পরিবেশ ও বিজ্ঞান

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক পরিকল্পনার ভাবনা



উজ্জ্বল কুমার মুখোপাধ্যায়


জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের সমাজের সামনে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব যখন ১.৫ ডিগ্রি উষ্ণায়নের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন আমাদের নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অবদান রাখার মতো হতে হবে। এর অর্থ হলো উন্নয়নমূলক কার্যকলাপ থেকে কার্বন নির্গমনকে আমূল কমানোর জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা এবং পরিকল্পনা ব্যবস্থার বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করে জরুরি ভিত্তিতে নগর ও বসতিগুলিকে পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা, যাতে মানুষ ইতোমধ্যেই অনিবার্য হয়ে ওঠা গুরুতর জলবায়ুগত প্রভাব মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।

আমাদের দেশে সামগ্রিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ বন্যা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য পরিণতি প্রাণবন্ত সম্প্রদায় এবং একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো এমন স্বাস্থ্যকর, টেকসই ও সহনশীল বাতাবরণ সৃষ্টি করা যা সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত। জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন এবং অভিযোজন – এই উভয় বিষয়কে সমানভাবে মোকাবিলা না করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের অনেক ক্ষতিকর প্রভাব, যেমন চরম তাপপ্রবাহ, বন্যা বা জলসংকট, স্থানভেদে ভিন্ন হলেও এগুলোর অর্থনৈতিক বোঝা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের উপর পড়ে। এসব সমস্যার সমাধান স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে তুলতে হবে, এবং উন্নয়ন-পরিকল্পনা গণতান্ত্রিক উপায়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করে গড়ে তুললে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষত, পরিকল্পনাবিদদের উচিত জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রতিক্রিয়া জানাতে অক্ষম জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত করার বিষয়ে অধিক মনোযোগ দেওয়া।

একটি আদর্শ এবং রূপায়ণ-যোগ্য পরিকল্পনার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রচেষ্টা স্থানীয় পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবলের অভাব, এবং জাতীয় পর্যায়ে দুর্বল, বিলম্বিত, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অগ্রাধিকারহীন নীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবুও, বর্তমানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুস্পষ্ট সুযোগ রয়েছে এবং শক্তিশালী আইনগত ও নীতিগত বাধ্যবাধকতাও এখন সহায়ক অবস্থায় আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সফল মোকাবিলা শুধু মানুষ ও বন্যপ্রাণীকেই সুরক্ষা দেবে না, বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক অগ্রগতিও নির্ধারণ করবে। ভবিষ্যতে কেবল সেই স্থানগুলিই বিনিয়োগ ও বিমা সুবিধা আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে, যেগুলি জলবায়ু-সহনশীলতা প্রদর্শন করতে পারবে। ইতোমধ্যেই সমগ্র দেশের বহু বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটের মুখোমুখি, কারণ পুনঃপুনঃ অকাল-বন্যা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, দ্রুত উপকূল ক্ষয় বা ভূমিধসের মতো ঝুঁকির ফলে জীবনধারণ, সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্য, খেতি-বাড়ি বা ছোটো শিল্পের বিমার খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষম নগরায়ণ নকশায় অনুমতি দেওয়াকেই সঠিক পরিকল্পনার শুরু বলে চিহ্নিত হওয়া উচিত। বাস্তবে বহু সম্পত্তির (commercial housing বা সাদা বাংলায় ফ্ল্যাট বাড়ি) ক্ষেত্রে তা ঘটেনি, এবং এ শতাব্দিতে নির্মিত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাড়ি দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু সহনশীল নয়। অবিলম্বে নজর দিতে হবে এই বিষয়ে যাতে করে আজকের পরিকল্পনাবিদদের নেওয়া সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক সহনশীলতার উপর মোলায়েম প্রভাব ফেলে। জলবায়ুগত ঝুঁকি যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিকল্পনা ব্যবস্থার একটি জরুরি অগ্রাধিকার হয়ে উঠছে।

উপরে আলচিত ও বর্ণিত বিষয়তে যে কার্যক্রমের আওতায় আসে তাকে বলে "টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং (Town and Country Planning)"। এই কার্যক্রম হলো শহর ও গ্রামাঞ্চলের সুষম ও টেকসই বিকাশের জন্য ভূমি ব্যবহার, আবাসন, পরিবহণ এবং পরিবেশগত পরিকাঠামো সুপরিকল্পিতভাবে ডিজাইন ও নিয়ন্ত্রণ করার একটি প্রক্রিয়া। এটি সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করতে কাজ করে। আমরা একে শহর ও গ্রামাঞ্চল পরিকল্পনা বলতে পারি।

শহর ও গ্রামাঞ্চল পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য চারটি।

অবকাঠামো উন্নয়ন: সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে রাস্তা, নিকাশি ব্যবস্থা, ও জল সরবরাহের উন্নয়ন করা।

ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (Zoning): কোথায় শিল্প-কারখানা, কোথায় আবাসিক এলাকা বা কোথায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে তা নির্ধারণ করা।

পরিবেশ সংরক্ষণ: দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও সবুজায়নের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা।

যানজট নিরসন: আধুনিক যোগাযোগ ও গণ-পরিবহণ (মাস ট্রান্সপোর্ট) ভিত্তিক পরিবহণ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা।

