গল্প

চরাচর



মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ


আমার ভাড়া বাড়ি। উত্তরমুখী। দোতলায় আমার বাস। সামনের ঝুল বারান্দা দিয়ে মহাকাশ দেখা যায়। যতদূর দৃষ্টি যায় সুনীল। সমুদ্রের মতো। সমস্ত শরীর জুড়ে উড়ে বেড়ায় শুভ্র মেঘ। শিমুল তুলোর মতো। সাদা-সাদা ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘ!

ঝুল বারান্দার সামনে উত্তর পাশে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর একটা পিচের রাস্তা। পার্শ্ববর্তী প্রধান সড়ক থেকে প্রবাহিত হয়ে এসেছে। বৃহৎ কোনো নদীর শাখার মতো। অথবা ছুটে চলেছে অজগর সাপের মতো। শিকারের সন্ধানে!

একটা বিশাল পুকুর। রাস্তার উত্তর পাশে। পানকৌড়ি, সাদা বক, মাছরাঙা আর চাষ করা রুই-মৃগেল। সবাই এখানে বনের মুক্ত পশুপাখিদের মতন আনন্দিত জীবন যাপন করে। পাখিরা জলের ওপর দিয়ে এবং মাছেরা জলের নীচ দিয়ে পরস্পরের সাথে ছুটে চলার পাল্লা দেয়। পক্ষী ও মৎস্যকুলের সহাবস্থান অনুভব যোগ্য। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং মৃগয়াদের মতো। নিজেদের এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কে দু'পক্ষই সম্যক ধারণা রাখে। কখন কাকে ওয়াকওভার দিতে হবে, সে সম্পর্কে দুই পক্ষের কারুরই কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং দৃশ্যত কখনোই শান্তি বিঘ্নিত হয় না। আমার বাসার ঝুল বারান্দা থেকে সব দেখা যায়।

বর্ষাকালের প্রবল বর্ষণ বা ধারাপাত! পুকুরের জলের ওপরে খই ফুটতে থাকে। আনন্দে মেতে ওঠে অন্তরীক্ষের পক্ষীকুল এবং জলের নীচের মৎস্যকুল। তখন তাদের ভেতরে প্রবল মৈত্রী ভাব। পরস্পরের সীমানা লঙ্ঘনও তখন কোনো অপরাধ নয়। কাজেই বিনয় মজুমদারের উজ্জ্বল মাছের মতন পুকুরের স্বচ্ছ সুনীল থেকে আকাশের দিকে চলতে থাকে মাছেদের উড়া উড়ি। পানকৌড়িরাও অনায়াসে ঢুকে পড়ে জলের নীচে। ডুবসাঁতার দিতে। অনন্তকালের জন্যে।

পুকুরের ঠিক উত্তর দিকে অবস্থিত বিশাল সাদা গম্বুজওয়ালা মসজিদ। সুবহে সাদেকের প্রায়ান্ধকারে পূর্ণিমার চাঁদের ঊর্ধ্বাংশ বলে ভ্রম হয়। দিনের ৫টা নির্দিষ্ট সময়ে মুসল্লিদের সমাগমে মুখরিত থাকে। সুভে সাদেকের পর থেকে সূর্য ওঠা অবধি এবং সন্ধ্যার গোধূলির আঁধার নিবিড় হয়ে আসা পর্যন্ত সময়কালে মসজিদের চতুর্দিকে পরিভ্রমণরত দেখা যায় বর্ষীয়ান নারীপুরুষদের। দলে দলে বিভক্ত। দূর থেকে মনে হয় কাবাঘর অথবা সাফা-মারওয়া প্রদক্ষিণ করছে। মূলত এরা সবাই ডায়াবেটিসের রোগী এবং সম্ভবত প্রত্যেকেই ইনসুলিন গ্রহণ করে!

রাস্তাটার দক্ষিণে এবং আমার বাসস্থানের পূর্বদিকে একটা সবুজে আবৃত খালি জায়গা। তবে ফসলের মাঠ নয়। আয়তনে ১ বিঘার বেশি হবে না। আমার আজকের গল্প এই জায়গাটাকে নিয়ে।

জায়গাটা জংগলাকীর্ণ। ভেতরে আছে একটা নিচু লাউয়ের জাংলা। শিশুরা ছাড়া অন্যদেরকে হামাগুড়ি দিয়ে এর নীচে ঢুকতে হয়। লাউ সংগ্রহের জন্যে। জাংলার ওপরে হলুদ ফুল ফুটে আছে। জায়গাটার ঠিক মধ্যভাগ দিয়ে তিন হাত প্রশস্ত পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত একটা জংলি কচুর বন। পাতার রঙ প্রগাঢ় সবুজ। জায়গাটার ঠিক পূর্বদিকে বাসস্থান। বাসস্থানের পাশ ঘেঁষে ক্ষুদ্র একটা কচি ডাঁটার বাগান। হয়ত বা পার্শ্ববর্তী বিল্ডিঙে বসবাসরত কোনো পরিবারের সদস্যেরা এর বীজগুলো বপন করেছে। একটা ছাগল চড়ছে এই বাগানে। পুরো জায়গা জুড়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কয়েকটা পেঁপে গাছ। চা বাগানের ভেতরের রেইন ট্রি-গুলোর মতন। এদের ছায়াতেই বেঁচে আছে কচুবন, এমনকি ডাঁটাগুলোও। সকাল, দুপুর এবং বিকালে প্রখর রোদ পড়ে খোলা স্থানটিতে।

জায়গাটার উত্তর প্রান্ত জুড়ে রাস্তার সমান্তরালে একঝাঁক গুল্ম আকৃতির নাম না জানা ফুলের গাছ।কাঁটাওয়ালা। এর এক প্রান্তে একটা শিউলি ফুলের গাছ । সমস্ত শরৎকাল জুড়ে সারারাত ধরে এর নীচটা ঝরা শিউলি ফুলে ভরে থাকে। অজানা কোন পূজারীর নৈবেদ্যের মতো।

মরুময় নগরীর প্রান্তসীমায় অথবা অচিহ্নিত জায়গায় অবস্থিত এই জায়গাটাই সবচেয়ে সবুজ। সর্বক্ষণ টুনটুনি পাখির কলকাকলিতে ভরপুর। নাম না জানা গাছগুলোতে বসন্তে ফুল ফুটে থাকে। হলুদে কমলায় মেশানো ফুল। আমার বাসার উত্তর এবং পূর্বদিকের ঝুল বারান্দা থেকে গাছগুলোকে মনে হয় পত্রহীন। ফুলে ফুলে আবৃত। সমুদ্র সৈকতে লাইন করে রেখে দেওয়া সপ্ত রঙা ছাতার মতো।

সারাদিনময় টুনটুনি, শালিক, বাবুই, ফিঙ্গে, রঙ বেরঙের প্রজাপতিদের আগমন/প্রত্যাগমন ও কাকলিতে জায়গাটা মুখরিত থাকে। আমি এবং আমার স্ত্রী মাঝেমধ্যে সকাল বা সন্ধ্যায় পুকুরের পাড় দিয়ে হাঁটতে বের হই। মৃদুমন্দ বাতাসে আমাদের মনেও কাব্য জাগে। বলি, "এইখানে চরাচর আসিয়া মিশিয়া গিয়াছে!" অতঃপর দু'জনেই হাসতে হাসতে অস্থির। আমার দুই মেয়েরও জায়গাটা খুবই পছন্দ। এই জায়গা থেকেই আমার ছোটো মেয়ে সবগুলো গাছ আর পাখিদের নাম মুখস্ত করে ফেলেছে!

শুধুমাত্র নান্দনিক সৌন্দর্য দিয়েই ভরপুর যে আমাদের এই চরাচর, তা কিন্তু নয়! এটা বাস্তব পৃথিবীর একটা অংশ। এখানে আনন্দ ও বেদনা, সুন্দর, কুৎসিত সবাই একসাথে বসবাস করে। রাস্তার দক্ষিণ পাশেই বাগানের ধারে একটা নাগরিক ডাস্টবিন। প্রতিনিয়ত সকাল আটটার দিকে এখানে একটু দূরের ভাষানটেক বস্তি থেকে আসা শিশুরা ভিড় করে। একই সময়ে কুকুরের ঘেউ ঘেউ আর কাকের কলকাকলিতেও ডাস্টবিনের চারপাশটা মুখরিত হয়ে ওঠে। এদের সবার উদ্দেশ্য সিটি কর্পোরেশনের ট্রাক আগমনের পূর্বেই নিজেদের ভাগ ঠিকভাবে বুঝে নেওয়া!

শীতকালের শেষের দিকে গুল্ম বাগানের গাছের পাতাগুলো একে একে ঝরে গেল। কচুর পাতাগুলো শুকিয়ে গেল। অথবা শাকান্ন হিশেবে বস্তিবাসীদের উদর ভরতি করল। সেই সময়ে আমি একদিন খেয়াল করলাম আমাদের চরাচরের ভেতর দিয়ে একটা নর্দমা সরু কোন খালের মতন প্রবাহিত হয়েছে! এই প্রথম! উৎপত্তিস্থলটা বোঝা যাচ্ছে না। অন্তঃসলিলা এই প্রবাহ মিলিত হয়েছে আমাদের সামনের বঙ্গোপসাগর রূপী পুকুরের নিম্নদেশে। অথচ আশ্চর্য, এতদিন কোনোভাবেই বোঝা যায়নি যে জায়গাটার ভেতর দিয়ে একটা অন্তঃসলিলা ড্রেন প্রবাহিত হয়েছে! সৌন্দর্য আমাদের অনেক অভ্যন্তরীণ খুঁতকেই কত নিখুঁতভাবেই না ঢেকে রাখে! এই ড্রেনের জলের কারণেই কচুরিবনের রঙ এত গাঢ় সবুজ!

অতঃপর এক প্রস্ফুটিত প্রত্যূষকাল। মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছি স্কুলে। হঠাৎ অনুভব করলাম কেমন খালি খালি লাগছে! ডান দিকে তাকাতেই দেখি রাস্তার ধারের স্ব-সৃষ্ট চরাচর মাটির সাথে মিশে আছে। অথচ গতদিনও এটা ছিল। এখন নেই। মানুষের নিয়তির মতন। অনেকদিন সম্রাট বাহাদুর শাহ।একদিন অকস্মাৎ নিরন্ন মানুষ!

আজ সকালে রাস্তার পাশের ডাস্টবিনটা শুধুমাত্র গন্ধ ছড়াচ্ছে! ভাগাড়ের মতো। হঠাৎ করে! কয়েকটা চিলও এসে বসেছে পুকুরের উত্তর পাশের জলের ওপরে হেলান দিয়ে থাকা নারকেল গাছের শাখার ওপরে। পূর্বে এখানে মাছরাঙা পাখিরা বসতো। অথবা ধ্যানী বকেরা! পুকুরের ওপারে মসজিদের গম্বুজ দাঁড়িয়ে আছে! একাকী। দিনের আলোতে অনেকটাই অস্পষ্ট। বিস্মৃতির মতো। হিরোশিমা নাগাসাকির বিখ্যাত সেই গম্বুজওয়ালা দালানের মতো। ধ্বংস অথবা নির্বাণের সাক্ষী হয়ে। ঝোপ-ঝাড় কেটে পরিস্কার করা জায়গার ওপর দিয়ে বৃত্তাকারে উড়ছে কয়েকটা টুনটুনি পাখি। এবং কয়েকটা প্রজাপতি অথবা ঘাসফড়িঙ। টেকনাফের নাফ নদীর পাড়ের ডিসপ্লেসড রোহিঙ্গাদের মতো।

আমার মেয়ে রাইয়া বলল, "পাপা, আমি এই টুনটুনিটাকে চিনি। চল না একে ধরে আমরা বাসায় নিয়ে যাই। এর তো কোনো বাসাই নেই!" তার কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট কান্নার ভাব। আমিও কিছুটা বিমর্ষ। আজ থেকে এদেরকে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে বের হতে হবে।রাস্তার ওপাড়ের পুকুরের ভেতরে মাছরাঙা আর পানকৌড়িদের দুরন্তপনা অন্তর্হিত। প্রকৃতির ছন্দপতন পাখিরাই সবচেয়ে প্রথমে বুঝতে পারে।

ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কচুগাছের ডাঁটাগুলো। অকস্মাৎ সূর্যালোকে উন্মোচিত হয়ে গেছে ড্রেনটা। দেখতে মনে হচ্ছে শীতনিদ্রার শেষে সাপের ফেলে যাওয়া মৃত খোলসের মতো। প্রাণহীন। পেঁপে গাছগুলো রণাঙ্গনের মৃত সৈনিকদের মতো ইতস্তত শুয়ে আছে। খণ্ডবিখণ্ড দেহ নিয়ে। একটা নীল রঙের মাছরাঙা মাঝে মধ্যেই মাছ ঠোঁটে করে এনে বসতো পেঁপে গাছের ডালে। কয়েকটা শালিখ আর টুনটুনি দিনভর কিচিরমিচির করতো শেফালি ফুলের গাছে। গত বসন্তেও একটা কোকিল সারারাত কান ঝালাপালা করেছে আমাদের। অসময়ে, মাঝরাতে শুরু হতো তার ডাক। অবিরত। কুউউ... কুউউ...। বসন্তের আগমনী বার্তা। অথচ এখন? 'অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট'।

আমার ভাড়া বাসার নীচে প্রতিদিন খুব ভোরে এক বুড়ি আসত। কাছেই কোথাও থাকে। প্রতিনিয়তই সে আমাদের বাসার গার্ডদের ঘুম ভাঙাত। উঁচু গলায় চিৎকার করত, "আমার ঘর ভেঙে তোরা জোর করে আমার জমি দখল করেছিস। নিজেদের বিল্ডিং তৈরি করেছিস!" আমরা ভাবতাম পাগল! সেই মহিলাও দুইদিন আগে মারা গেছে। আমার স্ত্রী দেখেছে যে সকালের আলো অন্ধকারের ভেতরে কয়েকজন তাকে খাটিয়ায় করে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। অনির্দিষ্ট কোন গন্তব্যের দিকে!

সম্ভবত এখানে একটা বিল্ডিং উঠবে। আমার পরিচিত এক ডেভেলপার বন্ধু কয়েকদিন আগে আমার বাসায় এসে খুব অবাক হয়েছিল এই অব্যবহৃত খালি জায়গাটা দেখে। বলেছিল, "মনে হয় জায়গাটার মালিকানা নিয়ে সমস্যা আছে। নতুবা দুই বিল্ডিংয়ের মাঝখানের এই সুন্দর জায়গাটা খালি থাকার কথা নয়। দেখবি কয়েকদিন পরেই যারা শক্তিশালী তারা এখানে বিল্ডিং তুলে ফেলবে!"

এভাবেই ক্রমাগত হারিয়ে যায় বসন্তের কোকিল, দোয়েল, শালিক, টুনটুনি। শুঁকিয়ে যায় গাছের নীচের ঝরে থাকা শিউলি, গুল্ম বনের কচুগাছ! আর আমার লেখালেখির চরাচর!