'অপরাজিত' (২০২২) চলচ্চিত্র নির্মাণের পর কলকাতা দূরদর্শনে 'কথায় কথায়' অনুষ্ঠানে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে অনীক দত্ত তাঁর চলচ্চিত্র যাপনের অনেক কথা বলেছিলেন। বিজ্ঞাপনের জগৎ থেকে তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণে আসা শুধু নয়, তাঁর জীবনে আইকন ছিলেন সত্যজিৎ রায়। ছেলেবেলায় 'সন্দেশ' পত্রিকার গ্রাহক করে দিয়েছিলেন অভিভাবকেরা। সেই থেকে শুরু। শুধু ফেলুদা সিরিজের পাঠক নয়, তিনি ছিলেন সত্যজিতের ইলাস্ট্রেশন, প্রচ্ছদের সন্ধানী পাঠকও। প্রথম চলচ্চিত্র 'ভূতের ভবিষ্যৎ' (২০১২) মোবাইলের রিংটোনে 'গুপী গাইন বাঘা বাইন'-এর ভূতেদের কণ্ঠস্বর ব্যবহার থেকেই তিনি নিজেকে শনাক্ত করে দিয়েছিলেন।
(দুই)
ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রয়াত হয়েছেন ২০১৩ সালে। বাংলা চলচ্চিত্রে তারপর একটা শূন্যতা ছিলই। যদিও ২০০৫-এ নবারুণ ভট্টাচার্যের কাহিনি আশ্রিত সুমন মুখোপাধ্যায়ের 'হারবার্ট' চলচ্চিত্রের আবির্ভাব বেশ একটা ভাবনাতরঙ্গ সৃষ্টি করেছিল। সেই সময়ের বাম সরকার এই ছবিকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রে 'হারবার্ট' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলেও তা সর্বজনপ্রিয় ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। সুমন তারপরে ২০১৩-এ আবারও নবারুণ ভট্টাচার্যের 'কাঙাল মালসাট' চলচ্চিত্রায়িত করেন। কিন্তু বাংলা ছবির দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ২০১২-তে অনীক দত্ত যখন 'ভূতের ভবিষ্যৎ' চলচ্চিত্র নিয়ে আবির্ভূত হলেন, বলা যায় প্রথম আবির্ভাবেই তিনি দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিলেন। মূল ধারার চলচ্চিত্রে 'ভূতের ভবিষ্যৎ' এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। গোদারের একটি উক্তি মনে পড়ে: Only he who takes comedy seriously deserves to succeed in it, this being a much suver tactic than putting jokes and banter into drama (Godard on Godard) বাঙালি দর্শকদের নাড়িয়ে দিয়েছিল এই ছবি। এই ছবি শুধু মজার নয়, মজার সঙ্গে ভাবনারও। এবং আধুনিক চলচ্চিত্র ভাবনার সমস্ত বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছিল এই চলচ্চিত্র। অভীক মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরা, অর্ঘকমল মিত্রের সম্পাদনা, রাজা নারায়ণ দেবের সঙ্গীত পরিচালনা এবং সর্বোপরি সমস্ত কলাকুশলীদের সমবায়ী অভিনয়ে গ্রুপ থিয়েটারের ঘরানার আশ্চর্য মিশেল। পাশাপাশি রঙের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শিল্পসমিতির আভাসও এই ছবিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
(তিন)
২০১৩-য় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে 'আশ্চর্য প্রদীপ' আগের ছবির মতো স্বপ্নের কথা। 'ভূতের ভবিষ্যৎ'-এ পরিচালক স্বপ্নের মধ্যে তাঁর চলচ্চিত্রভাবনাকে আবিষ্কার করেন আর 'আশ্চর্য প্রদীপ'-এর নায়ক অনিলাভ গুপ্ত স্বপ্নের মধ্যে আশ্চর্য প্রদীপের আলাদিনকে খুঁজে পায় যে তার সবরকম হুকুম তালিম করার জন্য প্রস্তুত। ভোগবাদী সমাজের হৃদয়হীনতার এক আখ্যান এই ছবি। যদিও এই ছবিতে কাহিনির ভিতরে কোনো বৈচিত্র্য নেই। এবং দর্শক মনে মনে এই কাহিনিকে চিনতে পারে। কিন্তু এই ছবির শেষ পর্বটি অত্যন্ত শিল্পসুষমামণ্ডিত। সাদাকালো ফ্রেমের ভিতরে অনিলাভ যখন তার স্ত্রীকেই আবিষ্কার করে লীলাসঙ্গিনী রূপে তখন দর্শককে সজোরে একটা ধাক্কা দেন অনীক দত্ত।
(চার)
২০১৭-তে 'মেঘনাদবধ রহস্য' একেবারেই ভিন্নগোত্রের ছবি। থ্রিলারের আঙ্গিকে এই ছবি শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত আর থ্রিলার থাকে না। অনীক দত্তের মানসগঠনে সত্তরের দশকের নকশালবাড়ি আন্দোলন বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। সেইরকমই একটি চরিত্র অসীমাভ বসুর অন্তর্ধান রহস্য ঘিরেই এই ছবি। কিন্তু এই ছবির কেন্দ্রে রয়ে গেছে মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'মেঘনাদবধ কাব্য' বইটি। অসীমাভ-র জন্মদিনে এই বইটিকে উপহার দিয়ে গেছে সেই রহস্যের সূত্র ধরে আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নীতি-নৈতিকতা এবং মধ্যবিত্তের মুখ আর মুখোশের দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন অনীক।
(পাঁচ)
২০১৯-এ 'ভবিষ্যতের ভূত' অনীকের প্রথম ছবি 'ভূতের ভবিষ্যৎ' সিকোয়েল বলা যায়। এই ছবি আগাগোড়া রাজনৈতিক ছবি। ভূতেদের প্রচ্ছদের আড়ালে এই ছবিতে অনীক সমকালীন রাজনীতি, সামাজিক অবক্ষয় এবং পাশাপাশি পূর্ববর্তী বাম শাসনকালের তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতকে প্রশ্ন করেছেন। তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার এই ছবির প্রদর্শন নিষিদ্ধ করে। ব্যারাকপুরের একটি হলে এই ছবিটি দেখেছিলাম। এই চলচ্চিত্রে সিনেমার সবরকম ব্যাকরণকে ভাঙচুর করেছেন অনীক। 'ভবিষ্যতের ভূত' সম্পূর্ণভাবেই একটি রাজনৈতিক ছবি যার কোনো দোসর বাংলা চলচ্চিত্রে নেই। অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এই ছবি বাংলার বেশিরভাগ দর্শকই দেখতে পাননি।
(ছয়)
২০২০-তে 'বরুণবাবুর বন্ধু' ছবিতে আমরা অন্য এক অনীক দত্তকে আবিষ্কার করি। পুরোপুরি সত্যজিৎ ঘরানার ছবি 'বরুণবাবুর বন্ধু'। সত্যজিৎ রায়ের 'শাখাপ্রশাখা' ছবির কথা মনে পড়ে যায়। লেখক বরুণ চক্রবর্তী এক আদর্শবান ব্যক্তিত্ব। তাঁর বন্ধু সুকুমার। বরুণবাবুর জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর বাল্যবন্ধু ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণবেশ চ্যাটার্জি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসবেন বলে চিঠি দিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই বরুণবাবুর পুত্রকন্যা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনেরা যে যার নিজস্ব চাহিদাপূরণের জন্য ভিতরে ভিতরে প্রস্তুত। কিন্তু শেষপর্যন্ত দেশে দাঙ্গা পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য প্রণবেশ আসতে পারেন না। তিনি গাড়ি পাঠিয়ে বরুণবাবুকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে চান কথা বলার জন্য। বরুণবাবু প্রত্যাখ্যান করেন। এই ছবির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃশ্য ছাত্রদের প্রতিবাদসভায় বরুণবাবুরূপী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যখন ফ্যাসিবিরোধী যাজক কবি নিয়েমলিয়রের কবিতা আবৃত্তি করেন: 'প্রথমে তারা এসেছিল,/কিন্তু আমি কিছু বলিনি,/কারণ আমি ইহুদি ছিলাম না'...তখন বরুণবাবুর চরিত্রটি অন্য মাত্রা পায়। চরিদিকের ক্ষয় আর মূল্যবোধহীনতার মাঝখানে বরুণবাবুর মতো মেরুদণ্ডী চরিত্র প্রায় দর্পণের মতো। এ ছবির নির্মাণেও সাদাকালো মনোক্রম রঙের ব্যবহার অনবদ্য।
(সাত)
২০২২-এ 'অপরাজিত' সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালি' নির্মাণের আখ্যান। অনীক এই ছবিতে ভিন্নধর্মী আঙ্গিকের ব্যবহার করেছেন। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অপরাজিত রায়ের সাক্ষাৎকার দিয়ে ছবির শুরু। কখনো ডকুমেন্টারি, কখনো বা ফিচার ছবির মিশ্র আঙ্গিকের বিন্যাসে এই ছবি বাংলা চলচ্চিত্রে একটি চিরস্মরণীয় সংযোজন। এ ছবির আগাগোড়া সাদাকালো (মনোক্রম) রঙে নির্মিত। অনীক যে আদ্যন্ত সত্যজিতে মগ্ন ছিলেন এই ছবি তার প্রমাণ। মানুষ হিসেবে অনীক দত্ত চিরদিনই তাঁর স্পষ্টবাক স্বভাবের জন্য বিতর্কিত ছিলেন। তাঁর প্রয়াণে আমরা এক দায়বদ্ধ শিল্পীকে হারালাম।

পরিচিতি: সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখক। ভারত সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন (সংস্কৃতি দপ্তর) দপ্তরের প্রাক্তন সিনিয়র ফেলো। নিবাস: কলকাতা।