বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভুবনে কাজি নজরুল ইসলাম(২৪ মে, ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট, ১৯৭৬)-এর আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল এক অনন্য এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে। তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভায় আলোকিত হয়েছিল বাংলা কাব্য ও সাহিত্যের অঙ্গন। তাঁর সৃষ্টিতে প্রতিফলিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক চেতনা উদ্বেলিত করেছিল দেশবাসীকে, বিশেষ করে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে রত যুবসমাজকে। তাঁর কাব্যে প্রতিফলিত সাম্প্রদায়িক কলুষতায় দীর্ণ সমাজে গোঁড়া মৌলবাদীদের ভণ্ডামি, জাতপাত- অস্পৃশ্যতা ও নানা ভেদ-বিভেদের বিরুদ্ধে সাম্য-মৈত্রী ও সম্প্রীতির বাণী জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলার সমাজ-জীবনকে চিরন্তন মানবিক সম্পর্কের নিবিড় বন্ধনে জড়াতে সাহায্য করেছিল। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন মানবপ্রেমিক,আবার অন্যদিকে ছিল তাঁর দৃপ্ত বিদ্রোহী সত্তা। এসব কিছু ছাপিয়ে তাঁর মধ্যে জাগরূক আন্তর্জাতিকতাবোধ ও সাম্যবাদী চেতনার বিচ্ছুরণ তাঁর কাব্যে বিদ্রোহ-বিপ্লবে স্পন্দিত এক নতুন প্রবাহের উন্মেষ ঘটিয়েছিল। প্রকৃত অর্থেই 'বিদ্রোহী' র উদ্দাম ছন্দ ও বজ্র নির্ঘোষে,'অগ্নিবীণা' র দৃপ্ত ঝংকারে নিস্তেজ জাতির জীবনে এনেছিলেন সংগ্রাম-দ্রোহের এক দুর্বার স্পন্দন। তাই তাঁর লেখনীতে নিঃসৃত হয়েছে সেই অমোঘ পঙ্ক্তি –
"আমি সেই দিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।" ('বিদ্রোহী')
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর নজরুল বাংলার সাহিত্য-ভুবনে 'ধূমকেতু'র মতোই উদয় হয়েছিলেন। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার আগেই তিনি আকস্মিকভাবে কণ্ঠরুদ্ধ (১৯৪২) হয়ে সৃষ্টির জগৎ থেকে চিরতরে দূরে সরে গিয়ে সংবিৎহারা হয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় ছিলেন জীবনের অন্তিমকাল (১৯৭৬) পর্যন্ত। তাই ভেবে বিস্মিত হতে হয় যে, মাত্র ২২-২৩ বছরের সাহিত্য জীবনে তিনি কবিতা,গান,প্রবন্ধ,গল্প ইত্যাদি অসামান্য সব সৃষ্টির মাধ্যমে এবং 'ধূমকেতু', 'লাঙল'-এর মতো যুগান্তসৃষ্টিকারী পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনমানসে কী পরিমাণ আলোড়ন তৈরি করতে পেরেছিলেন। এমন নজির মেলা ভার।
আজকের এই জটিল সময়ে নজরুল-জীবনের বহুদা বিস্তৃত বিচিত্র কর্মকাণ্ডের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিসংবাদের বিরুদ্ধে তাঁর দৃপ্ত প্রতিবাদ এবং সৃজন-সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
শৈশব-কৈশোরের বিচিত্র অভিজ্ঞতা
একেবারে ছেলেবেলাতেই নজরুলকে সীমাহীন দারিদ্র্য, দুঃখ-যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হয়েছে । এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ওই বয়সেই তাঁকে জীবন সংগ্রামে নামতে হয়েছে। তাঁর যখন মাত্র ন'বছর বয়স তখন তাঁর বাবা কাজি ফকির আহমেদের মৃত্যু হয়। এর ফলে তাঁদের পরিবারে অভাবের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। এই অবস্থায় মা জাহেদা খাতুন অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে সংসার প্রতিপালন করেছেন। পিতৃহীন পরিবারে আর্থিক কষ্টের চাপ ছেলেবেলায় নজরুলের উপর এসে পড়ে। ১৯১০ সালে দশ বছরের নজরুল গ্রামের মক্তবের পাঠ শেষ করেন এবং কিছু পয়সা উপার্জনের জন্য ওই মক্তবেই প্রায় সম বয়সিদের পড়ানোর দায়িত্ব নেন। জানা যায়, পার্শ্ববর্তী একটি মাজারে নজরুলকে 'খাদেম' অর্থাৎ সেবায়েতের কাজও করতে হয়েছে। এছাড়া মসজিদে 'ইমামতি' অর্থাৎ দেখাশোনার কাজও করেছেন।
১৯১১ তিনি বর্ধমান জেলার মাথরুন গ্রামে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউটে ভরতি হয়েছিলেন। তখন ওই স্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। ওই সময়েই পারিবারিক যোগসূত্রে অংশ নেন লেটো গানের দলে। ওই বাল্যকালেই তিনি সংসারে নিদারুণ অর্থ কষ্টের জন্য রানিগঞ্জে এসে এক রেলওয়ে গার্ডের বাড়িতে বাবুর্চির কাজ নেন। এছাড়া আসানসোলে মাসিক একটাকা মাইনেতে রুটির দোকানে কাজ করেছেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, শৈশব-কৈশোরের এই সব বিচিত্র কাজের ফাঁকে তিনি সুযোগ মতো পড়াশোনাও চালিয়ে গেছেন। ছোট্ট বয়সেই উপার্জনের তাগিদে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে এবং লেটো গানের দলের সঙ্গে গ্রামগঞ্জে ঘুরে তিনি গ্রাম-সমাজের মধ্যে চলা শোষণ, বঞ্চনা, জাত-পাত, উঁচু-নিচু ও ধর্মীয় ভেদাভেদ প্রথা, প্রতারণা ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করেছেন। এবং তাঁর মনের গভীরে এসবের প্রতিবিধানের ভাবনা সঞ্চিত হয়েছে। আর এই ভাবনা থেকেই তার মধ্যে প্রতিবাদের স্পৃহাও সঞ্চারিত হয়েছে। জীবনে বেড়ে ওঠার সন্ধিক্ষণে একটা দীর্ঘ পর্ব জুড়ে এই সমস্ত অভিজ্ঞতা নজরুলকে লড়াই করে বেঁচে থাকারও প্রেরণা জুগিয়েছে।
বিপ্লবী চেতনার উদ্ভাস
নিবন্ধের মূল বিষয়ে যাবার আগে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, দু'জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব নজরুলকে সংগ্রামী চেতনায় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ হতে অনেকটাই সাহায্য করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন শিয়ারশোল রাজ স্কুলের শিক্ষক নিবারণ চন্দ্র ঘটক এবং দেশের বুকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার অন্যতম পথিকৃৎ মুজফ্ফর আহ্মদ । শিক্ষক নিবারণ চন্দ্র ঘটক ছিলেন বিপ্লবী যুগান্তর দলের সদস্য। তিনিই নজরুলের মনের গভীরে স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপ্ন সঞ্চারিত করেন এবং স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে সজাগ করেন। মেধাবী ছাত্র নজরুল ম্যাট্রিক পরীক্ষা না দিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যোগ দেন। চলে যান করাচির সেনা নিবাসে। এখানে তিনি হাবিলদার পদে উন্নীত হয়েছিলেন,তিনি ছিলেন রসদ ভাণ্ডারের দায়িত্বে। মাঝে মাঝে নৌশেরায় ট্রেনিংয়ে যাওয়া ও করাচি শহরে কেনাকাটা করতে যাওয়া ছাড়া কোয়ার্টারে সীমাবদ্ধ জীবন ছিল তাঁর। এই সেনানিবাসে তাঁর পড়াশোনা, লেখালেখি, নানা বাদ্যযন্ত্র শেখা, পাঞ্জাবি মৌলবির কাছে আরবি-ফারসির তালিম নেওয়া, স্বরলিপি দেখে রবীন্দ্র সংগীত শেখা, বিপ্লবী পত্র-পত্রিকা গোপনে পড়া, বেশ কিছু বাংলা পত্রপত্রিকার চাঁদা দিয়ে গ্রাহক হয়ে নিয়ম করে আনানো ও পড়া – এই ছিল তাঁর নিবিড় নিচ্ছিদ্র দিনলিপি। বলা যেতে পারে, নজরুলের সাহিত্যচিন্তা, সমাজ ভাবনা ও আন্তর্জাতিক চেতনার আলোকে মুক্তি সংগ্রামী কবি হয়ে ওঠার প্রস্তুতিপর্ব রচিত হয়েছিল এখানেই। মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবে লাল ফৌজের বিজয়বার্তা শুনে উচ্ছ্বসিত নজরুল এখানেই এক সন্ধ্যায় সঙ্গী বন্ধুদের নিয়ে আলোচনা, প্রবন্ধ পাঠ, ও গানের মধ্য দিয়ে আনন্দ উদ্যাপন করেছিলেন। আরেকটি বিষয় সহজেই অনুমান করা যায়, হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষ কলুষ ঘোচাবার দৃঢ় মনোভূমি তাঁর গড়ে উঠেছিল করাচির এই সেনানিবাসেই। এখানে বসেই কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ ও গল্প কবিতা পাঠানোর সূত্রপাত। ১৯১৯ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়' নজরুলের লেখা প্রথম কবিতা 'মুক্তি' প্রকাশিত হয়। এই সূত্রেই তার সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয় মুজফ্ফর আহ্মদ-এর। তিনি সেই সময়ে ছিলেন 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা' র সহ-সম্পাদক। পরবর্তীকালে ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে থাকার সময়েই নজরুল তাঁর অনন্য সৃষ্টি ' বিদ্রোহী ' কবিতা রচনা করেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের একেবারে প্রাথমিক প্রয়াসে (১৯২১) নজরুল ছিলেন মুজফ্ফর আহ্মদের অন্যতম সহযোগী। ১৯২৫ সালে দেশের মধ্যে প্রথম বাংলায় 'ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টি' গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠার সময় এই পার্টির নাম ছিল'লেবার স্বরাজ পার্টি অফ দ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস'। এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন নজরুল ইসলাম। জেল থেকে মুক্তি পাবার পর তিনি ক্রমশ অধিক মাত্রায় ঝুঁকে ছিলেন সাম্যবাদী মতাদর্শের দিকে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো,পরিপূর্ণভাবে সাম্যবাদী মতাদর্শ গ্রহণ করে তিনি যেমন কখনো কমিউনিস্ট হয়ে ওঠেননি, তেমনি তিনি কোনোদিন কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে আসেননি। তথাপি সাম্যবাদী মতাদর্শের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল অটুট। যার প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর রচিত বিভিন্ন কবিতায়,গানে,গল্পে ও উপন্যাসে।
ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিসংবাদের বিরুদ্ধে
আজ আমাদের দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নজরুলকে স্মরণ করতে গেলে অথবা তাঁর জীবন ও সৃষ্টি সম্ভারের দিকে দৃষ্টিপাত করলে অন্যান্য দিকের সাথে জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অস্পৃশ্যতা, বিভেদ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর দৃপ্ত বলিষ্ঠ অবস্থান ও প্রতিবাদী ভূমিকা বিশেষভাবে সামনে চলে আসে। তাঁর জীবন ও চিন্তা শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছিল না,তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দৃঢ়চিত্তে লড়াই করেছেন। আজ সাম্প্রদায়িক হিংসা-জর্জর ও নানা সংকটে দীর্ণ ভারতে,এমনকী উপমহাদেশে বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্বেষ-সন্ত্রাসে, শোষণ-বঞ্চনা-অত্যাচারে, ঘৃণা ও সংঘাতে মানবতা ক্ষতবিক্ষত ও বিপর্যস্ত। অন্ধকারের অশুভ শক্তি উন্মত্ত উল্লাসে ক্ষত-বিক্ষত করছে মানবিক মূল্যবোধ, লাঞ্ছিত করছে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে, আক্রান্ত হচ্ছে পরমতসহিষ্ণুতার চিরন্তন আদর্শ। আমাদের দেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির বর্ণময় মালাটিকে ছিন্নভিন্ন করার নানারকম অপচেষ্টা চলছে। এই চরম বিপর্যয় কালে আমাদের স্মরণে আসে বিদ্রোহী কবির সেই অনবদ্য সৃষ্টি, যা সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের বিবেককে জাগ্রত করে এবং হীন চক্রান্তকারী মনুষ্যত্বহীনদের প্রতি কশাঘাত হানে –
"অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানেনা সন্তরণ,
কান্ডারী! আজদেখিব তোমার মাতৃমুক্তি-পণ!
'হিন্দু না ওরা মুসলিম ? ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?
কাণ্ডারী! বলো, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা'র!" ('কাণ্ডারী হুঁশিয়ার')
কাজী নজরুল ইসলামের কবিরূপে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে ধর্মীয় অনুশাসন ও ভেদাভেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি 'বিদ্রোহী' কবিতায় স্পর্ধার সঙ্গেই উচ্চারণ করেছেন:
"আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান – বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন!
আমি স্রষ্টা সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন।
আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান – বুকে এঁকে দেবো পদচিহ্ন।
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন।"
সমাজে যারা হীন স্বার্থে ধর্মগ্রন্থের দোহাই দিয়ে মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদি দখল করে গোঁড়া ধর্মীয় অনুশাসন ও রক্ষণশীলতার আবরণে মানবতাকে অবদমিত করে, তাদের প্রতি তীব্র ধিক্কার জানিয়ে তিনি লিখেছেন:
"হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়
মানুষেরে ঘৃণা করি'
ও' কারা কোরাণ,বেদ,বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি!
ও মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর ক'রে কেড়ে
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।
পুজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল। – মূর্খরা সব, শোনো
মানুষ এনেছে গ্রন্থ ; গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!" ('সাম্যবাদী' – 'মানুষ')
নজরুলের বস্তুবাদী উন্নত চেতনা ও মানুষের বিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছিল বলেই ধর্মের নামে ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করতে পেরেছিলেন। যে ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে এবং যে ধর্মকে হাতিয়ার করে একদল মানুষ একটা বিশাল অংশের মানুষকে শোষণ করে – সেই ধর্মকে কখনোই মানতে চাননি নজরুল। এর বিরুদ্ধেই বিভিন্ন সময় তাঁর লেখনী গর্জে উঠেছে। তিনি বেশ কিছু কবিতা, প্রবন্ধ ও হাসির গানে তাঁর জেহাদ ঘোষণা করেছেন। এ প্রসঙ্গেই উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯২৬ সালে কলকাতায় পরপর তিনবার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়েছিল। এই দাঙ্গার খবরে বিচলিত ও ক্ষুব্ধ হন কাজী নজরুল। সেই সময় তিনি কৃষ্ণনগরে ব্যস্ত ছিলেন রাজনৈতিক সম্মেলন ও যুব সম্মেলনের প্রস্তুতিতে। উদ্দেশ্য ছিল যুব সমাজকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প থেকে মুক্ত রাখা। তখন মুজফ্ফর আহ্মদের উদ্যোগে দাঙ্গার বিরুদ্ধে বাংলায় ও উর্দুতে ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছিল। এই ইশতেহারে স্বাক্ষর করেছিলেন নজরুল। এমনই এক দুঃসময়ের অভিঘাতে নজরুল রচনা করেছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত গান – 'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার'।
এই দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি রচনা করেন ' মন্দির ও মসজিদ' এবং 'হিন্দু ও মুসলমান' প্রবন্ধ দু'টি। 'মন্দির ও মসজিদ' প্রবন্ধে তিনি এক জায়গায় লিখছেন:
"মারো শালা যবনদের"। "মারো শালা কাফেরদের"। আবার হিন্দু-মুসলমানী কাণ্ড বাঁধিয়া গিয়াছে। প্রথমে কথা কাটাকাটি, তারপর মাথা-ফাটাফাটি আরম্ভ হইয়া গেল। আল্লার এবং মা কালীর 'প্রেষ্টিজ' রক্ষার জন্য যাহারা এতক্ষণ মাতাল হইয়া চীৎকার করিতেছিল, তাহারাই যখন মার খাইয়া পড়িয়া যাইতে লাগিল – দেখিলাম, তখন আর তাহারা আল্লামিঞা বা কালী ঠাকুরাণীর নাম লইতেছে না। হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি পড়িয়া থাকিয়া এক ভাষায় আর্তনাদ করিতেছে "বাবা গো মা গো"। – মাতৃ পরিত্যক্ত দুটি বিভিন্ন ধর্মের শিশু যেমন করিয়া এক সুরে কাঁদিয়া তাহাদের মাকে ডাকে।
দেখিলাম হত আহতদের ক্রন্দনে মসজিদ টলিল না, মন্দিরের পাষাণ দেবতা সাড়া দিল না। শুধু নির্ব্বোধ মানুষের রক্তে তাহাদের বেদী কলঙ্কিত চির কলঙ্কিত হইয়া রহিল।" ('রুদ্র মঙ্গল', পৃষ্ঠা-৩৬) (বানান অপরিবর্তিত)
এই প্রবন্ধেরই আরেকটি জায়গায় তিনি লিখেছেন:
"মানুষের কল্যাণের জন্য ঐ সব ভজনালয়ের সৃষ্টি, ভজনালয়ের মঙ্গলের জন্য মানুষ সৃষ্ট হয় নাই। আর যদি আমাদের মাতলামির দরুন ওই ভজনালয়ই মানুষের অকল্যাণের হেতু হইয়া ওঠে – যাহার হওয়া উচিত ছিল স্বর্গ মর্ত্যের সেতু – তবে ভাঙ্গিয়া ফেল ঐ মন্দির মসজিদ। সকল মানুষ আসিয়া দাঁড়াইয়া বাঁচুক এক আকাশের ছত্রতলে, এক চন্দ্র-সূর্য-তারা জ্বালা মহামন্দিরের আঙিনাতলে।" (ওই, পৃষ্ঠা: ৩৮)
আবার ধর্মকে কপট স্বার্থে ব্যবহার করে যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে মত্ত, তাদের স্বরূপ উন্মোচন করে তিনি লিখেছেন:
"মানুষের পশুপ্রকৃতির সুবিধা লইয়া ধর্ম মদান্ধদের নাচাইয়া কত কাপুরুষই না আজ মহাপুরুষ হইয়া গেল।" (ওই, পৃষ্ঠা: ৪৫)
আবার উগ্র ধর্মান্ধদের ভিতরের হিংস্র ও কুৎসিত প্রবৃত্তিকে তুলে ধরতে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে 'হিন্দু- মুসলমান' প্রবন্ধে লিখেছেন:
"একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু মুসলিম সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বললেন, দেখ যে ন্যাজ বাইরের তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভেতরের ন্যাজকে কাটবে কে?
