এই সময়ের পশ্চিমবঙ্গ কোন পথে চলেছে তার কিছু দিক্ নির্দেশ সাম্প্রতিক খবরের কাগজে উঠে এসেছে। আগে এরকম দুটো চিত্র লক্ষ করা যাক:
চিত্র: এক – ৭ মে ডোমজুড়ের আজাদ হিন্দ ফৌজ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের সামনে এসে এক যুবক দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করে, আজ থেকে আর বোরখা পরে কেউ কলেজে আসতে পারবে না।
চিত্র: দুই – রাজ্যের একটি অঞ্চলে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সামনে কয়েকজন যুবক দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেয় যে, এখন থেকে সেই ভদ্রলোক আর তার জামাতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা রাখতে পারবেন না। কেননা বৃদ্ধের জামাতা মুসলিম, তাই হিন্দু পাড়ায় এরকম আচরণ চলবে না।
এমন অসংখ্য ঘটনা পাড়ায় পাড়ায়, অঞ্চলে অঞ্চলে শহরে-নগরে প্রতিমুহূর্তে ঘটে যাচ্ছে আজকের পশ্চিমবঙ্গে। মূল কথা হলো মানুষ কী খাবে কী পরবে, কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে অথবা কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না, সব কিছু ঠিক করে দেবে আজকের হিন্দুত্ববাদীরা। কয়েকশো বছর ধরে বহুত্ববাদের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল আমাদের রাজ্যে আজ কি তার গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটতে চলেছে? প্রশ্নটা সামনে এলো আজকের পটভূমিতে রামমোহন রায়কে আমরা কীভাবে দেখতে পারি, সেই আলোচনা প্রসঙ্গে। রামমোহন - বিদ্যাসাগর - অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ মনীষীর পথ ধরে বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি জীবনের যে জয়যাত্রা তা কি আজ বিপথগামী হয়ে পড়ল? রামমোহন রায়ের জীবন ও কর্ম আলোচনার ভিত্তিতে আজকের পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে রেমব্র্যান্ড পিল অঙ্কিত রাজা রামমোহন রায়-এর প্রতিকৃতি।
রামমোহন রায়ের (২২ মে, ১৭৭২ – ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩) আবির্ভাবের পটভূমিটি আগে দেখে নিই আমরা। তখন প্রকৃত অর্থেই ছিল 'অমাবস্যার অন্ধকার'। 'ভারত পথিক রামমোহন' রায় গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ সেই সময়টিকে চিহ্নিত করেন এভাবে: "শত শত বৎসর চ'লে গেল– ইতিহাসের পুরোগামিনী গতি হ'ল নিস্তব্ধ। ভারতবর্ষের মনোলোকে চিন্তার মহানদী গেল শুকিয়ে। তখন দেশ হ'য়ে পড়ল স্থবির, আপনার মধ্যে আপনি সংকীর্ণ, তার সজীব চিত্তের তেজ আর বিকীর্ণ হয় না দূর-দূরান্তরে। ...তখন জ্ঞানের চলমান গতি হ'ল অবরুদ্ধ, নির্জীব হ'ল নব নবনবোন্মেষশালিনী বুদ্ধি, উদ্ধত হ'য়ে দেখা দিল নিশ্চল আচারপুঞ্জ, আনুষ্ঠানিক নিরর্থকতা, মননহীন লোকব্যবহারের অভ্যস্ত পুনরাবৃত্তি।" এককথায় অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের বাংলার সমাজ পরিবেশ ছিল দূষিত। পুরোনো সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু নতুন কোনো ব্যবস্থার সূচনাও দেখা যাচ্ছিল না। মানুষ কপটতা, প্রবঞ্চনা এবং জাল-জুয়াচুরিতে হয়ে উঠেছিল অভ্যস্ত। সেই শিথিল আর্থসামাজিক পটভূমিতে ঘটে গিয়েছিল পলাশীর যুদ্ধ। ক্ষমতার হাত বদল হলো কিন্তু বৃহত্তর জনমানসে তার কোনো প্রতিফলন পড়ল না। অল্পসংখ্যক অর্থবান পরজীবী মানুষ ব্যসনে ডুবে ছিল। বিলাস প্রিয় এই মানুষগুলি পরবর্তীকালে চিহ্নিত হয়েছিল বাবু বলে। একদিকে চলছিল বাবু কালচার অন্যদিকে বাংলার অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিল। প্রাক্ ইস্ট ইন্ডিয়া পর্বে বাংলার অর্থনীতির যে স্বচ্ছলতা ছিল, তা এই সময়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই বিপর্যয়ের দুটি কারণ ছিল–প্রথম কারণ ছিল ইংরেজ শাসন এবং দ্বিতীয় কারণ হলো লাগাতার দুর্ভিক্ষ। ১৭৭০, ১৭৮৪, ১৭৮৭ এবং ১৭৮৯-র দুর্ভিক্ষে বাংলার অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়েছিল। এই বিপর্যস্ত আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আবির্ভাব ঘটেছিল রামমোহনের। আপন মনন শক্তির প্রাখর্যে তিনি অনায়াসে অতিক্রম করে যেতে পেরেছিলেন যুগ পরিবেশকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন: "সংস্কৃত, আরবী, পারসী, উর্দু, হিব্রু, গ্রীক, ল্যাটিন, ইঙ্গরেজী, ফরাসী এই নয় ভাষায় ব্যুৎপন্ন এবং বিলক্ষণ বুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন... যে সকল ব্যক্তির সহিত তাঁহার মতের ঐক্য ছিল না, তাঁহারাও তদীয় বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করিতেন, রামমোহন রায় এ দেশের এক অসামান্য মনুষ্য ছিলেন, সন্দেহ নাই।" কীভাবে গড়ে উঠেছিলেন এই অসামান্য মানুষটি তাঁর নিজের ভাষায় জানা যাক: "আমার পিতৃ বংশের প্রথা ও আমার পিতার ইচ্ছানুসারে আমি পারস্য ও আরব্য ভাষা শিক্ষা করিয়াছিলাম। ...আমার মাতামহ বংশের প্রথানুসারে আমি সংস্কৃত ও উক্ত ভাষায় লিখিত ধর্ম্মগ্রন্থ সকল অধ্যয়নে নিযুক্ত হই; হিন্দু সাহিত্য, ব্যবস্থা ও ধর্ম্মশাস্ত্র সকলই উক্ত ভাষায় লিখিত।
ষোড়শ বৎসর বয়সে আমি হিন্দুদিগের পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে একখানি পুস্তক রচনা করিয়াছিলাম। উক্ত বিষয়ে আমার মতামত এবং ওই পুস্তকের কথা সকলে জ্ঞাত হওয়াতে আমার একান্ত আত্মীয়দিগের সহিত আমার মনান্তর উপস্থিত হইল। মনান্তর উপস্থিত হইলে আমি গৃহ পরিত্যাগপূর্ব্বক দেশভ্রমণে প্রবৃত্ত হইলাম।...
আমার সমস্ত তর্ক বিতর্কে আমি কখন হিন্দু ধর্ম্মকে আক্রমণ করি নাই। উক্ত নামে যে বিকৃত ধর্ম্ম এক্ষণে প্রচলিত, তাহাই আমার আক্রমণের বিষয় ছিল।"
উদ্ধৃত অংশের শেষ বাক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রধানত হিন্দু ধর্মের এবং তারসঙ্গে অন্যান্য ধর্মেরও নানান বিকৃতির বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তিনি আরবি, ফারসি, সংস্কৃতর পাশাপাশি গ্রিক, ল্যাটিন সহ একাধিক ইয়োরোপীয় ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন এবং সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বেদ, উপনিষদ, কোরান, বাইবেল প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করে তার মূল্যায়ন করেছিলেন একজন ভারতীয় হিসাবে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে। তিনি হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম এবং খ্রিস্ট ধর্ম– এই তিন ধর্মেরই প্রচলিত ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করেননি, তার পরিবর্তে তিনি নতুন ভাষ্য উপস্থিত করেছিলেন, তাই তিন ধর্মেরই সনাতনী প্রবক্তারা রুষ্ট হন। শোভনলাল দত্তগুপ্ত এই প্রসঙ্গে লিখেছেন: "হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রে রামমোহন জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে এবং সওয়াল করেছিলেন একেশ্বরবাদের পক্ষে, যার ভিত্তি ছিল উপনিষদ। খ্রিস্টধর্মের প্রচলিত ব্যাখ্যাতে যিশুকে যেভাবে ঈশ্বরের দূত হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয় রামমোহন সেটিকে খারিজ করে একদিকে যেমন খ্রিস্টধর্মেরও একটি একেশ্বরবাদী ব্যাখ্যা দিলেন অপরদিকে হিন্দু বিরোধী প্রচার এবং ধর্মান্তকরণেরও তীব্র সমালোচনা করলেন। একইভাবে তিনি ইসলামের যে ভাষ্যটি গ্রহণ করেছিলেন এবং তার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন গোঁড়া মুসলমানেরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে রামমোহন বিরোধিতায় অবতীর্ণ হলেন।" অর্থাৎ কঠিন যুক্তি জালে রামমোহন প্রচলিত ধর্মমতগুলিকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতে রুষ্ট হয়েছিলেন প্রতিটি ধর্মের রক্ষণশীল গোষ্ঠী। আর কি করেছিলেন তিনি? তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন মধ্যযুগের শেষ সীমায়, আধুনিক যুগ তখনো ভবিষ্যতের গর্ভে, তিনি প্রায় একক প্রচেষ্টায় মধ্যযুগের অন্ধকার দুহাতে সরিয়ে আধুনিকতার দ্বার উদ্ঘাটন করেছিলেন। তিনি ভারতবর্ষে মুক্তচিন্তার প্রতীক। তিনি আবেগের দ্বারা কখনও পরিচালিত হননি, নিজস্ব যুক্তি ও বিচার বিবেচনাকে আশ্রয় করে তিনি সমাজ, ধর্ম ও দেশের কাজে অগ্রসর হয়েছিলেন। প্রকৃত অর্থে তিনিই প্রথম বিশ্ব নাগরিক, প্রকৃত বিশ্বায়নের প্রবক্তা। দেশবাসীর অন্ধ কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও মানসিক জড়তা দূর করার তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। তিনি জানতেন এইসব অন্ধ বিশ্বাস দূর করার জন্য চাই শিক্ষার আলো, তাই শিক্ষা সংস্কার ও শিক্ষা প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রচলিত সংস্কৃত শিক্ষা পদ্ধতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৮২৩ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্টকে এক পত্রে তিনি লেখেন: "...The Sanskrit system of education would be the best calculated to keep this country in darkness." নিজে বেদান্তের প্রচারক হয়েও তিনি সাধারণের জন্য বেদান্ত শিক্ষার বিরোধিতা করেন, কারণ বেদান্ত মানুষকে জীবন বিমুখ করে। আধুনিক যুগের উপযোগী করে গড়ে তুলতে ছাত্র-ছাত্রীদের গণিত, বিজ্ঞান, রসায়ন ইত্যাদি পড়ানোর সুপারিশ করেন: " But as the improvement of the native population is the object of the government, it will consequently promote a more liberal and enlightened system of instruction, embracing Mathematics, Natural Philosophy, Chemistry, Anatomy with other useful Sciences."

শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি তিনি ধর্ম সংস্কারেও অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম ধর্মের একেশ্বরবাদ এবং হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের ব্রহ্মজ্ঞান তাঁর মনে একেশ্বরবাদ-এর বীজ বপন করে। তিনি হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। অনেকে মনে করেন, তিনি হিন্দু ধর্মের বিরোধী ছিলেন। রামমোহন স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, তিনি হিন্দু ধর্মের বিরোধী নন। হিন্দু ধর্মের নামে যে অধর্ম চলছে, তিনি তার বিরুদ্ধে। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন: "আমার সমস্ত তর্ক বিতর্কে আমি কখনো হিন্দু ধর্ম্মকে আক্রমণ করি নাই। উক্ত নামে যে বিকৃত ধর্ম্ম এক্ষণে প্রচলিত, তাহাই আমার আক্রমণের বিষয় ছিল। আমি ইহাই প্রদর্শন করিতে চেষ্টা করিয়াছিলাম যে, ব্রাহ্মণদিগের পৌত্তলিকতা, তাঁহাদিগের পূর্ব্বপুরুষদিগের আচরণের ও যদনুসারে তাঁহারা চলেন বলিয়া স্বীকার পান, তাহার মতবিরুদ্ধ।"
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাতেও তিনি ছিলেন সমগ্র দেশে পথপ্রদর্শক। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তথ্য ও যুক্তির যে ব্যূহ তিনি নির্মাণ করেছিলেন, আজকের দিনেও তা বিস্ময়কর। গ্রন্থ দুটি হল 'সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ' ১৮১৮) এবং 'প্রবর্তক ও নিবর্তকের দ্বিতীয় সম্বাদ' (১৮১৯)।
আনুমানিক ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র একত্রিশ-বত্রিশ বছর বয়সে তিনি ফারসি ভাষায় একটি অনন্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন 'তুহ্ফৎ-উল- মুওয়াহিদ্দীন'। তিনি তাঁর সময় থেকে যে কতটা অগ্রসর ছিলেন, এই শীর্ণকায় পুস্তিকাটি তার নির্ভুল পরিচয় বহন করে। আজও এই গ্রন্থের কিছু কিছু অংশকে রীতিমতো বৈপ্লবিক বলে মনে হয়। আজকের সমাজও প্রস্তুত নয় সেই বৈপ্লবিক উচ্চারণ গ্রহণ করতে। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধর্মগুরুরা প্রায়ই নিজেদের বক্তব্য প্রচার করার জন্য অলৌকিকতার আশ্রয় গ্রহণ করেন। রামমোহন লিখলেন, অলৌকিকতার আড়ালে যা ঢাকা পড়ল তা অসত্য ও অন্যায়। ধর্মের নামে নির্যাতন ও নরহত্যার প্রতিবাদ করে তিনি লেখেন: "অধিকাংশ লোককেই এইসব নেতারা তাঁদের দিকে এমনভাবে আকর্ষণ করেছেন যে ঐ অসহায় মানুষগুলি বাধ্যতা ও দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, এবং তাদের দেখবার চোখ ও বুঝবার হৃদয় সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলেছে। তাই নেতাদের হুকুম তামিল করবার সময় তারা সত্যিকার মঙ্গল ও সুস্পষ্ট পাপের মধ্যে প্রভেদ করাকেও অপরাধ বলে মনে করে।" প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ পাঠ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন: "মানুষ তাদের অমূল্য সময় এবং এমন সব পুরাণ কাহিনী পাঠ করে কাটায় যেগুলো বিশ্বাস করাও কঠিন। অথচ এতেই প্রাচীন ও নবীন নেতাদের উপর তাদের বিশ্বাস যেন আর-ও দৃঢ় হয়।" কোনো একটি ধর্মমত প্রসঙ্গে কেউ যদি কোনো প্রশ্ন তোলেন তাহলে '...সেই ধর্মাবলম্বীরা সাধারণতঃ এরূপ প্রচেষ্টাকে শয়তানের প্ররোচনা বলেই ধরে নেয়।' বহু বছর ধরে একটি ধর্মমতে বিশ্বাস রাখতে রাখতে মানুষ কিভাবে সত্যবোধ হারিয়ে ফেলে সে প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন: '...এটা স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে এরূপ দৃঢ়তার সঙ্গে কোন বিশেষ ধর্ম্মমত আঁকড়ে ধরার পর এবং সেই মতের সত্যাসত্য সম্বন্ধে কোন অনুসন্ধান না করে নির্ব্বিচারে বহু বৎসর বিশ্বাস করবার পর, সেই সব ধর্ম্মমতের সত্যিকার প্রকৃতি নির্ণয় করতে মানুষ সাবালক হয়েও সক্ষম হয় না।" ধর্মবিশ্বাসী মানুষদের ওপর গুরুদের প্রভাব আলোচনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন: "এই সব গুরুদের চেলার উপর এমনই প্রভাব, ও চেলাদের বশ্যতাও এমন বিষম যে কেউ কেউ তাদের গুরুদের কথামত একটা পাথর কিংবা উদ্ভিদ, কিম্বা জন্তু-জানোয়ারকেই প্রকৃত উপাস্য দেবতা বলে মনে করে।" আজকের হিন্দুত্ববাদীরা যেমন গোরুকে তাদের উপাস্য দেবতা বলে মনে করে। মানুষ কীভাবে স্বাভাবিক বিচারবোধ হারিয়ে ফেলে এখানে সে কথাই বলা হয়েছে। তাঁর স্পষ্ট অভিমত, ধর্মগুরু নবিরা ঈশ্বর প্রেরিত নন। গ্রন্থটি শেষ হয়েছে পৃথিবীতে চার শ্রেণির মানুষের কথা বলে। তাঁর মতে মানুষ চার শ্রেণির –
এক। প্রতারক।
দুই। প্রতারিত।
তিন। প্রতারক ও প্রতারিত।
চার। প্রতারক নয় প্রতারিত-ও নয়।
প্রথম শ্রেণি নানা মতবাদ, ধর্মমত ও বিশ্বাস প্রচার করে মানুষকে দলে টানতে চায়। দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ সত্যানুসন্ধান না করেই যে কোনো একটি সত্যকে আঁকড়ে ধরে। তৃতীয় শ্রেণির মানুষ অন্যের বক্তব্য বিশ্বাস করে এবং অন্যকেও তা বিশ্বাস করায়। চতুর্থ শ্রেণির মানুষই প্রকৃতপক্ষে মুক্তবুদ্ধির মানুষ। সারা জীবন ধরে তিনি এই মুক্তবুদ্ধির চর্চা করে গেছেন।
আজকের ভারতবর্ষে ধর্ম, জাতপাত, ঈশ্বর, ধর্মীয় রীতিনীতি বিষয়ে যে সমস্ত কোলাহল উপস্থিত হচ্ছে তাতে রামমোহনের চিন্তাভাবনা নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। বস্তুত বিগত আড়াইশো বছরে আমাদের কতটা অগ্রগতি হলো তাও ভাবতে হবে। ধর্মগ্রন্থগুলির সারসত্য জেনে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে যেভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন আজকের দিনেও তা বিস্ময়কর। দেশজুড়ে ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে যে সমস্ত অবৈজ্ঞানিক এবং অযৌক্তিক বাগাড়ম্বর চলছে তখন বারে বারে আমাদের রামমোহন, বিদ্যাসাগরের কাছে ফিরে যেতে হয়। আজও রামমোহন আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠেন।

পরিচিতি: কো-অর্ডিনেটর, স্নাতকোত্তর বাংলা বিভাগ, নবগ্রাম হীরালাল পাল কলেজ, কোন্নগর, হুগলি। প্রাবন্ধিক। রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘ। কোন্নগর, হুগলি।