
Mozart by Lange, 1782.
মোজার্টের জন্ম ১৭৫৬ সালের ২৭ জানুয়ারি সলজবার্গ শহরে। সলজবার্গ অস্ট্রিয়া দেশের একটি শহর। মানুষ বলেন, মোজার্ট যেন ঈশ্বরের অভিনব দান। মোজার্টের পুরো নামটির অর্থই হলো 'ঈশ্বরের আদরের সন্তান'। তাঁর মাতৃভাষা ছিল জার্মান। প্রথমে তাঁর নামটি আরো দীর্ঘ ছিল। পরে সবাই তাঁকে মোজার্ট বলতে শুরু করে। তাঁর পিতা লিওপল্ড খুবই ধনী মানুষ ছিলেন। তাঁর মার নাম ছিল আন্না মারিয়া, বড়ো বোনের নাম ছিল ম্যারিয়েন এবং মোজার্টের একটা আদরের কুকুর ছিল বিমপার্ল।

মোজার্ট ছোটো থেকেই খুবই দুষ্টু এবং মজার ছেলে ছিল। বাবা লিওপল্ড একজন ভালো ভায়োলিনবাদক এবং সুরকার ছিলেন। দিদি অল্প বয়সে বাবার কাছে পিয়ানো শিখতে শুরু করে। তিন বছরের মোজার্ট সামনে বসে শুনত। এভাবেই তিন বছরের মোজার্ট ধীরে ধীরে পিয়ানোতে আঙুল ছোঁয়ানো শুরু করে। মোজার্টের একবারেই আয়ত্ত করার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। বইয়ের অক্ষর লেখার আগেই মোজার্ট সংগীত লিখতে (Staff Notation) শিখেছেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মোজার্ট জীবনের প্রথম সুর পিয়ানোতে সৃষ্টি করেন, যা ছিল একপ্রকার আশ্চর্যের কথা। একদিন বাবা দু'জন বন্ধুর সঙ্গে অনুশীলন করার সময়ে আশ্চর্য রকমভাবে মোজার্ট নিজে নিজে তাঁর ছোটো ভায়োলিনটা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে বাজাতে শুরু করলেন। সকলের চোখ কপালে উঠলো, কারণ মোজার্টের তখন পর্যন্ত ভায়োলিন শেখাই ছিল না। পাঁচ বছরের মোজার্ট পিয়ানোতে বসে রোজই নতুন নতুন সুর সৃষ্টি করতে শুরু করলেন। মোজার্টের পিয়ানোর সুর এতই আকর্ষণীয় ছিল যে,প্রতিবেশীরা মোজার্টের ঘরের জানলার কাছে ভিড় করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর পিয়ানোবাদন শুনতেন।

মোজার্ট। স্কেচ শিল্পী: রোদ্দুর মিত্র।
সেই সময়ে ইতালির রোম শহরকে সংগীতের তীর্থভূমি বলা হতো। রোমে যাবার জন্য ছোট্ট মোজার্টের মনটা ছটফট করছিল। সেজন্য তিনি রোমে গেলেন এবং প্রথমবারের জন্য রোমের St. Peters Cathedral-র পবিত্র সংগীত শুনতে পেলেন। তখন পর্যন্ত এগারো বছরের মোজার্ট ইয়োরোপের প্রায় সমস্ত জায়গায় অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছেন। ধীরে ধীরে মোজার্ট অল্প বড়ো হলেন এবং নিজের উপার্জনের জন্য তাঁর নিজের সৃষ্ট সংগীত বিক্রয় শুরু করলেন। অর্থ উপার্জনের জন্য তিনি মাঝে মাঝে সংগীতালেখ্য (opera)-র পরিচালনাও করেছেন। মোজার্ট বিভিন্ন দেশের সংগীতের ওপরে কাজ করা শুরু করলেন। অন্যান্য সঙ্গীতজ্ঞরা মোজার্টকে খুবই হিংসা করতেন,যার জন্য মোজার্টকে মাঝে মাঝে খুবই কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে। অনাহার এবং অনিদ্রা মোজার্টকে ধীরে ধীরে অসুস্থ করে তুললো। এই সময়ে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো। একদিন গ্রীষ্মকালে হঠাৎ একজন কাপড়ে মুখ ঢাকা মানুষ এসে মোজার্টের সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি মোজার্টকে কিছু অর্থ দিলেন এবং বললেন যে মৃত মানুষের জন্য এক সংগীত সৃষ্টি করে দিতে হবে। এই ধরনের সংগীতকে বলা হয় রিকুয়েম (Requiem)। কয়েক মাস ধরে মোজার্ট রিকুয়েম সৃষ্টির সাধনায় মগ্ন হলেন। কিন্তু দিন যতো যেতে লাগলো মোজার্টের মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা ঢুকে গেল যে, তিনি এই সংগীত নিজের মৃত্যুর জন্যই সৃষ্টি করছেন এবং সত্যি সত্যিই তিনি যতই কাজে এগোতে লাগলেন, তাঁর রোগও ততোই বেড়ে যাচ্ছিল। তিনি রিকুয়েমটি কিছুতেই শেষ করতে পারলেন না। ১৭৯১ সালের ৫ ডিসেম্বর মোজার্ট এই সংসার ত্যাগ করে চলে গেলেন। তাঁর বয়স তখন মাত্র ৩৫ বছর। ভিয়েনা শহরের এক প্রান্তে তাঁকে কবর দেওয়া হলো। কবরে তাঁর নামটা খোদিত করা হলো না। মৃত্যুর সময়ে তিনি কঠিন অসুখে জর্জরিত ছিলেন, যদিও ফূর্তি করতে তিনি কিন্তু কখনো ভোলেননি।
মোজার্টকে বলা হয় পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে প্রতিভাবান শিল্পী। মোজার্ট ছয়শোর বেশি সুর সৃষ্টি করে রেখে গেছেন। আজকাল আমাদের মোবাইল ফোন, দেওয়াল ঘড়ি, লিফট, কলিং বেল ইত্যাদিতে যে সুর প্রায়শই শোনা যায় সেই সুর মোজার্টেরই সৃষ্টি।
'উল্ফগেং এমেডোচ মোজার্ট' - জুবিন গার্গ রচিত এই মূল অসমিয়া নিবন্ধটির বাংলা অনুবাদ করেছেন সন্দীপ দে।
সূত্র: 'জুবিনৰ গদ্য', সংকলন এবং সম্পাদনা: মনজিৎ রাজকোঁওর, অসম পাবলিশিং কোম্পানি, পানবাজার, গুয়াহাটি-৭৮১০০১।

পরিচিতি: প্রয়াত বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ও সামাজিক আন্দোলনের অগ্রণী সংগঠক। অসম।