হিন্দু-মুসলমানের কথা উঠলে আমার বারে বারে গুরুদেবের ঐ কথাটাই মনে হয় । সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদয় হয় মনে যে, এ ন্যাজ গজালো কি করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়? ঐ সঙ্গে এটাও মনে হয়, ন্যাজ যাদেরই গজায় – তা ভেতরেই হোক আর বাইরেই হোক – তারাই হয়ে ওঠে পশু। যেসব ন্যাজওয়ালা পশুর হিংস্রতা সরল হয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে – শৃঙ্গরূপে, তাদের তত ভয়ের কারণ নেই,যত ভয় সেই সব পশুদের দেখে – যাদের হিংস্রতা ভেতরে, যাদের শিং মাথা ফুটে বেরোয়নি। শিং-ওয়ালা গরু মহিষের চেয়ে শৃঙ্গহীন ব্যাঘ্র-ভল্লুক জাতীয় পশুগুলো বেশী হিংস্র – বেশী ভীষণ। এ হিসেবে মানুষও পড়ে শৃঙ্গহীন বাঘ ভালুকের দলে। কিন্তু বাঘ ভালুকের তবু ন্যাজটা বাইরে, তাই হয়ত রক্ষে কেননা, ন্যাজ আর শিং দুই ভিতরে থাকলে কী রকম হিংস্র হয়ে উঠতে হয়, তা হিন্দু-মুসলমানের ছোরা মারা না দেখ্লে কেউ বুঝতে পারবে না।"
প্রবন্ধের এই অংশে তিনি আরো বলেছেন,"যে প্রশ্ন করিয়াছিলাম, এই যে ভিতরের ন্যাজ, এর উদ্ভব কোথায়? আমার মনে হয় টিকিতে ও দাড়িতে। টিকিপুর ও দাড়িস্তানই বুঝি এর আদি জন্মভূমি। পশু সাজবার মানুষের এ কি 'আদিম' দুরন্ত ইচ্ছা। ন্যাজ গজালো না বলে তারা টিকি দাড়ি জন্মিয়ে সান্ত্বনা পেল।" ('রুদ্র-মঙ্গল', পৃষ্ঠা: ৫৩-৫৪)
আমরা লক্ষ করি জাতের নামে বিদ্বেষ, ধর্মের নামে যারা মানুষকে বিভক্ত করে তাদের প্রতি তীব্র ধিক্কার জানিয়ে তিনি 'জাতের বজ্জাতি' কবিতায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারণ করেছেন:
"জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াত খেলছ জুয়া
ছুঁলেই তোর জাত যাবে, জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া।
হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি ভাবলি এতেই জাতির জান
তাই তো বেকুব,করলি তোরা এক জাতিকে একশোখান।
এখন দেখিস ভারত-জোড়া পচে আছিস বাসি মড়া
মানুষ নাই আজ আছে শুধু জাত-শেয়ালের হুক্কাহুয়া।"...
নজরুলের সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা 'ধুমকেতু' পত্রিকা প্রকাশ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল এই পত্রিকা (১১ আগস্ট, ১৯২২)। এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছেন:
"'মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে' 'জয় প্রলয়ংকর' বলে 'ধূমকেতু' কে রথ করে আমার যাত্রা শুরু হল। আমার কর্ণধার আমি। আমায় পথ দেখাবে আমার সত্য। আমার যাত্রা শুরুর আগে আমি সালাম জানাচ্ছি – নমস্কার করছি আমার সত্যকে।... দেশের যারা শত্রু, দেশের যা কিছু মিথ্যা, ভণ্ডামি মেকি তা সব দূর করতে ধূমকেতু হবে আগুনের সম্মার্জনী... ধুমকেতু কোনো সাম্প্রদায়িক কাগজ নয়। মানুষ-ধর্মই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম। হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে যেখানে প্রাণ প্রাণের মিল, আদতে সত্যের মিল, সেখানে ধর্মের বৈষম্য, কোনো হিংসার দুশমনির ভাব আনে না। যার নিজের ধর্মে বিশ্বাস আছে, যে নিজের ধর্মের সত্যকে চিনেছে সে কখনো অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না।"...
মুক্ত জীবনচর্যা
নজরুল ইসলামের জীবন দর্শন ও জীবনযাপনের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। ব্যক্তিজীবনে দীর্ঘ সময় তিনি কোনো ধর্মাচরণ করেননি। প্রমীলা সেনগুপ্তকে বিয়ের সময় তাকে ধর্মান্তরিতা করা বা মুসলিম বিবাহ প্রথা অনুসরণ করেন নি। সন্তানদের নামকরণের সময় তিনি কোনো ধর্মীয় পদ্ধতি পালন করেননি।পুত্রদের নাম রেখেছেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, সব্যসাচী এবং অনিরুদ্ধ। তিনি খোলা মনে যেমন হোলির রং মাখতেন, তেমনি ইদে কোলাকুলি করতেন। তবে এটাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য,মধ্য বয়সে তিনি পুত্র শোকে, প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর অসুস্থতায়,তীব্র অর্থাভাবে সাংসারিক টানাপোড়েনে দুশ্চিন্তায় দিগ্ভ্রান্ত হয়ে কবিরাজি,হেকিমি সহ দরগার জলপড়া, তান্ত্রিকের আশ্রয়, ভগবান বিশ্বাসের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। নজরুলের এই পরিণতির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে মুজফ্ফর আহ্মদ তাঁর 'কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা' য় উল্লেখ করেছেন:
"১৯২৯ সালের ২০শে মার্চ তারিখে মীরাট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার সংস্রবে গিরেফতার হয়ে আমি মীরাটে চলে যাই। অনেক ঘাটের জল খেয়ে আমি আবার কলকাতায় ফিরে আসি ১৯৩৬ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে। ফিরে এসে আমার পূর্ব পরিচিত নজরুলকে আমি আর পাইনি। যে নজরুলকে আমি তখন পেলাম পেশার দিক থেকে সে গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে একান্তভাবে বাঁধা। এই কোম্পানির কোটরেই তার আশ্রয়। আবার তার যোগ ও সাধনা ইত্যাদি কি কি চলছিল সে সম্বন্ধে আমি কোনো খবর নেইনি। যদিও আমরা পরস্পরের নিকট হতে দূরে সরে গিয়েছিলেম তবুও আমাদের সাধারণ কথাবার্তা আগের মতই হয়েছে। আমি তার আধ্যাত্মিক ব্যাপার সম্বন্ধে কোনো কথাই তুলিনি। আমি জানতাম আমার কথার কোনো জওয়াব না দিয়ে সে চুপ করেই থাকবে। তার সঙ্গে আমার দেখাও এই সময়ে খুব কম হয়েছে।"
মুজফ্ফর আহ্মদ এ প্রসঙ্গে আরেকটি জায়গায় বলেছেন:
"নজরুলের সুর-শিল্পী বন্ধুরা তার নিকটের বন্ধু ছিলেন কিনা সে সম্বন্ধে আমার কিছু জানা নেই... কিন্তু উনিশ শ' তিরিশের দশকে সে যে আধ্যাত্মিকতার স্রোতে এমনভাবে ভেসে গেল তাতে কি তার বিশিষ্ট সাহিত্যিক বন্ধুদের মধ্যে সকলের সম্মতি ছিল? আমার কিছুতেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না যে তাঁদের সকলেই অলৌকিক ও অতিপ্রাকৃত ব্যাপারে বিশ্বাসী ছিলেন। যাঁরা বিশ্বাসী ছিলেন না তাঁরা চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই নজরুলকে বাঁচাতে পারতেন। তাঁরা কতটা কি করেছিলেন তা আমার জানা নেই। তবে কিছু কিছু লেখা পড়ে এটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে তার কোনো কোনো বন্ধু, তাঁরা তার সাহিত্যিক বন্ধুও ছিলেন, তাঁরা কুসংস্কারকে সাহায্য করেছেন।"
এই সময় থেকেই কবির শরীরে জটিল রোগ বাসা বাঁধে। এর পরিণতিতে ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই কলকাতা বেতার কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে তিনি অসুস্থ হন এবং বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন। এই রোগের কবল থেকে তিনি আর পরিত্রাণ পাননি। তারপর আমৃত্যু তিনি কাটান সংবিৎহারা হয়ে। যাইহোক, অবস্থার চাপে তাঁর এই মানসিক পরিবর্তন হলেও ধর্মীয় অন্ধতা বা গোঁড়ামিতে তিনি আচ্ছন্ন হননি।
সম্প্রীতি ও সাম্যের প্রত্যাশী
নজরুল ইসলাম আজীবন হিন্দু-মুসলমান মিলনের প্রত্যাশী ছিলেন। কবির এই ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কিছু গোঁড়া মানুষ বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছেন, ব্যঙ্গোক্তিও করেছেন। কিন্তু নজরুল ছিলেন অবিচল। ১৯২৯ সালের ১০ ডিসেম্বর কলকাতার অ্যালবার্ট হলে (বর্তমানে কফি হাউস) কবিকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। সভাপতির আসনে ছিলেন বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। এই সংবর্ধনার প্রতিভাষণে কবি বলেছিলেন:
"কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি, ও-দুটোর কিছুই নয়। আমি মাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।"
নজরুল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বিভেদ ঘুচিয়ে একান্তভাবেই সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রত্যাশী ছিলেন। তাঁর এই ভাবনাকে মূর্ত করেছেন 'নবযুগ' (প্রথম পর্যায়) পত্রিকায় সম্পাদকীয় নিবন্ধে। তিনি লিখেছেন:
"এসো ভাই হিন্দু! এসো মুসলমান! এসো বুদ্ধ! এসো ক্রিশ্চিয়ান! আজ আমরা সব গণ্ডি কাটাইয়া,সব সংকীর্ণতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি।"
কবির এই মিলনের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষাই বাঙ্ময় হয়েছে তাঁর 'সাম্যবাদী' কবিতায়:
"গাহি সাম্যের গান –
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান!"
তাঁর কাছে সর্বাগ্রে প্রাধান্য পেয়েছে মানুষ। তাই তিনি লিখেছেন:
"গাহি সাম্যের গান –
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,নহে কিছু মহীয়ান্
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে সবকালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।"
আজ উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনা, তীব্র জাতিবিদ্বেষ-কলুষিত ও সংকট জর্জরিত দুঃসময়ে সমাজ প্রগতি ও শোষণ মুক্তির সংগ্রামী অভিযাত্রায় বিদ্রোহ-বিপ্লবের চেতনায় দীপ্ত কবি নজরুল ইসলামের নির্ভীক লড়াই-দৃপ্ত জীবন ও সৃষ্টি প্রবলভাবে আমাদের প্রাণিত করছে। আমাদের প্রদৃপ্ত করছে কবির সেই অনুপম সৃষ্টি – সেই কালজয়ী সম্প্রীতির বাণী:
"মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম
হিন্দু মুসলমান
মুসলিম তার নয়ন-মণি
হিন্দু তাহার প্রাণ।"
তথ্যসূত্র:
● সঞ্চিতা, কাজী নজরুল ইসলাম, ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা।
● রুদ্র-মঙ্গল, কাজী নজরুল ইসলাম, গ্রন্থলোক, কলকাতা।
● কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা, মুজফ্ফর আহ্মদ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা।
● জনগণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কল্পতরু সেনগুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, কলকাতা।
● নজরুল জীবনী, অরুণ কুমার বসু, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা।
● নজরুল জীবনকথা, মোরশেদ শফিউল হাসান, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।

পরিচিতি: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক। নিবাস: হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ।