চরিত্রটির নাম হতে পারতো অনিরুদ্ধ। গুয়ানতানামোর কয়েদখানায় কখনো থাকা হয়নি। না, অমন কোনো দাগি অপরাধীও সে হয়ে উঠতে পারেনি। ধারাপাতের লব্ধ সত্য-শব্দচয়নের মতোন আজীবন কেবলই শুনেছে– 'জীবনে যা-ই হও না কেন, এক নম্বর হও।' তাই-ই যদি মানুষের ক্ষেত্রে আদপে হতে পারতো– তবে তো সবাই পেলে, মারাদোনা, শচীন, লারা হতো। গ্যালারির দর্শক আর কেউ হতে চাইতো না।
জগৎটা চলতো কী করে সত্যিই যদি অমন হতো! বাস্তবে অমনটা যে ঘটেনি তাতেই রক্ষা, সভ্যতা থমকে যায়নি। সাধারণ মানুষগুলো সব অসাধারণ না হয়ে জগৎটাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। সেভাবে ভাবলে সাধারণ মানুষগুলোর অবদান অসাধারণের চেয়ে কম কি আর! পৃথিবীর তাবৎ মানুষগুলো সবাই লেখক হলে পাঠক হতো কে?
এমনই যখন বাস্তবতা, তাহলে গুয়ানতানামোর কয়েদি হবার মতোন দাগি আসামি না হয়ে খুব সাধারণ কেউও তো অনায়াসে হতে পারে তুখোড় একটা গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। জেল পালানোর দুর্দান্ত থ্রিলিং পরিকল্পনা আর সাসপেন্সময় বাস্তবায়নের শিউরে ওঠা কাহিনি অবয়ব না হয়ে– তবে তো চিলতে ছাদে চিৎ হয়ে শুয়ে নির্বিকার আকাশ দেখা অলস একটা মানুষও অনায়াসে হতে পারে টান টান কোনো গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার পাশে কি অপ্সরিই আবশ্যক? অনবদ্য ভালোবাসায় বিলীন হওয়া একটি রমণী চরিত্র না হলে গল্পটা জমে উঠবে না! সেরকম কোনো চরিত্রের বদলে প্রেমবিমুখ খেয়ালি, কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রটির পাশে জগৎ-বিদ্বেষী কোনো নারীর কর্মকথাও দিব্যি গড়ে নিতে পারে অনবদ্য কোনো গল্পগাঁথুনি।
তবে তাই হোক। অনির্বাণ বা অর্ক না হয়ে অনিরুদ্ধ কিংবা দবির– এমন একটা নামই হোক। ঐশী বা উর্বশী না হয়ে দীপালি কিংবা জমিলা হোক নাম।
নামে কিবা যায় আসে। কাহিনিটাই আসল। ঘটনার বুননটাই নির্যাস। শব্দশৈলী মার মার কাট্ কাট্! ব্যাস বেস্টসেলার। যত বেশি দগদগে ঘা-কে রগরগে তুলে আনা যাবে– লোকে পড়বে আর বলবে, 'আহা একেবারে খাঁটি কথা'।
প্রেম সে তো প্রধান উপজীব্য হতেই পারে। এ তো শাশ্বত বিষয়। তবে তার রকমফেরটা সেকেলে না হয়ে সমসাময়িক হওয়া চাই।
।। দুই ।।
জমিলার মোবাইলটা বেজে ওঠে ধিন্ তা না না ধিন তা না না তালের একটা ঝকমারি গানের সুরে। মিশরের মমিও নেচে উঠবে অমন উদ্বেল দ্রিমিকে। আজকালকার মিউজিশিয়ানদের নিত্য উদ্ভাবন প্রতিযোগিতা লেগেই আছে। কে কত কলিজা কাঁপানো তালে ঝমক আনতে পারে... গিমিক্! গিমিক!
– শনিবার বিকালে হলি ভালো হয়। আচ্ছা পাঁচটার ভিতরেই চলি আসপানি। লাম্পা কৌটাগুলান কটা রাখতি ভুইলে যাবানা কলাম।
– রাখবাম। রাখবাম। আরো একখান নতুন মজার জিনিস রাখবাম। জম্পেস জিনিস। লহমায় পানসি (পাংখা) হয় যাবার পারবা। কুনু মিস নাই।
– ওক্কে, আইসা পড়বানে টাইম মতোন। চিন্তা করবানা আসমত।
আসমত খিক্ খিক্ করে হাসে। অচেনা অজানা কোনো মানুষও ফোনের এই প্রান্তে খোশমেজাজি আলাপে বিকশিত হয়ে থাকা পানে আর গুলে খাওয়া ইটের খোয়ার মতোন দাঁতগুলো স্পষ্ট দেখতে পাবে রিসিভারের অন্য প্রান্ত থেকে। এমন উদ্বেলিত আকর্ণবিস্তৃত উচ্চকিত হাসি তার।
আসমতের লাইনটা কেটেই জমিলা সেলফোনের স্ক্রল বাটন চেপে ধরে খুঁজতে থাকে যেন কারো নাম।
ক্যালসিয়াম বাবুল। তল্লাবাগের ঠিকাদার আবুলের ভাই। চকচকে মসৃণ কালো আর নায়কের মতোন স্লিম টল হ্যান্ডসাম। ক্যালসিয়ামের মতোন সাদা ফকফকা দাঁতগুলো সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কাড়বে মানুষটা হাসলেই।
– রবিবারে না তোমার কাজকাম বহুত পাতলা। গত রবিবারে তো আসবার পারি নাই। তাইলে সামনের রবিবার আইসা পড়বানি। আমার পেয়ারি জান জরিনারে সাথে কইর্যে নিয়া আসপানি।
– মাগর জিনিস একখান। তয় তুমি হইলা গিয়া ওস্তাদনি মানুষ। আনবার চাইলে লিয়া আইবা। মফিজ মেম্বররে এলা খবর দিয়া রাখুমনে। কী কও!
– দ্যাও। ব্যবস্থা তাইলে সিরাম রাইখো। জানু। চুম্মা।
।। তিন ।।
ফোনটা রেখে বড়ো করে আড়মোড়া ভাঙে জমিলা। ঢাকায় এসে ছ'মাস না যেতেই জমিলার ব্যস্ত জীবন। প্রথমে এসেই একটা ইনস্টিটিউটে ভরতি হয়েছিল ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিয়ে ভালো একটা কাজ জোটাবার আশায়। তিন মাসের কোর্স। টেনে টুনে দু'মাস চলার মতোন পয়সাপাতি নিয়ে ঢাকায় এসে হাড়কিপ্পনের মতোন কোর্সের ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছিল। যেন দু'মাসের টাকায়ই তিন মাস সে পার করে ছাড়বে। তারপর একদিনও সময় নষ্ট না করে চাকরি।
অমন অঙ্কের মতোন কি আর জীবন চলে ছকে ছকে! ভাবনায় অনেক রাতেই ঘুমের দেখা মিলতে চাইতো না জমিলার।
টিফিনের ব্রেকে পাশাপাশি বসে একদিন পরিচয় হয় সবির খিলজির সাথে। কী অবাক কাণ্ড। আচমকা চোখাচোখি হওয়ায় দ্রুত চোখ সরাবার সাথে সাথে হাতখানাও সরে গিয়েছিল মনে হয় খানিক। একগ্লাস পানি ঝপাত্ করে কাত হয়ে বিদ্যুতের গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো যেন লোকটার গায়ে। কেউ কিছু বুঝে উঠবার আগেই ভিজে চুপচুপা হয়ে গেল মানুষটা।
সপ্তা না পেরুতে দেখা গেল প্রতিদিনই পথের দূরত্ব মাপতে মাপতে মানুষটা জমিলাকে পৌঁছে দিত তার ঘর পর্যন্ত। এই লম্বা সময়টায় শহরের পথচলতি লাগামহীন ভিড় আর বকবকানির পাশাপাশি দু'জনের কথোপকথন সাত দিনেই যেন গড়ে দিল সাত বছরের সখ্য।
।। চার ।।
ঢাকায় আসার বত্রিশতম দিনের সন্ধ্যায় গিয়েছিল এক গানবাজনার দাওয়াতি অনুষ্ঠানে। সেই একমাত্র সখ্য সবির খিলজির সাথে। কী ঝকমকি বাহার। কী গান। শব্দঝড়ে যেন বুকের ভেতরের সব তারগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে সবকিছু বের হয়ে আসতে চায়। চেনা নাই জানা নাই তবু সবার কথাবার্তায় মনে হলো কত দিনের চেনা। ভালোই লেগেছিল। শুধু ভালো নয়, বেশ ভালো।
সেখান থেকেই একে একে নতুন নতুন মানুষের সাথে চেনা পরিচয়। গানের অনুষ্ঠান, পানের অনুষ্ঠান, কত কিসিমের অনুষ্ঠান। ভিড়ের অনুষ্ঠান, একার অনুষ্ঠান। বাড়ির লোকজন বেজায় সমীহ করে তাকে। শহরে আসতে না-আসতেই কী যে লেখাপড়া-ট্রেনিং দিল। তার শেষ না-হতেই কাজ। আয়-রোজগার যা তাতে বাড়ির সবাই তাকে খুউব মানে, সমীহ করে। সুবিধা-অসুবিধায় সবার কাছের মানুষ, কাজের মানুষ জমিলা।
চেহারায় স্থির হয়ে থাকা নির্লিপ্ত গাম্ভীর্য দেখে কারো বিন্দুমাত্র মাথায় আসবে না অকারণ ঢং-তামাশা আর ঢলাঢলি-মাখামাখিতে কুশলী মাস্টার সে এখন, তাই তার এত কদর। তার সঙ্গ তাই এত চাহিদার। চাষের চৌষট্টি কলা শেখেনি তো কোনো ইস্কুলে। কেউ শেখায়নি। এক দিদি জুটেছিল প্রথমদিকে। সপ্তা তিনেকে দিদির সীমানায় লেপ্টে থাকার পর, দ্বিধার ছায়াটুকুনও আর টিকে ছিল না তার এক বিন্দু। ব্যাস ওইটুকুন। বছর বছর ইস্কুল গিয়ে... এই ঢাকা শহর এসেই প্রতিদিন ক্লাস আর পাশের জন্য যে ছোটাছুটি... তার কোনোকিছুই কি আর এসেছে কোনো কাজে। একবিন্দুও না। স্রেফ অচেনা এক মানুষের গায়ে অকস্মাৎ একগ্লাস জল ফেলার কল্যাণে জামিলা পেয়ে গেছে যেন সাত সমুদ্রের চেয়ে বড়ো কোনো জগৎ। প্রতিটা দিনই তার ব্যস্ততার দিন। নিজে না চাইলে ছকে মিলবে না কোনোদিন নৈমিত্তিক ব্যস্ততা এড়িয়ে এক লহমার বিশ্রাম।
।। পাঁচ ।।
কত রকম মানুষের সঙ্গে পরিচিতি সম্পর্কের সৌকর্য ধরে রাখা। পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সি বেশ ক'জন মেয়ে-সঙ্গীও তার আছে। কারো সঙ্গে বান্ধবীর মতোন তুই-তুই সম্পর্ক, আবার কারো সঙ্গে দিদি-বৌদি ডাকের সম্পর্ক। প্রায় দিনই কোথাও না-কোথাও প্রোগ্রাম থাকে। বেশিরভাগ দিনই কোনো না-কোনো বান্ধবীকে সঙ্গী করে নিয়ে যায়। সেজন্য এই বান্ধবী-দিদিদের কাছে তার কদর একটু বেশি। যদি কোনোদিন কোথাও কোনো প্রোগ্রাম না-থাকে তো ওই বান্ধবী-দিদিদের কারো বাড়ি নয়তো ওরা তার বাড়ি-এভাবে মানুষের মাঝে প্রাণবন্ত হৈ হুল্লোড়ের মাঝে বেশ যাচ্ছে দিনগুলো।
ব্যস্ততার সাথে পাল্লা দিয়ে অর্থপ্রাপ্তি। ঝকঝকে রোদেলা দিন, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বিরামহীন, এসে আলিঙ্গনে ধরা দিচ্ছে একের পর এক। প্রথম দিকে স্রোত আর বিপরীত স্রোতের দ্বন্দ্বে ভেতরে ভেতরে দহন-পীড়নের কিছু ঝোড়ো হাওয়া বইতো। কিছু দিন না-যেতেই সবকিছু সকালের দাঁত মাজার মতোন প্রাত্যহিক, স্বাভাবিক ও নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবধি সম্পূর্ণ রঙিন, স্বপ্নমগ্ন একখানা ঝলমলে জীবন। ঝরনার জলের মতোন তীব্র বহমান।
শাড়ি, চুড়ি, প্যান্ট-কুর্তা সবকিছুর সাথেই অমন সহজ ও দ্রুত মানিয়ে যাওয়া, দেখলে লোকে ভাবতেই পারবে না যে ঢাকা শহরে আসবার আগে ওর স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের ধারণাতেও এসবের কিছুমাত্রও অস্তিত্বময় তো দূর কল্পলোকেও বিরাজ করছিল না। গতিময় দিনগুলোতে তবু সবকিছু একদম ঠিকঠাক। কোথাও কোনোকিছু নিয়েই জমিলার নেই একবিন্দু সমস্যা। শুধু মাঝ থেকে প্রোগ্রাম সেট করে মোটা অঙ্কের কমিশন দাবি করা হায়েনার মতো কুৎসিত কিছু মানুষকে তার জন্মের ঘৃণা। সৌভাগ্য, আজকাল ওইসব লোকের ছায়া না-মাড়িয়ে দিব্যি ভালোরকম কেটে যাচ্ছে তার দিন। তবে তার চাই কী আর!
তারপরও মাঝে মাঝে বুকের ভেতর মরুভূমির বালিঝড়ের মতোন তপ্ত বাতাসের তুফান বয়ে যায়– যদি কখনো একাকী সময় কাটাতে হয় কিছুটা। এই যে এত প্রেম, এত ভালোবাসা সব তো স্বার্থকেন্দ্রিক। নিঃস্বার্থ, কেবলই তার একার বুকের ভেতর থেকে ভালোবাসার মতো একজন কারো জন্যে বুকের ভেতরটা আকুলি-বিকুলি করে ওঠে সেই একাকী অসহনীয় যন্ত্রণার মুহূর্তটায়।
।। ছয় ।।
দেখতে নায়কের মতোন না-হোক মনটা আসমতের বড়োই দরাজ। একলা মানুষ। কী জানি এক বড়ো ব্যবসায়ীর সব কাজকাম দেখাশোনা করে সে। কামাই-রোজগারে কমতি নাই। মাঝে মাঝে মউজ-ফুর্তি করতে চায় মন, তাই এমন কোনো-একদিনে পরিচয় জমিলার সাথে। এরপর থেকে জমিলা ছাড়া আর কোনো সখ্য-তেষ্টা আসমতের নাই।
কিন্তু জমিলা এখনো গুছিয়ে উঠতে পারে না। এই স্বচ্ছন্দ স্বাধীন সচ্ছল জীবন তাকে প্রতি পদক্ষেপে আটকে রাখে এর বৃত্তে। সেইসাথে থেকে থেকে আরেকটা ভয় সরীসৃপের মতোন শীতল হিমস্রোত বইয়ে দেয় তার মনে। সবকিছু জেনে একান্ত হবার তীব্রতা যদি হোঁচট খায় অতীত-বর্তমানের শ্লেটে-পাথরে।
ভবিষ্যতের গাঁথুনিটা তার আর গাঁথা হয় না। এইরকম একটা অবস্থার ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে বলতে গেলে একটা বছর। এর মধ্যে উন্নতি বলতে– প্রতি সপ্তাহের একটা একাগ্র দিন, একান্তে, আলস্যে, খুনসুটিতে ওর ঘরে কাটিয়ে আসা।
তার আগের দিনটা, পরের দিনটা, অন্য সব দিনগুলো এখনো রোজই একঘেয়ে এক সুরে বেজে চলেছে বিরামহীন। এই একটা বছরেও এই এক দিনের সুর কিছুমাত্র ছেদ ঘটাতে পারেনি বাকি দিনগুলোর লয়ে, বাকি দিনগুলো যেমন পারেনি এই একটা দিনের গায়ে কোনো আঁচড় কাটতে। এটা মনে হলেই সম্ভাবনার দরজাটা যেন এক লাফে মাইলের পর মাইল দূরত্বে সরে যেতে থাকে। আনমনা হয়ে যায় জমিলা।
কখনো একাকী এমন ভাবনার ঢেউ প্রবল হলে আজকাল জোর শব্দে পার্টির নাচের গানগুলো থেকে বেছে বেছে বেশি প্রিয়গুলো বাজাতে থাকে একের পর এক। কখনো নাচতে থাকে একা ক্লান্তিতে ন্যুব্জ না-হওয়া পর্যন্ত।
তারপর। তারপর এক সময় ঘুম! অবসাদে বুজে থাকা চোখে অকস্মাৎ হয়তো সকালের আলো এসে ছুঁয়ে দেবার আগে লুকিয়ে ধরা দেয় নিদ্রা। ওইটুকুনই শ্রেয়তর সময়। ওইটুকুনই স্বপ্নময়, একান্ত একার হয়ে রয়। বাকি সব কেবলি বহমান... সম্ভাবনা আর সংশয়... বিনিময় সখ্যের ঘেরাটোপ... গদগদ আন্তরিকতার ঠুনকো আবর্তে দ্বিধাময়...
