
রাহুল আমাদের মধ্যে নেই। ওকে নিয়ে এ ধরনের স্মরণ-লেখ রচনা করতে হবে তা কোনোদিন দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। ওর এই মর্মান্তিক ঘটনাটা যখন জানতে পারলাম তখন প্রথম দিকে তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না এবং এই ধাক্কাটা সামলে ওঠাই খুব মুশকিল হয়েছিল। রাহুল নেই – এই কথাটা বিশ্বাস করতে এখনও কেমন যেন একটা কষ্ট হচ্ছে। কেমন একটা denial mode-এ চলে গেছি আমরা সবাই। রাহুল শুধুমাত্র একজন অভিনেতাই ছিলেন না। অত্যন্ত সংবেদনশীল সমাজ সচেতন একজন রাজনৈতিক মানুষ ছিলেন তিনি। তার গভীর বিশ্বাস ও আস্থা ছিল বামপন্থায়। তার আরও একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল লেখালেখি। এই সব কিছু মিলিয়ে এক অনন্য প্রতিভাধর মানুষ ছিলেন তিনি। যাকে আমরা অকালেই হারালাম। তাই রাহুল সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে এই সমস্ত বিষয়ের উল্লেখ ছাড়া তা অস্পূর্ণ থেকে যাবে।
আমি ওকে নিয়ে তিনটে ছবি করেছি। রাহুল একদম শুরুতে যখন ওর প্রথম ছবিটা করে মানে 'চিরদিনই তুমি যে আমার' (২০০৮) সেই ছবিটা দেখেই আমার ওর অভিনয় বেশ ভালো লেগেছিল। এবং বোঝা গেছিল যে ওর আগে তো একটা থিয়েটারের ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, সেটার সুবাদে এমন একটা লিগেসি আছে যেটা ভীষণভাবে আমাদের অন্তত আকৃষ্ট করে, সেটা হচ্ছে ওর বাবা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি বিজন ভট্টাচার্যের সাথে কাজ করতেন এবং তিনি নিজেও নাট্যকার ও পরিচালক ছিলেন। সেই সূত্রেই ও ছোটোবেলা থেকেই নাটকে অভিনয়ের ঘরানাটা পেয়েছে। তাই প্রথম ছবি দেখেই মনে হয়েছিল যে ওর অভিনয়ের ক্ষমতাটা যথেষ্ট রয়েছে, তখন ওর অনেক কম বয়েস।

পরবর্তীকালে যখন আমরা ঋত্বিক ঘটকের জীবনের অনুপ্রেরণায় 'মেঘে ঢাকা তারা' (২০১৩) ছবিটা করি তখন ওর সঙ্গে আমার কাজ করার সুযোগ হয়। সেই ছবিতে অনিল চট্টোপাধ্যায়ের যে ভূমিকা সেই ভূমিকায় রাহুলকে কাস্ট করা হয়। সেটা কিন্তু শুধুমাত্র এই কারণে নয় যে রাহুলের চেহারার সঙ্গে অনিল চট্টোপাধ্যায়ের একটা মিল আছে। তার থেকেও বড়ো কারণ হচ্ছে যে গণনাট্য সংঘ এবং সার্বিক থিয়েটারের সঙ্গে যে পরিচিতি ও বামপন্থার সঙ্গে যে পরিচিতি এছাড়াও ওর একটা গভীর অধ্যয়ন ছিল। সেই কারণে আমরা আরও বেশি করে রাহুলের সঙ্গে এই কাজটা করতে ইচ্ছুক হই। ছবিতে চরিত্রটা খুবই ছোটো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই ভেবেছিলাম যে ও করবে কিনা, কিন্তু ও সেটা শোনার পর এক কথায় রাজি হয়ে যায়। ওই ছবিটা করার পর আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বটা বেশ গাঢ় হয়। বন্ধুত্বের মূল কারণটা ছিল, প্রথমেই কথা বলে ওর রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক মতাদর্শের বেশ মিল পাচ্ছিলাম এবং তারপর ওর ইতিহাসটা জানার পর বুঝলাম যে, ওর সঙ্গে অবশ্যই একটা সখ্য গড়ে উঠবে, এবং সেটা উঠেওছিল।

'মেঘে ঢাকা তারা' ছবিতে রাহুল।
তারও পরবর্তীকালে আমি একটা চ্যানেলের জন্য 'তেরো নম্বর তারাচাঁদ লেন' (২০১৫) নামে একটা টেলিফিল্ম করি। সেই টেলিফিল্মটায় রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কা দু'জনকেই কাস্ট করা হয় এবং ওরা দু'জনেই তাতে খুবই ভালো অভিনয় করেছিল। তারও পরবর্তীতে 'ক্ষত' (২০১৬) বলে একটি ছবি করি যেখানে রাহুল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্রে অভিনয় করেছিল। আর সেটা বেশ চমক লাগানো একটা চরিত্রে। এছাড়াও এই বেশ কিছুদিন আগে মানে ধরা যাক মাসতিনেক আগে আবার রাহুলের সঙ্গে কাজ করেছিলাম 'আদালত ও একটি মেয়ে' (২০২৬) নামে একটি ওয়েব সিরিজে, সেখানেও একটা গুরুত্বপূর্ণ ও মজাদার একটা চরিত্রে রাহুল অভিনয় করে। যেহেতু এতগুলো কাজ রাহুলের সঙ্গে করেছি এবং বারবারই বলছি একটা রাজনৈতিক দর্শনগত জায়গা থেকে নৈকট্য হয়েছিল। এছাড়াও ওর সঙ্গে অনেকরকম কথা হতো সেটা অবশ্যই রাজনীতির কথা। তার ফলে রাহুলকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে ও কথা বলার সুযোগ হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ছবিতে রাহুলের সঙ্গে সহ অভিনেতা হিসেবে কাজ করার সুযোগও হয়েছে। যেহেতু শুটিং-এর সময় অভিনেতারা সব এক জায়গায় থাকেন সেইসূত্রেও প্রচুর গল্প আড্ডা ইত্যাদি হয়েছে। সেই জায়গা থেকে বলতে পারি রাহুল অভিনেতা হিসেবে খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। আগে থেকে বলা মুশকিল যে ও কী ভেবে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এরকম হতো যে অভিনয় করতে করতেই ও খুব ভালো ইম্প্রোভাইস করতে পারত। আর সেটা করে যে চিত্রনাট্যের ওপর আমরা কাজ করছি তার বাইরে গিয়েও ও অনেক সময় অনেককিছু করত এবং সেটা বেশ বুদ্ধিদীপ্ত ছিল। যদিও কথাবার্তা এবং আড্ডা মারা সবকিছুর মধ্যেই ওর একটা বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ছিল। এমনকী ওর অভিনয়ের ক্ষেত্রেও সেটা প্রকাশ পেত। অনেকসময় নিজে হয়ত কয়েকটা ডায়লগ ইম্প্রোভাইস করে বলল এবং সেটা খুব যথোপযুক্ত হতো। খুবই ভালো লাগতো। আবার কখনও কখনও ডাবিং-এর সময়ও নতুন শব্দ বা নতুন কথা জুড়ে দিত। তো সেখান থেকে বোঝা যেত একে তো ওর অভিনয় ক্ষমতাটা দারুন, খুব শক্তিশালী অভিনেতা।

রাহুলের অভিনয়ে আরেকটা খুব মজার ব্যাপার আছে সেটা হচ্ছে, রাহুল যখন যে চরিত্র করত সেই চরিত্রের সঙ্গে যে অভ্যাস বা যাপনের অংশটা, সেইটা এমনভাবে তৈরি হয়ে থাকত যে যখন শ্যুটিং শুরু হচ্ছে তখন কিন্তু ও এটা বুঝতে দিত না যে ও কতটা তৈরি হয়ে এসেছে। ফ্লোরে ওর ডেলিভারিটা থাকত অত্যন্ত ক্যাজুয়াল এবং ভীষণ vulnerable চরিত্র হয়ে উঠতে পারত। দর্শকের পক্ষে আগে থেকে আঁচ করা খুবই মুশকিল হতো, আসলে ওর একটা প্রস্তুতি নেবার পদ্ধতিও ছিল। সেই প্রিপারেশনের পদ্ধতির ব্যাপারটা একদম ব্যক্তিগত জায়গায় কীভাবে ও তৈরি করে আসত সেটা বলা খুব মুশকিল। তবে এটা ঠিক যখন ডেলিভার করত তখন দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে আগে থেকে এতটা প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে অর্থাৎ একটা চরিত্রকে তৈরি করে আবার সেই চরিত্রটা যে তৈরি হয়েছে সেটা লুকোনোর ক্ষমতাটাও রাহুলের মধ্যে ভীষণভাবে ছিল। রাহুল যেসব ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছে সেগুলো আমি কাছ থেকে দেখেছি আবার পর্দায়ও দেখেছি। কাছ থেকে দেখেছি কারণ, অনেক ছবিতে আমরা একসাথে অভিনয়ও করেছি। সেই সময় দেখেছি কত সাবলীলভাবে সেইসব চরিত্রে ঢুকে গেছে। আবার যখন পর্দায় দেখেছি তখন প্রত্যেকটা চরিত্রকে আলাদা আলাদা ধরনের মাত্রা দিতে পারত রাহুল। এটা খুব সহজ নয়, অভিনেতা হিসেবে এটা খুবই কঠিন। আরেকটা বিষয়, সহ অভিনেতাকে সাহায্য করা যেটা থিয়েটার থেকে আমরা শিখি সেইটা ভীষণভাবে ছিল। মানে কোনো অভিনেতা একটু পিছিয়ে পড়লে, একটু দুর্বল হলে তাকে কীভাবে সাহায্য করে ওই সিনটাকে উতরে দেওয়া যায় এই জায়গাটা রাহুলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। রাহুল যখন অভিনয় করছে আর আমি পরিচালক, আগে থেকে আমি হয়ত একটা কিছু ভেবে এসেছি তখন অনেকক্ষেত্রেই দেখেছি যে, একটা জায়গায় একটু অন্যরকম করল, কখনও মনে হতো না যে এটা হয়ত ঠিক হলো না, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মনে হতো যে হ্যাঁ ও বোধহয় আরেকটু বেশি ভেবে এসেছে এবং আরেকটু বেশিই ডেলিভার করেছে। সেই যে বোঝাপড়ার জায়গাটা এইটা আমাদের মধ্যে ভীষণভাবে তৈরি হয়েছিল। আমার ধারণা রাহুল খুব ভালো পরিচালনার কাজ করতে পারত, কিন্তু ওর এই হঠাৎ চলে যাওয়াটা শুধু পরিচালক হিসেবে আমার কাছে নয় দর্শককুল থেকে আরম্ভ করে আমাদের ফিল্ম ফ্যাটারনিটির বন্ধুবান্ধবদের যাদের দেখেছি তাদের প্রত্যেককেই একটা আক্ষেপ করতে দেখছি। কেউই মন থেকে ঘটনাটা মেনে নিতে পারছে না। সেটা তো অবশ্যই খুবই পীড়া দিচ্ছে ও একইসাথে দুঃখজনক।
এই সব মিলিয়ে আমি বলব রাহুল আমার এবং আমাদের সকলেরই খুব পছন্দের অভিনেতা। অভিনয় করার ক্ষেত্রে যেটা বারবার সামনে এসে যেত সেটা হলো ওর নাটকে অভিনয় করার ঝোঁকটা। সম্প্রতি হয়ত অনেকেই দেখেছেন অনেকদিন বাদে রাহুলেরই লেখা একটা নাটক 'যে জানলাগুলোর আকাশ ছিল' সৌরভ পালোধীর নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছে। যেখানে ও একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করত। তো সবমিলিয়ে রাহুল একজন নাট্যাভিনেতা ও চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে ভীষণ সফল।


পাশাপাশি এটাও সত্যি যে বিভিন্ন কারণে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এটা হয় যে, ফিল্ম করতে করতে থিয়েটার করতে গেলে বা অন্যান্য কাজ করতে গেলে যেমন লেখা ইত্যাদি করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, ইন্ডাস্ট্রি থেকে কম কাজ পাওয়ার একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেটা আমার ক্ষেত্রেও হয়েছে এবং আমি জানি রাহুলের ক্ষেত্রেও হয়েছে। অনেকটা দিন ওর খুব যে বেশি কাজ ছিল তা নয়। সেইসময় ও 'সহজ কথা' নামে একটা পডকাস্ট শুরু করে। যেটা পরবর্তীকালে খুবই জনপ্রিয় হয়। ওটা আমার আবার দেখতে খুব ভালো লাগত। প্রশ্নগুলো খুবই বুদ্ধিদীপ্ত ও সরাসরি হতো এবং অনেক জায়গায় যেটা বলা যায় যে বাক্চাতুর্য বা খুব বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন সেগুলো রাহুল করত।

রাহুলের অভিনয় শিল্প বাদ দিলে আরেকটা সত্তা খুব জোরদার বলে আমি মনে করি সেটা হচ্ছে ওর লেখালেখির ঝোঁক। ওর বইগুলো যখন ও লিখতে শুরু করল এবং প্রকাশিত হতে শুরু করল তখন ও আমাকে দিত আর সেগুলো পড়ে মতামত জানাতে বলত। ওর লেখা 'রাহুলের স্ক্র্যাপবুক' বা 'কলোনি কল্লোলিনী', 'লেখাপত্তর' এই যে বইগুলো ও লিখছিল সেই বইগুলো পড়লেও বোঝা যেত যে ওর মধ্যে একটা সাহিত্যগুণ রয়েছে। ও একজন সাহিত্যকুশলী মানুষ। ও প্রচুর সাহিত্য পড়ত, মূলত বাংলা সাহিত্য। অনেক পড়াশোনা করত। ওর বাবা নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখতেন, সেইগুলো আমরাও পড়েছি। তাঁর একটা স্ক্রিপ্ট আমার কাছে আছে। সেই স্ক্রিপ্টটা মঞ্চস্থ করার কথাও হয়েছিল। যদিও সেটা শেষমেষ হয়ে ওঠেনি। ও খুব তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে গেল।



রাহুল আমাদের খুব প্রিয় একজন মানুষ। শুধু একজন অভিনেতা হিসেবে নয় বা শুধুমাত্র একজন লেখক হিসেবেও নয়, সবথেকে বড়ো কথা একজন মানুষ হিসেবে সবার খুবই প্রিয়। সেটা এখন বোঝাও যাচ্ছে যখন সকলেই স্মৃতিচারণ করছেন বা ওর ব্যাপারে বলছেন। রাহুল ছাড়াও আমি প্রিয়াঙ্কার সাথেও যেহেতু অনেকগুলো কাজ করেছি সেহেতু ওদের দু'জনের সঙ্গেই আমার সম্পর্কটা খুবই গভীর।



রাহুল গভীরভাবে রাজনৈতিক মানুষ ছিল। এবং সে রাজনীতি লুকোনোর কোনো ব্যাপার নেই। সে রাজনীতি একদম স্পষ্ট বামপন্থী রাজনীতি। বামপন্থী বলতে একদম লাল পতাকায় বিশ্বাস রাখা রাজনীতি। রাহুলের সঙ্গে যখনই কথাবার্তা হতো কয়েকটা কথার পর শেষমেষ আমরা ওই রাজনৈতিক আলোচনায় চলে যেতাম। সেটা বিভিন্ন বিষয়ে – কখনও জাতীয় কখনও আন্তর্জাতিক আবার কখনও অবশ্যই আঞ্চলিক। সব ধরনের কথাই রাহুলের সাথে হতো। রাহুল যেহেতু স্পষ্টবক্তা ছিল এবং একেবারেই অপোশকামী ছিল না, সেটা ওর পডকাস্ট দেখলেও বা লেখাপত্তর পড়লেও বোঝা যায়, সেই কারণে রাহুল খুব সরাসরি বামপন্থী রাজনীতির কথা বলতে চাইত বা বলত। রাহুলের মধ্যে একটা বিষয় ছিল ও কখনও সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেনি বা হবার প্রচেষ্টাও করেনি, যদিও ওর প্রথম যে ছবি সেটা সাংঘাতিক জনপ্রিয় এবং সত্যিই ভীষণভাবে বাণিজ্যসফল। তার পরবর্তীকালে ও যেসব ছবি করেছে সেগুলোও কিন্তু যথেষ্ট নাম করেছে। এতকিছুর পরেও রাহুলের মধ্যে কিন্তু সেই আমিত্ব বা ব্যক্তিতান্ত্রিক যে জায়গাটা সেটা আসেনি। ও কিন্তু সবার সাথে মিশতে পারত আর মিশত একদম একজন সাধারণ মানুষ ও দর্শক হিসেবেই। সবথেকে বড়ো কথা হচ্ছে বিভিন্ন আড্ডায়, কথাবার্তায় বা আমি বলছি না শুধুমাত্র কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারে বা লোকসমক্ষে তাও বলছি না, একদম ঘরোয়া আড্ডাতেও রাহুলের এই বামপন্থী যে মতামতগুলো সেগুলো খুব শক্তপোক্ত ভাবে আসতো।

ও খুব ভালো বক্তা ছিল বলে সেই কথাগুলো খুব কনভিনসিং হতো। এর মাধ্যমে ওর বিশ্বাসটাও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারত। আসলে যেটা ছিল সেটা হচ্ছে একটা সময় ওই কলোনি অঞ্চলগুলোতে উদ্বাস্তু আন্দোলন, রাহুলের পরিবার যেহেতু সেই আন্দোলনের সাথে ভীষণভাবে সম্পৃক্ত ছিল, সেই কারণে ওই যে বামপন্থী লড়াকু ভাবধারা সেটা ওর মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। বামপন্থীদের মধ্যে অনেককে ও খুব শ্রদ্ধা করত, বিশেষ করে সেই সময়ে উদ্বাস্তু আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রশান্ত শূর, কুলেন্দু সোম এঁদের কথা বারবার বলত। ওদিকে আবার যেহেতু বিজন ভট্টাচার্যের একটা স্ট্রং ইনফ্লুয়েন্স ছিল, সেহেতু ওর লেখাপত্তরের ওপর নবারুণদার (ভট্টাচার্য) একটা বড়ো ছাপ পড়েছিল। সেই জায়গা থেকে রাহুলের যে পলিটিক্যাল ইন্টিগ্রিটি বা পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট সেটা দেখার মতো ছিল। সেইসব আলোচনার মধ্যে, অনেক সময় হয় আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকতে গেলে অনেক রকম আপোশ করতে হয়, তো রাহুল কিন্তু ওই আপোশ যে খুব বেশি করত তা নয়। যথেষ্ট প্রতিবাদী ভূমিকাও বিভিন্ন সময়ে পালন করে এসেছে। সেইদিক থেকে রাহুলকে হারানো মানে শুধুমাত্র যে একজন অভিনেতা বা একজন অত্যন্ত উদ্যোগী নাট্যকর্মী বা বলতে পারি একজন সাহিত্যিককে হারানো নয়, একজন কমরেডকে হারানো এবং খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে একটি প্রতিবাদী চরিত্রকে হারানো, বিশেষ করে এই অস্থির সময়ে। এই সময়ে কিন্তু রাহুলের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। যেহেতু ও খুব জনপ্রিয় মানুষ, সেই কারণে রাহুল অনেক মানুষকে একসঙ্গে ইনফ্লুয়েন্স করতে পারত। অনেককে প্রেরণা জোগাতে পারত বা পারছিল।

রাহুলের চলে যাওয়া নিয়ে সেই কারণেই কিন্তু একটা সামগ্রিক ক্ষোভ রয়েছে জনমানসে। যেভাবে ও চলে গেল সেটা কেউ মেনে নিতে পারছেন না, আমি তো পারছিই না। তার কারণ হচ্ছে, যে শুটিংটা হচ্ছিল তা তো পুলিশ বা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া হচ্ছিল। দ্বিতীয়ত, যে বিষয় সেটা হচ্ছে আমি এখনও পর্যন্ত যা যা শুনেছি তার ভিত্তিতে বলছি, এখনও তদন্তটা চলছে, অটোপসি রিপোর্টে পাওয়া গেছে যে, অনেকক্ষণ জলে ডুবে থাকার একটা ব্যাপারটাও ভীষণভাবে ভাবাচ্ছে। ওদিকে তালসারির যে অঞ্চলে শ্যুটিং হচ্ছিল সেটা ভয়ংকর অঞ্চল, সেটা সেখানকার স্থানীয় যেসব মানুষ তারা বারবার বলেছেন, তাদের কোনোরকম গাইডেন্স ছাড়া সেখানে শুটিং না করতে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, সেখানে সুরক্ষা দেবার যে ধরনের পরিকল্পনা আগে থেকে করা হয়, নানারকম নিরাপত্তা বন্দোবস্ত কিন্তু আগে থেকে নেওয়া হয় বা বলা ভালো নিতে হয় বিশেষ করে জলে, পাহাড়ে বা জঙ্গলে যখন চরিত্রেরা কাজ করে। শুধু অভিনেতাদের ক্ষেত্রে নয়, আমি বলব সমস্ত কলাকুশলীর ক্ষেত্রেই। দুর্ঘটনাও যে আগে ঘটেনি তা নয়, এই সমস্তটা জানার পরেও এইরকম দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে শুটিং করাটা সত্যিই আমরা খুব একটা মেনে নিতে পারছি না। প্রাথমিকভাবে যখন এই ঘটনাটা ঘটল তারপর থেকে অনেকরকম পরস্পরবিরোধী বক্তব্য শোনা যেতে লাগল। অনেক পরস্পরবিরোধী ন্যারেটিভ আসতে শুরু করল যেটার কোনটায় বিশ্বাস করব আর কোনটায় করব না আমরা বুঝতে পারছিলাম না, এখনও বুঝতে পারছি না। এখনও তদন্ত শেষ হয়নি। কিন্তু এই নিয়ে অনেককিছু বলার আছে। প্রথম কথা হচ্ছে এই তদন্ত করার জন্য এফআইআর-এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে কেন? এটা তো পুলিশের সুয়োমোটো শুরু করে দেওয়া উচিত। দু'নম্বর কথা হলো যে, অনেকগুলো দিন কেটে গেল অথচ সত্যিটা সামনে এলো না। এই যে সত্যিটা সামনে আসছে না আমরা বুঝতে পারছি এই বিশেষ যে প্রোডাকশন হাউস বা প্রযোজনা সংস্থা তাদের যাঁরা মালিক বা মালকিন তাঁদের সঙ্গে সরাসরি সরকার এবং প্রশাসনের যোগ রয়েছে এবং এই ভদ্রমহিলা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পদেও রয়েছেন, যিনি এই প্রযোজনা সংস্থা চালান। এবার সেই কারণে আমার মনে হয় যেহেতু ইদানীংকালে এই যে সরকারি বা পুলিশি কাজকর্ম চলছে সেগুলোকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি না, সেহেতু তদন্তটাকে বিলম্বিত করা এবং বিষয়টাকে ধামাচাপা দেবার একটা চেষ্টা চলতে পারে। সেইটাকে রুখে দেওয়াটা আশু প্রয়োজন। এরপরে আরেকটা বিষয় হচ্ছে যে, অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, আমরা যে রাজনীতিতে সমর্থন করি তাদের ওপর যে আগ্রাসন নেমে আসে বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো কেস হয় সেটা সঙ্গে সঙ্গে ফলো করা হয়। তৎক্ষণাৎ তার তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, কালবিলম্ব না করে তাদের পুলিশ কাস্টডিতে নিয়ে নেওয়া হয় বা জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইত্যাদি। এক্ষেত্রে সেটার এতো বিলম্ব কীসের? সবাই একেবারে নিশ্চুপ। আরেকটা জায়গা যেখানে অভিনেতারা যাঁরা বলছেন সেটা 'আর্টিস্ট ফোরাম'-এর তরফে বা কলাকুশলীদের যে সংস্থা আছে বা অন্যান্য যেসব প্রযোজনা সংস্থা আছে তাঁরাও বলছেন, আমার কথা হচ্ছে সবাইকে একটা জায়গায় এসে লড়াই করতে হবে নাহলে এই একটা ভয় তো তলায় তলায় সবসময় চলে বা একটা অনিরাপত্তাবোধ থাকে যে, আমি কিছু বললে আমার কাজ চলে যাবে – এই কালচারটাকে এবার পালটানোর সময় এসেছে। যদি এখন রুখে না দাঁড়ানো যায় তাহলে এই ধরনের নেগলিজেন্সের ঘটনা চলতেই থাকবে এবং সেক্ষেত্রে কলাকুশলীরা বিভিন্ন সময়ে প্রচুর বিপদের সন্মুখীন হবেন। এই যে নিরাপত্তার অভাবের মূল কারণটা তো অনেক ক্ষেত্রেই হয় বাজেট। সেই জায়গায় কম্প্রোমাইজ করতে গিয়ে অনেকগুলো মানুষের জীবন একদম খাদের কিনারায় চলে যায়। বিশেষ করে যাঁরা সৃজনশীল কাজকর্ম করেন তাঁরা একটু প্যাশনেট হন, তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক কাজ করে ফেলেন। এবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে তিনি রাজি আছেন, কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে যে বা যারা তাঁকে ও গোটা ইউনিটটাকে হায়ার করেছেন তাদের কিন্তু দায়িত্ব নিতেই হবে। সেই জায়গা থেকে ভীষণভাবে এই প্রতিরোধটা উঠে আসছে। আমরা আরও দেখছি বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাবলম্বী মানুষ এক জায়গায় এসে একটা স্বর তুলছেন। মুশকিল হচ্ছে এরপর যেন সেগুলোকে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা না হয়। তাহলে কিন্তু আমাদের যে বাংলা ফিল্ম ফ্যাটারনিটি রয়েছে তা সে তারা সিরিয়াল করুক বা সিরিজ করুক বা ফিল্ম করুক প্রত্যেকেরই কিন্তু ক্ষতি হবে।
রাহুল অসময়ে চলে গিয়ে আমাদের একটা বিরাট শিক্ষা দিয়ে গেল। কিন্তু এরকম ঘটনা কারোর সঙ্গে ঘটুক সেটা তো আমরা কোনোদিন চাইব না, তাই এই ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক হওয়াটা ভীষণরকম জরুরি। সবথেকে বড়ো কথা প্রাথমিকভাবে প্রযোজনা সংস্থাকে তো দায় নিতেই হবে, তাছাড়া যারা এই সংস্থার হয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তাদের কাজ নিয়ে তো প্রশ্ন উঠবেই। শেষমেষ প্রশ্নটা ধেয়ে আসবে কিন্তু সরকারি পুলিশ প্রশাসনের দিকেই। তাঁরা কতটা ইচ্ছুক হবেন বা কেয়ারফুল হবেন এই ব্যাপারে যে, প্রযোজনা সংস্থাগুলোকে সতর্কতা অবলম্বন করতে বা বজায় রাখতে বাধ্য করছেন। এটা আজকের দিনে কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ ও ভেবে দেখার মতো বিষয়। নাহলে শুটিং-এর ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় দেখেছি আমাদের অনেক রকম ঝুঁকি নিতে হয় জল নিয়ে, আগুন নিয়ে, বিভিন্ন সময় পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে শুট করার সময় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শুটিং হয়। জঙ্গলে তো বটেই। তো এই সবক্ষেত্রে আলাদা আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে এবং তার জন্য প্রপার স্টান্ট-এর যে টিম, যাঁরা পেশাদার, যাঁরা জানেন যে ঝুঁকি কীভাবে সামলাতে হয় – সেই ধরনের লোকদের ইউনিটে নিতেই হবে। তাতে বাজেট বাড়ে বাড়ুক কিন্তু এইভাবে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কোনো শুটিং চলতে পারে না।

তালসারিতে শেষদিনের শুটিংয়ে।
আমার করা ছবিগুলোর মধ্যে শুধু 'চাঁদের পাহাড়' (২০১৩) নয়, সেটা ছাড়াও অনেকগুলো ছবি করেছি যেগুলো অ্যাডভেঞ্চারমূলক। এই সবকটার ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবার প্রশ্ন আসে। বিষয়টা হচ্ছে সেইখানে আমি দেখেছি যেহেতু বিদেশি অনেক স্টান্ট মাস্টার-এর সঙ্গে কাজ করেছি, মুম্বাই ও চেন্নাই-এর অনেক স্টান্ট মাস্টার-এর সঙ্গে কাজ করেছি, সেখানে দেখেছি তাঁরা খুবই কস্টলি, খুবই এক্সপেন্সিভ। কিন্তু তাঁরা জানেন কীভাবে কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। অন্যদিকে যেসব প্রযোজনা সংস্থার সাথে কাজ করেছি তাঁরা কিন্তু এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই তবেই শুটিং-এ হাত দেন। এই বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে শুটিং-এ হাত দিলে কিন্তু ভয়াবহ বিপত্তি ঘটতে পারে।
অভিনেতা-অভিনেত্রী বা কলাকুশলীদের জীবন তো জীবনই। সেটা ফিল্মই হোক কী সিরিজ হোক, কী সিরিয়াল হোক সেক্ষেত্রে এটা করতে হবেই। নতুবা এর পরে কোনো কলাকুশলীকে এই ধরনের কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না। যদি নিরাপত্তা সঠিক না হয় তাহলে তাঁরা কীসের ভরসায় কার ভরসায় কাজ করবেন? কারণ একদিকে তো অবশ্যই আছে প্যাশন, তার পাশাপাশি এটাও তো সত্যি যে, এটা দিয়েই সবার পেট চলে। সুতরাং এই কর্মস্থলে নিরাপত্তা – এটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। এটার সাথে কোনোভাবেই আপোশ করা যাবে না। বারবারই যখন এই কথাগুলো মনে পড়ছে আমি জানি রাহুল থাকলে ঠিক এই কথাই বলতো, যদি অন্য কারোর ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা ঘটত। সেই সময়টা কিন্তু এসে গেছে। আর আজকের যে প্রযুক্তি, সেই প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে থাকা প্রযুক্তি। আজকে আমরা ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। এটা যদি আমি ধরে নিচ্ছি আরও অনেক বছর আগে হতো তাহলে একটা বিষয় ছিল, কারণ সেখানে সেই সময় এই প্রযুক্তি আসেনি। কিন্তু আজকে বিভিন্ন প্রযুক্তি এসে গেছে। সুতরাং আজকে বিপদ এড়ানো অনেকক্ষেত্রে সম্ভব। দুর্ঘটনা কি তারপরেও ঘটে না? হ্যাঁ ঘটে। কিন্তু অন্তত দুর্ঘটনা ঘটার আগের থেকে সেই ব্যাপারে সচেতন হওয়াটাও অত্যন্ত জরুরি।

রাহুলের শেষযাত্রায় সহকর্মী ও অনুরাগীরা।

এই যে দুর্ঘটনাটা ঘটল, তারপর এফআইআর করতে অনেকটা সময় লেগে গেল। আমার ধারণা অনেক ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গিয়ে অনেক আলোচনা করার পর এই বিষয়টা এসেছে এফআইআর করা ইত্যাদি। কিন্তু বেটার লেট দ্যান নেভার। একথা কেন বলছি কারণ, এই নিয়ে জনমত গড়ে ওঠা বা ঐক্য গড়ে ওঠার ব্যাপারটাও আমাদের ফিল্ম ফ্যাটারনিটিতে খুব সহজ বিষয় নয়। সেটা যে গড়ে উঠেছে সেই ব্যাপারটাতে আমি খুব আশাবাদী। আরেকটা বিষয় দেখতে হবে যে ফলো-আপ বা কনসিসটেন্সি। যে কোনো একটা আন্দোলন বা প্রতিরোধ গড়ে উঠবে, কিন্তু সেটাকে ধরে রাখা যাতে সেটা স্তিমিত হয়ে না যায়। এর আগে অভয়া কাণ্ডের ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা তো ভালো নয়, এক্ষেত্রে যেন সেই ঘটনা না ঘটে – এ বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করা প্রয়োজন। মানুষই তো শেষ কথা বলে ও মানুষই ইতিহাস সৃষ্টি করে। মানুষ দর্শক হিসেবে এবং যাঁরা এই চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদের কথাও বলব যে, তাদের তরফ থেকেও একটা চাপ জারি রাখা খুব জরুরি। কারণ এটা তো একটা সচেতনতার ব্যাপার – সমাজ সচেতনতার ব্যাপার। সমাজে আরও বেশি বেশি করে মানুষ সচেতন হোন এটা কাম্য। তারাও যেন হাল ছেড়ে না দেন।

পরিচিতি: বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা ও সমাজকর্মী। নিবাস: কলকাতা।