এঁকেবেঁকে ওঠা সিঁড়ি ধরে সোজা ছাদে। মাথার ওপর আকাশ হেসে বলে ও মেয়ে, আমার দিকে তাকা, তোর মন ভালো করে দিই। মেয়ের ছেলেবেলার বন্ধু আকাশ হাত বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। তারপর তাকে সঙ্গে নিয়ে এ ছাদে ও ছাদে। নিচ থেকে সহযাত্রীদের ডাকাডাকি শুনে ঘোর ভাঙে। নেমে আসে দালানে। কত রঙের ফুল সেখানে।

এবার একদিনের গৃহপ্রবেশ। ঘরের নামটিতে মেয়ের মনে সুরের আনাগোনা। রাজবাড়ির ঘরগুলোর দুয়ারে লেখা প্রতিটি নামই তার চেনা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দরবারে তাঁরা প্রত্যেকেই নক্ষত্র।তাঁদের নামেই ঘরগুলোর নামকরণ। তাঁদের নামাঙ্কিত ঘরে থাকার সুযোগ পাওয়াই মেয়ের কাছে পরম আনন্দের।
দোর খুলে ঘরে ঢুকতেই এক বড়োসড়ো সাবেককালের পালঙ্ক দেখে মন আরও ভালো হয়ে গেল।না, ঘর খুব আহামরি কিছু নয়।তবে প্রাচীন আর আধুনিকের হাত ধরাধরিতে বেশ অন্যরকম। বেশিক্ষণ ঘরে থাকলে তো আঁধার নেমে আসবে, অনেককিছুই দেখা বাকি থেকে যাবে। তাই আবার বেরিয়ে পড়া।
পঁচেটগড় রাজবাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল এ বাড়ি অবারিত, আগলহীন। বিশাল সিংহদুয়ার নেই, সুবিশাল প্রবেশদ্বার নেই, তাই তালা দেওয়ার প্রশ্নই নেই। বেরিয়ে পড়লাম দীঘির দিকে। একাকী প্রবীণ ঘাট দেখে মনে পড়ল কুসুমের কথা। কাজলকালো স্ফটিকস্বচ্ছ জলে লাফালাফি করছে কত অসংখ্য পাখি, মাছ। নানা আকৃতি ও প্রকৃতির রঙবেরঙের জলজ প্রাণী।

পাশ দিয়ে পায়ে চলার পথ সোজা চলে গিয়েছে নাম না-নানা গ্রামের দিকে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। পথে আসা যাওয়ায় আলাপ জমালাম গ্রামের মেয়ে, বউদের সঙ্গে। হাসিমুখে নানা গল্প বলল তারা। এদিকে ততক্ষণে দ্বিপ্রাহরিক খাবারের আয়োজন সেরে ফেলেছেন রাজবাড়ির হেঁসেলের মহিলারা। ডাক দিলেন।
খেতে বসলাম পুরোনো আমলের ঘরে। আসবাব কিছু প্রাচীন, কিছু হালফিলের। তবে খাবার পরিবেশন অসামান্য, ততোধিক অনবদ্য খাবারের স্বাদ। এলাহী আয়োজন। স্বল্পভুক মেয়েটিও চেটেপুটে অনেকটাই উদরে চালান করে দিয়েছে। হাতপাখার বাতাসে কি আনমনা হল মন। কাঁসার থালা, বাটি, গেলাসে কি অসীম স্নেহ। এরপর রাজবাড়ির একজন বললেন একটু আরাম করুন। সন্ধেবেলা আপনাদের রাজবাড়ির আরতি দর্শন করাবো। সন্ধে অবধি তর সইবে কেন মেয়ের! সে তার সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে আবার ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল রাজবাড়ির অন্দরমহল।
এই রাজবাড়ি বাংলা সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ইতিহাসের দিকে মনকে টেনে নিয়ে যায়। ২০১৮ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন, পঁচেটগড় রাজবাড়ির অনেকটা অংশকে হেরিটেজ ঘোষণা করেছে। প্রবেশের মুখে হেরিটেজ কমিশনের বোর্ডে সেকথা লেখা রয়েছে। পঁচেটগড় রাজবাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন কটকের আটঘর এলাকার মুরারিমোহন দাসমহাপাত্র মহাশয়।১৬৭৯ সাল নাগাদ মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব মোগল রাজদরবারের প্রতি আনুগত্য ও নানা পরিষেবা দেওয়ার জন্য মুরারীমোহনকে অনুদান হিসেবে এই পরগণা উপহার দেন। এরপর তিনি 'চৌধুরী' উপাধি গ্রহণ করেন এবং খাড় গ্রামে থাকতে শুরু করেন। এই রাজবাড়ির নানা গল্প বলেন স্থানীয় মানুষেরা। তাঁদের কাছে শুনলাম, মনুষ্যহীন এক ঘন জঙ্গলে নাকি একটি পুরোনো শিবমন্দিরের খোঁজ পান এই পরিবারের কেউ। শিবের পূজারী ছিলেন তাঁরা। সেই প্রাচীন শিব মন্দিরকে নতুন করে মেরামত ও নির্মাণ করে আজকের পঞ্চশিবমন্দিরটি তৈরি করা হয়।পাঁচটি শিবের মন্দির থেকেই সম্ভবত 'পঁচেটগড়' নামটির উৎপত্তি।
এই পঞ্চ শিবমন্দিরে গিয়ে এক অনন্য অনুভূতি হল। সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে পুরোহিতমশাই মন্দির প্রদক্ষিণ করছিলেন। সঙ্গে চলছিল মন্ত্রোচ্চারণ। শিষ্যরা (হতে পারে তাঁরা রাজপরিবারের সদস্য) ঘন্টা ও মন্দিরা বাজিয়ে সঙ্গে চললেন। স্বয়ম্ভু শিবলিঙ্গের দর্শন হয়েছে আগেও। আবার এখানে শিব স্বয়ম্ভু। সন্ধের আলোয় কম্পমান দীপশিখায় আলোকিত শিবালয় এক পবিত্র অনুভূতি দিল।




প্রাপ্তি ছিল আরও। শ্রীশ্রীকিশোররাই জীউ মন্দিরেও সন্ধ্যাদীপের শিখা প্রজ্বলিত হল। সাক্ষী রইলাম সন্ধ্যারতির। সে মন্দিরের উপাখ্যান শোনালেন পূজারী। এছাড়াও মন্দিরময় পঁচেটগড় রাজবাড়িতে নিত্যপূজা হয় অধিষ্ঠিত নারায়ণ জিউ ও শ্রীশ্রীমা শীতলাদেবীর।

