২৭ মে দুপুরবেলা সেই মর্মান্তিক খবরটা এলো-- প্রয়াত হয়েছেন চিত্রপরিচালক অনীক দত্ত। শেষ দিন পর্যন্ত যিনি তাঁর শিরদাঁড়া বিক্রি করেননি। সেই মানুষটার এইভাবে চলে যাওয়া কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না।
মনে পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। মৌলালির কাছে একটি হলঘরে সকাল থেকে 'আক্রান্ত আমরা' মঞ্চের সভা চলছে। সভায় উপস্থিত 'আক্রান্ত আমরা' মঞ্চের অভিভাবক মাননীয় অশোক কুমার গাঙ্গুলি এবং অর্ধেন্দু সেন মহাশয়। দুপুরের পর খবর আসে, অনীক দত্তের 'ভবিষ্যতের ভূত' উপরওয়ালার নির্দেশে হলমালিক প্রদর্শন বন্ধ করে দিয়েছেন। তখনই ফোনে যোগাযোগ করি। কথা হয়। তার প্রতিবাদে বিকেলে ধর্মতলায় স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ-বিক্ষোভের আহ্বান জানানো হয়েছে। মঞ্চের সহ আহবাহক অম্বিকেশ মহাপাত্রের সাথে আলোচনা করি। 'আক্রান্ত আমরা' মঞ্চের সভা মাঝপথে বন্ধ করে অশোকবাবু এবং অর্ধেন্দুবাবু সহ আমরা বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত হ'লাম। কয়েকদিন বাদে একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে প্রতিবাদসভায়ও আমরা সকলে শামিল হয়েছিলাম।
এরপর ১০ মার্চ ২০১৯। স্থান: ঢাকুরিয়া মধুসূদন মঞ্চের সিঁড়ি। উদ্দেশ্য: তৃণমূল সরকার কর্তৃক অনীক দত্তের 'ভবিষ্যতের ভূত'- এর প্রদর্শন বন্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল।
তারপর থেকে অনীক দত্তের সাথে পরিচয় আরও নিবিড় হয়। 'আক্রান্ত আমরা' মঞ্চ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান তিনি। সবিস্তারে জানার পর, 'আক্রান্ত আমরা' মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রসঙ্গ আসে। তিনি যুক্ত হলেন। তারপর যোগাযোগ আরও বাড়ে। আমাদের কর্মসূচি হলে তাঁকে জানানো হতো। কলকাতা বা আশেপাশে কর্মসূচি হলে তিনি যোগদান করতেন। একবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন অম্বিকেশ মহাপাত্র-র উপর নেমে আসা পূর্বতন সরকারের চরম অমানবিক-অন্যায় আচরণকে কেন্দ্র করে একটি ফিল্ম বানাবেন।
'আক্রান্ত আমরা'র অনেক কর্মসূচি (প্রতারিত চাকুরিপ্রার্থী অনশনকারীদের প্রতি সহমর্মিতাজ্ঞাপন, প্রতিবাদী মিছিল, প্রতিবাদ সভা, প্রেস কনফারেন্স, রাজ্যপাল মহোদয়ের কাছে ডেপুটেশন প্রভৃতি)-তে যোগদান করেছেন। সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি সামাজিক কাজেও তাঁকে আমরা পাশে পায়েছিলাম।
যখন বাংলা চলচ্চিত্র অধোগতির দিকে যাত্রা করেছে, ঠিক তখনই অনীক দত্তের মতো একজন পরিচালককে পায় বাংলা। যে বাংলা চলচ্চিত্র একটা সময় বিশ্বের দরবারে নিজেকে স্থান করে নিয়েছিল, সেই বাংলা চলচ্চিত্রের ইন্ডাস্ট্রি দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে তার অতীত গরিমা হারায়। বাংলা সিনেমার এক চরম অন্ধকার যুগের সূচনা হয়। যেখানে চলচ্চিত্র নির্মাণ, পরিচালনা, কলাকুশলী সবই নিয়ন্ত্রিত হতো এক দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থার মধ্যে। এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা অনীক দত্তের মতো একজন পরিচালককে পাই। তার প্রথম পূণ্যদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র 'ভূতের ভবিষ্যৎ' সারা বাংলার চলচ্চিত্রে এক অনবদ্য সংযোজন। যা বাংলা ছবিকে পুনরুজ্জীবিত করার মতোই ছিল। ছবিটি বাংলা সিনেমার এক নতুন দ্বার খুলে দিয়েছিল। যার কোনো উত্তরসূরি তৈরি হয়নি আজও। অনীক দত্তের প্রথম ছবি 'ভূতের ভবিষ্যৎ' নিয়ে বড়ো প্রত্যাশা ছিল না, কিন্তু ছবি মুক্তির পর তাঁকে নিয়ে অনেক প্রত্যাশা তৈরি হলো। এত ভালো চিত্রনাট্য, অসম্ভব সুন্দর ঝরঝরে সংলাপ আর একই ছবির মধ্যে বিভিন্ন সময়কে সামাজিক-রাজনৈতিক মোড়কে এক অসামান্য বাঙালিয়ানার প্রকাশ। দ্বিতীয় ছবি 'আশ্চর্য প্রদীপ' আর ২০১৬ সালের শেষের দিকে অনীক দত্তের তৃতীয় ছবি 'মেঘনাদবধ রহস্য'। কিন্তু তারপর যে ছবি আবার আলোড়ন তৈরি করলো, সেটা হলো 'অপরাজিত'। সত্যজিৎ রায়ের বায়োপিক নিয়ে নির্মিত এই ছবি বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অসামান্য অবদান রেখে গেল। তাঁর শেষ ছবি 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই'। সময়ের নিরিখে বিচার করলে তাঁর এই সিনেমা ছিল এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস। ব্যতিক্রম এই জন্যই, যখন বাংলা সিনেমা বাংলার চরম অব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে পারছে না, বাংলার সমাজ, রাজনীতিতে যখন চরম অব্যবস্থা, রাজ্যজুড়ে প্রশাসনিক দুর্নীতি, ধর্ষণ, খুন, প্রতিবাদীদের গ্রেপ্তার চলছে, যখন চরম দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার শিক্ষক, তখন আমরা লক্ষ করেছি বাংলা চলচ্চিত্রে তার কোনো প্রভাবই পড়ছে না। এক শ্রেণির চলচ্চিত্রকার, সরকার ও শাসকদলের প্রতিনিধিদের দুর্নীতির এক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। তারা পরস্পর মিলে একই মঞ্চকে আলোকিত করছে। কিন্তু তাদের শিল্প-সৃষ্টিতে অর্থাৎ সিনেমায় এই অব্যবস্থা, এই অনাচারের কোনো প্রভাব পড়ছে না। তখন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল সেই সত্তরের দশক। যখন আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস, কর্মহীনতা, বেকারত্বের যন্ত্রণা। তখন কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রে আমরা বারবার পেয়েছি তার প্রতিফলন। মৃণাল সেনের ছবি 'পদাতিক', 'কলকাতা ৭১', 'কোরাস' এবং সত্যজিৎ রায়ের 'মহানগর'- এর মতো একাধিক সিনেমা। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে এই চরম অরাজকতা বাংলার চলচ্চিত্র শিল্পে প্রতিফলিত তো হচ্ছিলই না, উলটে এক নবকৌশলে তাকে আড়াল করে নানান বিষয়ে ছবি নির্মাণ হচ্ছিল। এইরকমই একটা পরিস্থিতিতে অনীক দত্ত ছিলেন একটা দমকা হাওয়া। যিনি প্রথম প্রশ্ন করলেন তাঁর চলচ্চিত্রের মধ্যে দিয়ে এই ব্যবস্থাকে। প্রশ্নটা এতটাই সঠিক ছিল তা প্রমাণ হলো যেদিন তাঁর ছবি প্রদর্শন বন্ধ করে দিল 'উপর তলার নির্দেশ আছে' বলে। সেই সময় বহু মানুষ অনীক দত্তের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু তখন টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যে দুর্নীতির কারবার আর স্বজনপোষণ চলছিল তার মধ্যে থাকা সুবিধাভোগী নির্মাতারাই শুধু সিনেমা বানাচ্ছিলেন আর নিজেদের তৈরি বাজারে নিজেদের প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন। বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যেন দুর্নীতির পথ ধরে রাজনীতির মঞ্চে যাবার একটা উপায় হয়ে উঠল। এমএলএ এবং এমপি জোগানের গোডাউনে পরিণত হলো। সিনেমার প্রদর্শনীর একটা বড়ো সংকট এই সময় দেখা গেল যে, শুধু নির্মাণ নয়, প্রদর্শনের উপরও। হলগুলোর উপর চরম নিয়ন্ত্রণ শাসক দলের। যা শুধু সিনেমা নয়, বাংলা থিয়েটার মঞ্চেও তার প্রভাব পড়ে। ঠিক সেই সময় অত্যন্ত সার্থক ও ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনায় নির্মিত 'ভূতের ভবিষ্যৎ' বাঙালি মনোজগতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার সঞ্চার করে। তখনই বারবার মনে হয় যে শিল্প কী, সিনেমা কী, শিল্পীই বা কে? সারা বিশ্বে সিনেমার ইতিহাস, শিল্পের ইতিহাস আমাদের এই কথাটাই মনে করিয়ে দেয় যে, যুগে যুগে একমাত্র শিল্পীরাই মানে প্রকৃত শিল্পীরাই রাষ্ট্রকে, শাসককে প্রশ্ন করতে পেরেছেন। অপরদিকে চাহিদা অনুযায়ী জোগান দেওয়ার মতো কাজ যখন শিল্পকর্মে চলতে থাকে, তখন তাকে আর শিল্পী বলা যায় না, তার শিল্পসত্তা, বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ণ হয়। তখন তিনি আর শিল্পী থাকেন না।

পরিচিতি: তথ্যচিত্র পরিচালক, সমাজকর্মী। নিবাস: কোন্নগর, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ।