স্মরণে-শ্রদ্ধায়

অনীক দত্ত: অপরাজিত আপোশহীন এক চলচ্চিত্র পরিচালক



উত্তম ভট্টাচার্য


অনীক দত্ত ২৭ মে, ২০২৬ আমাদের অনেককে শোকসাগরে ডুবিয়ে চলে গেলেন। চলচ্চিত্র পরিচালনা জগতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব, এক উজ্জ্বল নক্ষত্র চিরবিদায় নিলেন। জন্ম ২২ মে, ১৯৬০। ক'দিন আগে তাঁর ৬৬তম জন্মদিন পার হয়।শেষের দিকে গভীর শারীরিক অসুস্থতা এবং তীব্র মানসিক অবসাদের শিকার ছিলেন তিনি। কাটিয়ে না ওঠা 'অবসাদ' এবং 'একাকিত্ব' হতেই সম্ভবত এই আত্মহনন।

আমরা হারালাম এক 'মেধাবী উইট', এক 'বাঁধ ভাঙা প্রতিবাদী মানুষ'। ছাদ হতে 'পতন' হয়ে অনেক কিছু ভেঙে যায়, কিন্তু ভক্তবৃন্দ নিশ্চিত, এক্ষেত্রে শেষ দিন পর্যন্ত অনীক দত্তের শিঁড়দাড়া, তাঁর স্পাইন ছিল টান টান সোজা। তাঁর মেরুদণ্ড কখনো ঝোঁকে নি, আপোশ করেননি কোনো মূল্যে। তাঁর মাথা নিচু হয়নি কখনো কোনো ভয় অথবা লোভের কাছে। সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রশাসনকে, হাস্যরস, ব্যঙ্গ বিদ্রূপ ও মশকরা দিয়ে এভাবে সমালোচনা করতে, 'সবক' শেখাতে কোনো সময় পিছিয়ে আসেননি। বাঙলার চলচ্চিত্রের স্যাটায়ার জগতে এক ইন্দ্রপতনের সাক্ষী রইল কলকাতা। গভীর শ্রদ্ধা ও দুঃখে তাঁকে স্মরণ করতে হয় আজ।

অনীক দত্তের জন্ম কলকাতাতে। পড়াশোনা কলকাতার পাঠভবন স্কুলে। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। কর্মজীবন শুরু করেন বিজ্ঞাপন জগতে। ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। ২০১১-১২ সালে সিনেমা জগতে এসেই তাঁর এভারেস্ট বিজয়। 'ভূতের ভবিষ্যৎ' সিনেমা। ১৬ মার্চ, ২০১২ সালে মুক্তি পায় কলকাতাতে। কলকাতার মানুষ একেবারে অন্যরকম এক স্যাটায়ার বা বিদ্রূপাত্মক হাস্যরসে ভরপুর, বুদ্ধিদীপ্ত কমেডি সিনেমার সাক্ষী হন। ছবির সময়সীমা ১২৩ মিনিট। সিনেমা তৈরিতে খরচ হয় ০.৬ কোটি টাকা এবং বক্স অফিসে আয় হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা (তথ্য: উইকিপিডিয়া)। গল্পের পটভূমি চৌধুরী ম্যানসন-এ আশ্রিত নানা ধর্ম ও শ্রেণির মৃত মানুষের আত্মা (ভূতদের) নিয়ে। এক ধনী ব্যবসায়ীর স্বপ্ন – চৌধুরী ম্যানসনকে শপিং মল-এ রূপান্তর করার চেষ্টাকে বানচাল করার গল্প। নাচে গানে ভরপুর এক অসাধারণ মজার চলচ্চিত্র। এক সম্পূর্ণ নতুন স্বাদের অভূতপূর্ব সিনেমা। অহিংস গণতন্ত্রর বিজয় পতাকাও বটে এই সিনেমা। পরে এটি হিন্দি ভাষায় 'গ্যাং অফ ঘোস্ট' নামে ২০১৪ সালে মুম্বাই-এ মুক্তি পায়।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় গল্প নিয়ে, 'আশ্চর্য প্রদীপ' সিনেমা করেন, ২০১৩ সালে।বিষয়: ভোগবাদী সমাজ বা কনসিউমারইসম। তাঁর ২০১৭ সালের সিনেমা 'মেঘনাদবধ রহস্য'। মূলত উৎকণ্ঠাপূর্ণ রহস্য গল্প। এরপর আবার চমক, 'ভবিষ্যতের ভূত' সিনেমা (২০১৯)। এটা ২০১২ সালে তৈরি , 'ভূতের ভবিষ্যৎ'-এর সিক্যুয়েল বা পরম্পরা নয়। কিন্তু বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনা ও ব্যঙ্গরস-এ একই মেজাজের। তবে এই সিনেমা করে সেই সময়ের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজনৈতিক দলের রোষানলে পড়েন অনীক দত্ত। প্রথম প্রদর্শনীর (১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯) পরদিনই সরকারি কোনো 'অদৃশ্য আদেশনামা'তে সমস্ত সিনেমা হলে এই সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন ও আরও অনেক সুশীল সমাজের মানুষ এই প্রদর্শনী বন্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আন্দোলন করেন। শেষে মহামান্য হাইকোর্ট-এর আদেশে ৫ এপ্রিল, ২০১৯ হতে পুনরায় চালু হয়। সাথে সরকারকে ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া ধার্য করা হয়।

অনীক দত্তের পরের সিনেমা, 'বরুণবাবুর বন্ধু' (১০ জানুয়ারি, ২০২০)। লেখক রমাপদ চৌধুরীর 'ছাদ' গল্প নিয়ে। এই সিনেমাতে বরুণবাবুর চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-এর অসাধারণ অভিনয় রয়েছে। কলকাতা ২৫তম চলচ্চিত্র উৎসবে (২০১৯) এটা দেখানো হয়। একাধিক পুরস্কার পায়। গল্প মজাদার কিন্তু ব্যঙ্গাত্মক। বরুণবাবুর বন্ধু (কোনো ভিভিআইপি, সম্ভবত দেশের রাষ্ট্রপতি), বাল্যবন্ধু বরুনবাবুকে বাড়িতে দেখা করতে চান, একে কেন্দ্র করে, সমাজ এবং সংসারে এক মজার শ্লেষাত্বক গল্প।

অনীক দত্তের পরের সিনেমা, আর এক অসাধারণ সিনেমা, 'অপরাজিত'। মুক্তি পায় ১৩ মে, ২০২২। প্রথম প্রদর্শন হয় রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবন-এ, কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে। সত্যজিৎ রায়-এর 'পথের পাঁচালি' সিনেমা তৈরির প্রেক্ষাপটে (সিনেমাতে 'পথের পদাবলী') এটি এক সাদা-কালো সিনেমা। সত্যজিৎ রায়ের নামভূমিকাতে (বিতর্ক এড়াতে, সিনেমাতে নাম 'অপরাজিত রায়') জিতু কমল-এর এক অসাধারণ অভিনয়। প্রায় ১৩৮ মিনিটের সিনেমা। কয়েকদিনের মধ্যে এই সিনেমা থেকে আয় হয় প্রায় ২.৮ কোটি টাকা। সত্যজিৎ রায়-এর পুত্র সন্দীপ রায় এ সিনেমাতে তাঁর 'বাবাকে খুঁজে পান'।

অনীক দত্তকে তৎকালীন রাজ্য সরকারের বিরাগভাজনের মূল্য দিতে হয়। তাঁর সিনেমা সরকারি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় না কোনো সময়। তৎকালীন রাজ্য সরকারের অন্যায্য ক্রীড়া কর্মসূচিকে অনীক দত্ত কোনোদিনই রেয়াত করতে পারেননি। স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে পিছু হটেননি। সারা জীবন তার মূল্য দিতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু কখনও মাথানত করেননি তিনি।

অনীক দত্তের শেষ সিনেমা, 'যত কাণ্ড কলকাতাতে'। মুক্তি পায় ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। এটি ১২৬ মিনিটের সিনেমা। অভিনয় করেন আবীর চট্টোপাধ্যায় ও কাজী নওশাবা আহমেদ। সত্যজিৎ রায়-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে এবং ফেলুদা-তোপসে চরিত্রকে চিরস্মরণীয় করতে অনীক দত্তের শ্রদ্ধার্ঘ্য ও ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে থেকে যাবে এই দুই সিনেমা।

চলচ্চিত্র জগতে অনীক দত্ত-র অভাব কারো পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। এই লেখার মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করছি।

পরিচিতি: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক। নিবাস: কসবা, কলকাতা।