জুন মাস এলেই অসমে সরকারি, বেসরকারি উভয় মহল থেকেই শুরু হয়ে যায় 'রাভা দিবস' উদ্ যাপনের তোড়জোড়। আজ থেকে সাতান্ন বছর আগে ১৯৬৯ সালের ২০ জুন অসমের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা প্রয়াত হয়েছিলেন। তাঁর সেই মহাপ্রয়াণের দিনটিকে ঘিরেই 'রাভা দিবস-এর উদ্যাপন। কিন্তু অসমের বর্তমান সামাজিক - রাজনৈতিক - সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রেক্ষিতে 'রাভা দিবস-এর সমারোহ দেখে আমার কেবলই মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লেখা কবি বিষ্ণু দে-র একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি। কবি লিখেছিলেন তাঁর 'তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ' শীর্ষক কবিতায় – "তুমি কি কেবল-ই স্মৃতি, শুধু এক উপলক্ষ্য, কবি?/ হরেক উৎসবে হৈ হৈ/ মঞ্চে মঞ্চে কেবল-ই কি ছবি?/ তুমি শুধু পাঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ?" বিষ্ণু রাভাও যেন আজ 'মঞ্চে মঞ্চে কেবল-ই ছবি'তে পরিণত হয়েছেন।
প্রত্যেক বছর বাহ্যিক আড়ম্বরের সাথে 'রাভা দিবস' উদ্যাপিত হয়। কিন্তু সৈনিক-শিল্পী বিষ্ণু রাভার বিপ্লবী মতাদর্শ এবং এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তেমন চিন্তা-চর্চা হয় না বললেই চলে। অবশ্য বামপন্থী ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক এবং অন্যান্য গণসংগঠনগুলো এর ব্যতিক্রম। বিষ্ণু রাভাকে সরকার, শাসকদল ও তাদের ঘরানার বিভিন্ন সংগঠন যেভাবে শ্রদ্ধা জানায় তা দেখে লেনিনের কয়েকটি কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই মনে পড়ে যায়। 'রাষ্ট্র ও বিপ্লব' নামের গ্রন্থটিতে লেনিন লিখেছিলেন, "মহান বিপ্লবীদের জীবিতাবস্থায় শোষকশ্রেণি তাঁদের ওপর প্রতিনিয়ত নির্যাতন চালায়। তাঁদের শিক্ষার প্রতি বর্বরতম বিদ্বেষ এবং ভয়ানক ঘৃণা পোষণ করে। তাঁদের বিরুদ্ধে চালায় নীতিনৈতিকতা বিবর্জিত মিথ্যাচার ও কুৎসার অভিযান। আর তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদেরকে নির্বিবাদ পবিত্র দেবমূর্তিতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা হয়। চেষ্টা করা হয় তাঁদের ওপর দেবত্ব আরোপ করতে এবং তাঁদের চারদিকে এক ধরনের দিব্য মহিমার আভা সৃষ্টি করতে। নিপীড়িত শ্রেণিকে 'সান্ত্বনা' দেওয়া ও প্রতারণা করার জন্য এটা করা হয়। কিন্তু এরই সাথে সাথে তাঁদের শিক্ষার বিপ্লবী মর্মবস্তুকে নস্যাৎ করার এবং এই শিক্ষার বিপ্লবী ধারাটিকে ভোঁতা ও বিকৃত করার যৎপরোনাস্তি চেষ্টা চালানো হয়।" শাসক-শোষক শ্রেণি বিষ্ণু রাভার বেলায়ও একই খেলা খেলেছে। জীবদ্দশায় যে রাভা ছিলেন তাদের আক্রোশ ও ঘৃণার পাত্র, যে রাভাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিতে পারলে দশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল, চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের সময় যে রাভাকে 'দেশদ্রোহী' আখ্যা দিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্য রাজপথে টেনে নিয়ে গিয়ে তারা কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল, মৃত্যুর পর সেই রাভাকেই 'কলাগুরু' আখ্যা দিয়ে তারা পূজার বেদিতে তুলে রেখেছে। কিন্তু তাঁর বিপ্লবী মতাদর্শ ও চিন্তা-চেতনা নৈব নৈব চঃ।
বিষ্ণু প্রসাদ রাভা ছিলেন বিস্ময়কর ও বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন এক মহান বিপ্লবী। তিনি একাধারে ছিলেন গীতিকার, সুরকার, নৃত্যশিল্পী, চিত্রশিল্পী, কবি, নাট্যকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র-নির্মাতা, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, দক্ষ ফুটবল খেলোয়াড়, অসাধারণ বাগ্মী, রাজনীতিজ্ঞ ও বিধায়ক। এরকম বহুমুখী প্রতিভা কেবল আমাদের সমাজেই নয়, যেকোনো দেশ ও সমাজে সচরাচর দেখা যায় না। কেবল ইউরোপীয় রেনেসাঁসের পর্বেই এরকম কিছু বিরল বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। ভাবলে কখনো কখনো আশ্চর্য লাগে যে, অসমের একটি পিছিয়ে পড়া জনজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে এধরনের প্রতিভার আবির্ভাব কী করে হলো? এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত নিহিত আছে বিষ্ণু রাভার বিপ্লবী সত্তা ও মতাদর্শের মধ্যে। রাভা সর্বোপরি ছিলেন বিপ্লবী। সেটাই তাঁর মূল পরিচয়।
বিষ্ণু রাভার শিল্পী সত্তাকে তাঁর বিপ্লবী সত্তার থেকে আলাদা করে বিচার করা যায় না। বরং তাঁর বিপ্লবী সত্তাই তাঁর শিল্পীসত্তাকেও গড়ে তুলেছে বললে অত্যুক্তি করা হবে না। সেজন্যই শিল্প-সংস্কৃতির জগতের এক অত্যন্ত প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও যৌবন থেকে শুরু করে জীবনের প্রায় অন্তিম লগ্ন পর্যন্ত বিষ্ণু রাভা শিকার হয়েছিলেন শাসক-শোষক শ্রেণির অকথ্য নির্যাতনের। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামকে সক্রিয় সমর্থন করার 'অপরাধে' কলকাতার সেন্ট পলস্ কলেজ থেকে তাঁকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল।
পরে বিজ্ঞানের স্নাতক হওয়ার জন্যে ভরতি হয়েছিলেন কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজে। কিন্তু কোচবিহারের ব্রিটিশ রিজেন্ট এবং জমিদারের দেওয়ানের আবাসগৃহে ইউনিয়ন জ্যাক সরিয়ে তেরংগা পতাকা উত্তোলনের 'অপরাধে' কোচবিহারে রাভার প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়। তাঁকে চলে যেতে হয় রংপুরের কারমাইল কলেজে। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও রাভার কলেজের শিক্ষা অসমাপ্ত অবস্থায় সেখানেই সাঙ্গ হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীন দেশের শাসকবর্গ ও সরকারও রাভাকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। আত্মগোপন, গ্রেপ্তার এবং কারাবাস বিষ্ণু রাভার জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠে। স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকার রাভার ওপর দশ হাজার টাকার পুরস্কার ঘোষণা করে। তাঁর 'অপরাধ' ছিল দেশের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের পক্ষে তিনি সংগ্রামে ব্রতী হয়েছিলেন। প্রকৃত স্বাধীনতার সন্ধানে হাতে স্টেনগান তুলে নিয়েছিলেন। সেই পুরস্কার মাথায় নিয়েই বিষ্ণু রাভা পথে-প্রান্তরে-শহরে-গ্রামে শোষিত-নিপীড়িত-মানুষের মধ্যে শোষণমুক্তির বার্তাবাহক হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। চল্লিশ মাইল পথ পদব্রজে হেঁটে নাগা পাহাড়ের মোকক্চাঙে নাগা ছাত্র সম্মেলনে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন রাভা। এমনকী মৃত্যুর সাত বছর আগে চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের সময় রাভাকে 'দেশদ্রোহী' আখ্যা দিয়ে তদানীন্তন সরকার উড়িষ্যার গঞ্জাম জেলে নিক্ষেপ করেছিল। জীবদ্দশায় শোষিত-নিপীড়িত মানুষের মুক্তির উদ্দেশ্যে নিবেদিত তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য বিষ্ণু রাভা যেমন ছিলেন শাসক-শোষক শ্রেণির ত্রাস, তাদের ঘৃণা ও আক্রমণের লক্ষ্য, তেমনি ছিলেন জনগণের হৃদয়ভরা ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পাত্র। বিষ্ণু রাভা নিজেই লিখেছেন, "সরকার আমাদের শাস্তি দিতে চায়, – আর জনগন চায় তাদের হৃদয়সাগরে আমাদের লুকিয়ে রাখতে। জনগন এবং সরকারের মধ্যে পার্থক্য এটাই। কেন এই পার্থক্য? জনগণের সরকার যদি এটা হতো তাহলে জনগণকে এভাবে আমাদের জীবনের দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন হতো না।" (সূত্র: বিষ্ণু প্রসাদ রাভা রচনা সম্ভার, পৃষ্ঠা: ১০০৬)। শোষিত, নিষ্পেষিত জনতার মুক্তির জন্য বিষ্ণু রাভার মনে থাকা প্রচণ্ড আকুতি এবং জনগণের সাথে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ও সান্নিধ্যই তাঁর শিল্পীসত্তাকে গড়ে তুলেছিল। রাভার ভাষায়, "জনতা অফুরন্ত কলা-শিল্পের ভাণ্ডার"।
বিষ্ণু রাভা ছিলেন একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী ও বিজ্ঞানসম্মত মতাদর্শে। রাভা নিজেই বলেছিলেন যে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ তাঁর চঞ্চল অস্থির শিল্পী জীবনে সাগরসঙ্গমের পূর্ণতা এনে দিয়েছিল। মার্কস-লেনিনের তত্ত্বকে অত্যন্ত সহজ, সরল, প্রাঞ্জলভাবে, সাধারণ জনতার বোধগম্য যাতে হয়, সেভাবে রাভা লিখে গিয়েছেন। জনগণের মধ্যে এই বিপ্লবী মতাদর্শের প্রসারের কাজ বিরামবিহীনভাবে জীবনের অন্তিম লগ্ন পর্যন্ত তিনি করে গেছেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই মতাদর্শই হলো নিপীড়িত মানুষের শোষণমুক্তির সংগ্রামের একমাত্র দিশারি। তাই তাঁর শ্রেণিচেতনা ছিল অত্যন্ত প্রখর। বিশ্বাস করতেন শ্রেণিসংগ্রামে। এমনকী জাতিগত প্রশ্ন এবং জাতিরক্ষার বিষয়কেও তিনি শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিচার করতেন। বিষ্ণু রাভা লিখেছিলেন, "এই বিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদের যে ঝড় বইছে, ধনতান্ত্রিকতার যে বিজয়বৈজয়ন্তী ধ্বজা উড়ছে, সেই ধনতান্ত্রিকতা ও সাম্রাজ্যবাদের চাপে অসমিয়া গ্রাম্য গরিব, কৃষক, শ্রমিক কি বেঁচে থাকতে পারবে? যদি অসমিয়ার এই গরিব শ্রেণি মরে, তাহলে অসমিয়া জাতিও মৃত্যুমুখী হবে। সাথে সাথে বিনাশ ঘটবে অসমিয়া কৃষ্টি, অসমিয়া সংস্কৃতি, অসমিয়া সভ্যতার। এই কৃষ্টি, এই সংস্কৃতি, এই সভ্যতাকে বাঁচাতে হবে। এই নিষ্পেষিত, নির্যাতিত, গরিব অসমিয়াকে রক্ষা করতে হলে রক্ষা করতে হবে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে, সেই ধনীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, যে ধনিকশ্রেণির কোনো জাতি নেই, সমাজ নেই, ধর্ম নেই, যে জাতি হচ্ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মূল স্তম্ভ। যেখানে মুনাফা সেখানেই তারা বিরাজমান।" (সূত্র: 'অসমিয়া কৃষ্টি')। কি গভীর প্রজ্ঞা, শ্রেণিচেতনা ও দূরদৃষ্টি নিহিত হয়ে আছে বিষ্ণু রাভার উপরোক্ত বক্তব্যের মধ্যে!
আজ একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান প্রহরে ধনতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ বহু বেশি আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক। এটা নব্যউদারবাদী বিশ্বায়নের পর্ব। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা এক সার্বিক ব্যবস্থাগত (Systemic) সংকটে জর্জর। সংকট যত গভীর হচ্ছে ততই শ্রমজীবী মানুষের জীবনে 'ছায়া ঘনাইছে বনে বনে'। জীবন-জীবিকার ওপর আক্রমণ তীব্র ও ব্যাপক হচ্ছে। ধনতন্ত্রের তথাকথিত 'মানবিক মুখ' অথবা মুখোশ খসে পড়ছে। 'জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র'-এর ধারণা ক্রমশ এখন মিউজিয়মের বিষয়বস্তু হয়ে পড়েছে। শ্রমজীবী জনগণের ক্ষোভ-অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। বাঁচার মরিয়া প্রচেষ্টায় নব্যউদারবাদী ধনতন্ত্র আশ্রয় নিচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, উগ্রজাতীয়তাবাদ ইত্যাদি চরম প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের ছাতার নিচে। জাতি, ধর্মের নামে শ্রেণিচেতনা ভোঁতা করে দেওয়ার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে তারা। সমসাময়িক অসম ও ভারতই হচ্ছে এর জীবন্ত সাক্ষী।
নব্যউদারবাদী ধনতন্ত্র কেবল শ্রমজীবী জনগণের জীবন-জীবিকাকেই বিধ্বস্ত করছে তা নয়, সংস্কৃতির জগৎটাকেও বিপর্যস্ত করেছে। জাতীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি মুখোমুখি হয়েছে এক ভয়ানক চ্যালেঞ্জের। সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পরিগ্রহ করেছে বীভৎস রূপ। সংস্কৃতি পরিণত হয়েছে পণ্যে। বহুরাষ্ট্রীয় পুঁজি এবং আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি তাদের বিশ্বব্যাপী মুনাফা-মৃগয়ার লক্ষ্যে চাইছে সর্বত্র একধরনের সমধর্মী (Homogenous) বৈচিত্র্যহীন বাজার। তাই তারা আমাদের জাতীয় ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির বর্ণময় বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করার অভিযানে লিপ্ত হয়েছে। আমাদের দেশের 'হিন্দুত্ব'বাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিও চায় তথাকথিত সনাতনী ধর্মের নামে এক বৈচিত্র্যহীন সমধর্মী সংস্কৃতি। বৃহৎ করপোরেট পুঁজি এবং 'হিন্দুত্ব'বাদী সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি এব্যাপারে এক ও অভিন্ন। উভয়েই 'বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের' অর্থাৎ বৈচিত্র্যকে উদ্যাপন করে (ধ্বংস করে নয়) ঐক্য রক্ষার নীতির চরম বিরোধী। ভারতের মতো একটি বহুজাতিক, বহুভাষাভাষী, বহুধর্মীয়, বহুসাংস্কৃতিক দেশের ঐক্য-সংহতি তাই আজ এক জটিল প্রত্যাহ্বানের সম্মুখীন হয়েছে। দেশের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো আজ আক্রান্ত। গণতন্ত্র বিপন্ন।
এই সময়ে অসম তথা ভারতের বৈচিত্র্যময় কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে নব্যউদারবাদী ধনতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গণচেতনা সৃষ্টি করাটা জরুরি প্রয়োজন।
অসমের প্রখ্যাত মানবতাবাদী কবি ও চিন্তাবিদ জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা বহুকাল আগেই আমাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, "সাম্রাজ্যবাদ ও ধনতন্ত্রবাদ এই দুটোই হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে সংস্কৃতির রূপে ছদ্মবেশী দুষ্কৃতির পূর্ণ রূপ।" (সূত্র: 'শিল্পীর পৃথিবী')। আজ সেটা আরো বেশি বাস্তব। এই দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে সুস্থ সংস্কৃতি এবং এক নতুন সমাজের ভগীরথের ভূমিকা পালন করতে পারেন একমাত্র সচেতন, সংগঠিত এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ শ্রমজীবী জনগণই। তাই বিষ্ণু রাভা আজ আগের থেকেও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন। সেজন্যই বিপ্লবের এই মহাপথিককে 'রাভা দিবস'-এ কেবল 'কলাগুরু' হিসেবে পূজার বেদিতে স্থাপন করে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেই আমরা আমাদের কর্তব্য শেষ করতে পারি না। বিষ্ণু রাভার উত্তরাধিকার হলো শোষিত-নির্যাতিত-নিষ্পেষিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রাম ও বিপ্লবের উত্তরাধিকার।

পরিচিতি: অসমিয়া ও বাংলা ভাষার লেখক, সমাজকর্মী। নিবাস: গুয়াহাটি, অসম।