মেয়ে যে খুব আস্তিক তা নয়, তবে তার পূজা চলে মনোমন্দিরে অহরহ। তাই এক অপরিসীম ভালোলাগা নিয়ে এ বাড়ি, ও মহল ঘুরতে ঘুরতেই রাজবাড়ির যে মহিলাটি আমাদের সব দেখানোর দায়িত্বে ছিলেন, তিনি একটি ঘরের দ্বার খুলে প্রবেশ করতে বললেন। ঢুকে যা নজরে এল, সে প্রাপ্তি যে তার ভাগ্যে ছিল, সে কখনোই ভাবেনি। সে ঘরের দেওয়াল জুড়ে বিরাজ করছেন সঙ্গীতভুবনের ঈশ্বরেরা। জানা গেল, বিষ্ণুপুর ঘরানা'র সুরেশ্বর যদুভট্ট অল্প সময়ের জন্য পঁচেটগড় রাজদরবারের সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। এ বাড়ির কেউ কেউ তাঁর কাছে তালিম নিতেন। তিনি ছাড়াও এই রাজবাড়িতে নানা সময় পায়ের ধুলো পড়েছে বিশিষ্ট পাখোয়াজ ও তবলাবাদক ওস্তাদ ফকির বক্সের, এখানে এসেছেন গয়া ঘরানার এসরাজবাদক কানাইলাল ধেরি, তবলিয়া পণ্ডিত কাশীনাথ মিশ্র, দ্বারভাঙা ও ঢাকা রাজদরবারের সঙ্গীতজ্ঞ কিরানা ঘরানার কন্ঠ ও সারেঙ্গী শিল্পী ওস্তাদ আবদুল্লা খান, মাইহার ঘরানার এসরাজ বাদক হালকেরাম ভাট, বিখ্যাত সারেঙ্গী শিল্পী চন্দ্রিকাপ্রসাদ দুবে প্রমুখ। একসময় হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী সঙ্গীতের সঙ্গে ভক্তিসঙ্গীত ও কীর্তনের প্রসিদ্ধ স্থানগুলোর মধ্যে পঁচেটগড় ছিল অন্যতম। এ পরিবারের সদস্য উপেন্দ্রনন্দন, যোগেন্দ্রনন্দন এবং জিতেন্দ্রনন্দন সঙ্গীত ও শিল্পের চর্চা করতেন। বহু বছরের পুরোনো সব ছবি ও তৈলচিত্র দেখতে দেখতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল কোনো জলসাঘরে বসে শুনছি ঐশ্বরিক সব কন্ঠ। হঠাৎ নজরে পড়ল কিছু মলিন কাপড়ে মোড়া বাদ্যযন্ত্রের দিকে। এস্রাজ, হারমোনিয়ম, তানপুরা... না, স্পর্শ করার অনুমতি নেই দর্শনার্থীদের। তালাচাবি দেওয়া রয়েছে কিছু বাক্সে। কিন্তু মেয়ের তো সেদিন বৃহস্পতি তুঙ্গে। সাহস করে বলে, হারমোনিয়মে তালা নেই, একবার দেখতে পারি? ওমা, সঙ্গে সঙ্গেই অনুমতি মিলল। প্রাচীন সে হারমোনিয়মে হাত দিতেই মনে হল ধ্বনি কেমন দেখা যাক। না, আর অনুমতি চাওয়ার অপেক্ষা করেনি সে। সন্ধ্যাদীপের শিখার সঙ্গে মিলে গেল বেহাগ... ভেতর থেকে গাইয়ে নিলেন কাজী নজরুল ইসলাম... চোখে জল, মনে অপার্থিব আনন্দ নিয়ে ফেরা...
নয় নয় করে বেশ কিছুদিন কেটে গেলেও রেশ নিয়ে রয়ে গিয়েছে আনুমানিক ৩৫০ থেকে ৪০০ বছরের প্রাচীন পঁচেটগড় রাজবাড়ি। থাকবে আমৃত্যু।


এই যা:, এত গল্প হল, কিভাবে যাবেন সে কথা তো বলাই হয়নি। স্বপ্ন থেকে বাস্তবে ফেরার পথটি এক্ষেত্রে সহজ। কলকাতা থেকে আমরা গিয়েছিলাম গাড়িতে। সাঁতরাগাছি, কোলাঘাট, খড়্গপুর পেরিয়ে ডেবরা ও পটাশপুর হয়ে পঁচেটগড়। আবার কাঁথি থেকে এগরা হয়ে কিংবা হেড়িয়া ও বাজকুল হয়েও এখানে আসা যায়। দূরত্ব কমবেশি ১৭০ কিমি। ট্রেনে যদি আসেন, কাঁথিতে নেমে এগরাগামী বাসে সহজেই পৌঁছতে পারেন পঁচেটগড় রাজবাড়ি। রাতে রাজবাড়ির অতিথি হতে চাইলে অবশ্যই আগে থেকে বুকিং করতে হবে। বুকিংয়ের জন্য +91 99035 17090 নম্বরে অয়ন চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন। রাজবাড়ীর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট www.panchetgarh.com। তবে যদি শুধু রাজবাড়ি ঘুরে দেখতে চান, তাহলে বুকিংয়ের প্রয়োজন নেই।

পরিচিতি: সঞ্চালিকা (বেতার ও দূরদর্শন)। কলকাতা।