।। সাত ।।
দু'বছর আগে চলে যাওয়া মায়ের মুখটা মনে হয়। সময়মতো গিয়ে শেষ ক'টা দিন থাকতে পেরেছিল মায়ের সাথে। সৌভাগ্য... মা খুশিতে বুক ফুলিয়ে হাতে হাত রেখে যাবার আগে শুধু বলে গিয়েছিল... সব করলি এবার একটা সংসার কর। আশীর্বাদ করে যাই তোকে। তখনো আসমতের স্বপ্ন সম্ভাবনা তাকে ছোঁয়নি। সেই ভালো ছিল...
শনিবার বিকেলের অপেক্ষা একদিন শেষ হলো... খুব মন দিয়ে সেজেগুজে পৌঁছাল যখন, আসমত যেন চমকে উঠল। একবার হুঁকোর নল, একবার স্ফটিকের মতোন আলো ঠিকরানো গ্লাস... পালা করে ঠোঁট ছুঁতে ছুঁতে আসমতকেও যেন সে ইচ্ছে করেই থামিয়ে রাখল অনেকবার বারবার...
তন্দ্রাচ্ছন্ন হতে হতে মায়ের মাড় দেয়া সুতি শাড়ির চেনা গন্ধের গায়ে ভর করে সাত রাজ্যের সুখ যেন মাথার পাকে পাকে বাসা বাঁধছিল। ক্লান্ত আসমত যখন যত্ন করে তাকে একপাশে শুইয়ে দিচ্ছিল তখন ক্রমশ দূরে হাত নাড়তে থাকা মায়ের অস্পষ্ট ছবিটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল... একটু পরেই মা যেন এসে ছুঁয়ে দেবে জমিলার হাত... আলতো করে বেয়াড়া ক'টা চুল সরিয়ে শীতল কপাল...
ততোক্ষণে মেঘের আড়াল থেকে দল বেঁধে ভালোবাসার টানে জলেরা ছুটে এসে চুমে দিতে থাকল মাটি ও ঘাসের প্রান্তর... ততোক্ষণে বাতাসের গায়ে জলের সখ্য ছড়িয়ে দিতে থাকল হিমেল চাদর স্পর্শ...
শুধু মৃদু থেকে মৃদুতর হয়ে চললো আলাপ... ক্রমশ নিষ্প্রভ হতে থাকলো আলো...
গল্পের ডাল-পালাগুলো কখনো পাখি, কখনো সরীসৃপ হতে চাইলো কখনও। মাছের মতোন চঞ্চলতায় ভাসতে চাইলো অজানা অখ্যাত প্রণিধানযোগ্যতাহীন এক কি একাধিক মানুষের সাধারণ জীবন নিয়ে অঙ্কের সারল্যে ঘুরতে ঘুরতে গাঁথুনিতে নেমে গেল... গল্প-গাথার শ্লেটে আঁকিবুকি আর মোছামুছি সবশেষে একটা শূন্য হা করা নির্বিকার চেহারায় অর্থহীন সমাপ্তিতে একজন জামিলাকে খুঁজতে খুঁজতে হারিয়ে গেল।

পরিচিতি: কবি ও কথাকার, সম্পাদক ও প্রকাশক। নিবাস: ঢাকা, বাংলাদেশ।