আমাদের দেশে এই কাজ মূলত রাজ্য সরকারের অধীনস্থ বিষয়। পশ্চিমবঙ্গে এই সংক্রান্ত নীতি ও উন্নয়নমূলক কাজ [ওয়েস্ট বেঙ্গল টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি (প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৭৯]-এর অধীনে পরিচালিত হয়। রাজ্যের নগরোন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক দপ্তরের অধীনে কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (KMDA) এই দায়িত্ব পালন করে থাকে। সংস্থাটির মূল কাজ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়নের 'মাস্টার প্ল্যান' (Master Plan) তৈরি করা এবং সার্বিক উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং কার্বন নির্গমন হ্রাস যে কোনো কার্যক্রমের মূলধারা হিসাবে মান্যতা পায়। টাউন ও কান্ট্রি প্ল্যানিংয়ের ক্ষেত্রেও কার্বন নির্গমন হ্রাস এবং জলবায়ু-সহনশীলতার কৌশলসমূহকে স্থানিক পরিকল্পনার কাঠামোয় একীভূত করার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা করাই আজকের দিনের প্রধান দাবি। এর প্রধান পদ্ধতিগুলির মধ্যে রয়েছে যানবাহনের উপর নির্ভরতা কমাতে ট্রানজিট-ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট, শক্তি দক্ষতা বাড়াতে ঘনবসতিপূর্ণ ক্ষেত্র-বিন্যাস এবং বন্যার ঝুঁকি ও নগর উষ্ণতা কমাতে ব্লু-গ্রিন অবকাঠামো (যেমন নগর বন ও পুনরুদ্ধারকৃত জলাভূমি), ছাদের রং ও উপাদান নির্দিষ্ট করণ ইত্যাদি।

গ্রিন-হাউস গ্যাস প্রশমন (নির্গমন হ্রাস): নগর পরিকল্পনার সুচিন্তিত নকশা ও শক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো সম্ভব।

গণপরিবহণ: গণপরিবহণ কেন্দ্রকে ঘিরে উচ্চ-ঘনত্বের বসবাসের পাড়া গড়ে তোলা। এর ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির উপর নির্ভরতা কমে এবং কার্বন কেন্দ্রিক গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

সংকুচিত ভবন নকশা: বহু-পরিবারভিত্তিক আবাসন ও সংযুক্ত বাড়ির প্রসার, যা বিচ্ছিন্ন উপশহরীয় বাড়ির তুলনায় অনেক কম কার্বন নির্গমন করে এবং কেন্দ্রীভূত তাপ সরবরাহ ব্যবস্থাকে সম্ভব করে, তাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে স্থান দিতে হবে।

সবুজ ভবন ও জোনিং: কঠোর শক্তি-দক্ষ ভবন বিধি প্রয়োগ, সৌরশক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা, এবং প্রাকৃতিক ছায়া ও বায়ু চলাচলের জন্য ভবনের উপযুক্ত অভিমুখ নির্ধারণ।

আজকের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অভিযোজন (adaptation) বা সহনশীলতা গড়ে তোলা ব্যতীত জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার কথা ভাবা নেহাত-ই বাতুলতা। সঠিক অভিযোজন পরিকল্পনা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জনসমাজকে চরম আবহাওয়া ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে টিকে থাকার উপযোগী করে তোলে। এ ক্ষেত্রে যে যে কৌশলগুলি প্রধানত সামনে আসে সেগুলি নিম্নরূপ -

নীল-সবুজ অবকাঠামো: প্রাকৃতিক উপাদান (পার্ক, সবুজ ছাদ, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ বাগান) এবং প্রকৌশলভিত্তিক জলব্যবস্থাকে একত্রে সংযুক্ত করা। এটি নগর তাপদ্বীপ প্রভাব কমায়, অতিরিক্ত বৃষ্টির জল শোষণ করে এবং প্রাকৃতিক জলচক্র পুনরুদ্ধার করে।

বন্যা ও উপকূল ব্যবস্থাপনা: পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল বিপদপূর্ণ অঞ্চল নির্ধারণ, বন্যাপ্রবণ এলাকায় নির্মাণ নিষিদ্ধ করা, অতিবৃষ্টির জমা জলকে তৎক্ষণাৎ নির্গমনের ব্যবস্থা করা এবং অবশ্যই ম্যানগ্রোভ বন ও সম্প্রসারিত জলাভূমির মতো প্রকৃতিভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থা ও নগর কৃষি: কমিউনিটি গার্ডেন ও স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনের জন্য স্থান বরাদ্দ করা, যাতে সরবরাহ শৃঙ্খল সংক্ষিপ্ত হয় এবং খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়। এই ব্যবস্থা গড়ে তোলা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপ মোকাবিলার সবচেয়ে উপযুক্ত উপায়।

জাতীয় নীতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনাকে অবশ্যই পরিবর্তনশীল জলবায়ুর প্রেক্ষাপটে একটি নেট-শূন্য ও সহনশীল ভবিষ্যতের দিকে উত্তরণকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন কমিটির প্রকাশিত কার্বন বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে এবং তা সমর্থন করার জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে মৌলিক হ্রাস অর্জনের যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তা স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে। অন্যান্য অনেক পরিকল্পনা-সংক্রান্ত উদ্দেশ্যের তুলনায়, পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষগুলির উপর পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে জলবায়ু প্রশমন বিষয়টি বিবেচনা করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলিতে একটি শক্তিশালী ও সুস্পষ্ট নীতিগত বর্ণনা থাকা প্রয়োজন, যাতে দেখানো যায় কীভাবে তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবাধীন ক্ষেত্রগুলিতে জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিঃসরণ হ্রাস করা হবে। এটি কেবলমাত্র পরিকল্পনায় কার্বন-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগের মাধ্যমেই সম্ভব, যার জন্য উন্নয়নের কার্বন প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট মূল্যায়ন ও উপলব্ধি অপরিহার্য। এই উপলব্ধিকে নীতিনির্ধারণ ও পরিকল্পনাগত সিদ্ধান্তের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিস্তৃত অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে বিস্তারিত নকশাগত মানদণ্ড পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে হবে।

পরিচিতি: পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। নিবাস: হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ।