সেখানে যেতে হলে আপনাকে একটা পরীক্ষা দিতে হবে। প্রেমের পরীক্ষা। পাশ করলে তবেই ছাড়পত্র মিলবে। পরীক্ষাটা দেবেন কি দেবেন না — সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার। এমনিতে সেখানে যেতে চাইলে কোনও বাধা নেই। অনায়াসে যেতে পারেন। কিন্তু যা দেখবেন বলে সুদূর কলকাতা থেকে হুড়তে পুড়তে এসেছেন, তার কি দেখা পাবেন? মনে তো হয় না। আসলে ওখানে যেতে হলে হৃদয়ে সত্যিকারের প্রেম থাকা দরকার। প্রেমনগরে প্রবেশের ছাড়পত্র ওটাই। এ পর্যন্ত যারা গিয়েছে, তাদের প্রত্যেককেই এই পরীক্ষায় সফল হতে হয়েছে। তারা কি ফিরেছে? না। ফিরবে বলে তারা তো যায়নি সেখানে। অমন সুখের, অত সুন্দর জায়গা ছেড়ে কে আর ফিরতে চায় ইট-কাঠ-ধোঁয়া-ধুলো ভরা পৃথিবীতে!
সেখানে গাড়ি-ঘোড়ার কোনও প্রয়োজন নেই। দুটো পা-ই যথেষ্ট। ওখানে একজন কোচোয়ান আছে। কোচোয়ান বললে কেমন ঘোড়া ঘোড়া গন্ধ পাওয়া যায়। না, প্রেমনগরের কোচোয়ানের কোনও ঘোড়া নেই। গাড়িই নেই তো ঘোড়া! হয়তো ছিল কোনও এক কালে। এখন আছে শুধু নামটা। ওই কোচোয়ানই আপনার গাইড। ওর সাহায্য ছাড়া আপনি প্রেমনগরে ঢুকতেই পারবেন না।
ওই কোচোয়ান গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে আপনার দিকে। হাসছে মিটিমিটি। আপনি খুব সহজ ভঙ্গিতে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। হয়তো আপনি করমর্দন করতে চাইছিলেন। আপনার শহুরে কেতায় যা খুব স্বাভাবিক। কোচোয়ান ওটাকেই আপনার প্রেমের আহ্বান ধরে নিয়ে 'আয় ভাই' বলে সটান জড়িয়ে ধরল বুকে। তারপর আর কোনও কথা না বলে আপনার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল প্রেমনগরের দিকে।
ওই যে কোচোয়ান আপনাকে 'আয় ভাই' বলে বুকে জড়িয়ে ধরল, অমনি শক লাগার মতো কেঁপে উঠেছেন আপনি। আপনার দু-চোখ অসম্ভব আবেগে মুদে এসেছে। মনে হচ্ছে আপনি কোনও স্বপ্নরাজ্যে প্রবেশ করলেন। আর প্রবেশ করে কী দেখলেন? এক অদ্ভুত শীতল গ্রাম। মাসটা জ্যৈষ্ঠ, এখন প্রখর রোদের তাপ থাকার কথা। কিন্তু কোথায় কী! মিষ্টি মধুর হাওয়া দিচ্ছে। ঝিরঝির বাতাস বইছে। শরীর যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে। এমনটা হয় কী করে! আপনার কৌতূহলী মন কারণটা খুঁজতে গিয়ে দেখলেন, প্রেমনগরে প্রচুর গাছ। বট-অশ্বথথ-নিম-শিরিষ — এমন কত রকম গাছ যে দেখতে পাচ্ছেন, ফলের ফুলের। সব গাছ যে চেনা এমনও নয়। তবু দেখতে ভালো লাগছে। আসলে এমন সবুজের মেলা খুব বেশি তো দেখেননি, তাই ভালো না লেগে উপায় কী! সেইসঙ্গে দেখছেন প্রচুর পাখপাখালির কিচির মিচির। যে যার মনের সুখে উড়ে বেড়াচ্ছে ডানা মেলে, গান গেয়ে। তখনই শুনলেন পাশ থেকে কোচোয়ান প্রায় ফিসফিস করে বলল, এই প্রেমনগরে সবাই স্বাধীন। সকলেরই নিজের মতো বাঁচবার অধিকার আছে। হবে না-ই বা কেন! প্রেমনগরে রাগ-দ্বেষ-হিংসার কোনও স্থান নেই।
আপনি কোচোয়ানের হাত ধরে এইসব প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি দেখতে দেখতে চলেছেন। বিস্ময়ে প্রায় নির্বাক আপনি। গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে দেখতে পাচ্ছেন ক্যানভাসে ছবির মতো দাঁড়ানো পর পর পর্ণকুটির। মাটির দেওয়াল, গোলপাতার ছাউনি। দেওয়ালে নানা রঙের ছবি আঁকা। ফুল-পাখি-লতা-পাতা। বেশ একটা শান্তির বাতাবরণ ছড়িয়ে আছে যেন চারপাশে। এসব দৃ্শ্যাবলি আপনার অদেখা তা নয়। তবে এই কি প্রেমনগরের বৈশিষ্ট্য? আপনি কোচোয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন, ও দাদা —!
কোচোয়ান আপনার দিকে তাকাল। মুখে মিটিমিটি হাসি। ইতিমধ্যে আপনি প্রচুর কথা বলেছেন। অনেক জিজ্ঞাস্য আপনার। প্রেমনগরের ইতিহাস, কীভাবে গড়ে উঠল — এইসব। ওহো, আপনি যে সাংবাদিক, সেকথাটা বেমালুম চেপে গেছেন কোচোয়ানের কাছে। সাংবাদিক বললে যদি মুখ না খোলে, যদি ভাগিয়ে দেয় — তাহলে তো সব উদ্দেশ্য মাটি। অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, সাংবাদিক বললে ইদানীং অনেকেই এড়িয়ে চলতে চায়। কোচোয়ানও কি তেমনই? কে জানে! প্রেমনগর নিয়ে যা কিছু শুনেছেন, সেসব নিয়ে একটা জম্পেশ স্টোরি দাঁড় করাতে পারলে, আপনি নিশ্চিত মানুষজন খুবই উৎসাহিত হবে। দলে দলে আসবে। পর্যটনের মানচিত্রে প্রেমনগর দারুণভাবে সংযোজিত হবে হয়তো। আর এতে আপনার নামটাও অক্ষয় হয়ে থাকবে।
কোচোয়ান কি এসব বুঝেছে? তাই কি হাসছে মিটিমিটি? আপনার প্রশ্নে সেভাবে সাড়া দেয়নি এখনও। ও কি চাইছে না প্রেমনগর প্রচারের আলোয় আসুক? যা স্বাভাবিক, তাকে অস্বাভাবিক করে তোলার কোনও অর্থ হয় না বলেই কি সব প্রশ্নের উত্তরে মিটিমিটি হাসি ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না? শুধু একবার খুব নিচু স্বরে বলল, প্রেমনগরে যে কেউ আসতে পারে, তবে শর্ত একটাই — হৃদয়ে সত্যিকারের প্রেম থাকা চাই। নইলে যা দেখার জন্য প্রেমনগরে আসা, সেটা বৃথা হয়ে যাবে।
কোচোয়ান বোধহয় চাইছে আপনার মাথা থেকে সাংবাদিকতার ভূতটাকে তাড়াতে। তাই কি দ্রুত পা চালিয়ে দিল, আর আপনাকেও নিয়ে চলল প্রেমনগরের আরও গভীরে! আপনার চোখে পড়ছে প্রেমনগরের আদিগন্ত সবুজ প্রান্তর। ফসলের ভারে খিলখিল করে হাসছে যেন। ঢেউ খেলানো ফসলের উপর মিঠেল বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সবুজ গাছগুলো পাতাপুতা দুলিয়ে নাচছে যেন ছন্দে-সুরে-তালে। ফসল খেতের পাশে পাশে মেঠো পথ। নারকোল গাছের সারি। মাঠের ওপারে পর পর জারুল গাছ। ফুল ফুটে আছে গাছ জুড়ে। বেগুনি রঙের উত্তাল সমুদ্র যেন। দেখতে দেখতে আপনি মোহিত হয়ে যাচ্ছেন। অসম্ভব ভালোলাগার অনুভূতি আচ্ছন্ন করে ফেলছে আপনার প্রতিটি ইন্দ্রিয়। ভাবছেন একেই কি প্রেম বলে? প্রেম নিয়ে আপনার ধারণা অবশ্য অন্যরকম। শহরে আপনার শ্রীময়ী আছে। তার সঙ্গে ঘোরাফেরা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া, শপিং মলে সময় কাটানো। শ্রীময়ী কেনাকাটা করতে ভালোবাসে। প্রয়োজন নেই, তা সত্ত্বেও আপনার জন্য জামা, পাঞ্জাবি কিনবে। কখনও আপনারা বেরিয়ে পড়েন দিঘা, শান্তিনিকেতন। সমুদ্রে অবগাহন অথবা খোয়াইয়ে চলে উদাস ভ্রমণ। হোটেলের ঘরে শরীরী সান্নিধ্য উপভোগ। প্রেম বলতে আপনার বোধে-মননে এইসব অনুভূতিই আসে। কিন্তু প্রেমনগরের এই উন্মুক্ত পরিবেশে, নারকোল গাছের ছায়ায়, জারুল ফুলের বন্যায় ভাসতে ভাসতে আপনি ভাবছেন প্রেম এত ক্ষুদ্র নয়, এত সস্তা নয়। সে দু-হাত প্রসারিত করে আহ্বান জানাচ্ছে আপনাকে। আপনি ক্ষণে ক্ষণে শিহরিত। এই ভালোলাগার ভাগ কাউকে দিতে চাইছেন, কিন্তু এখানে কে আছে ওই কোচোয়ান ছাড়া! বুড়ো লোকটা বেশি কথা বলে না। মিটিমিটি হাসে শুধু। এদিকে আপনার অনন্ত জিজ্ঞাসা। আপনি কোচোয়ানের কাছে জানতে চাইছেন, প্রেমনগর মানে কি শুধু গাছপালা, আদিগন্ত সবুজ মাঠ প্রান্তর? মানুষ নেই?
কোচোয়ান মিটিমিটি হেসে মাথা নাড়াল, অর্থাৎ আছে।
আপনি উষ্মা প্রকাশ করে বললেন, আছে তো কই!
কোচোয়ানের মুখে সেই রহস্যময় মিটিমিটি হাসি। আপনার বিরক্ত লাগছে। কোনও কথার স্পষ্ট জবাব দেয় না। এ কেমন লোক রে ভাই!
কোচোয়ান আপনাকে আর একটা রাস্তায় টেনে আনল। দূরের দিকে হাত বাড়িয়ে কিছু দেখাতে চাইল। আপনি ঘুরতেই দেখলেন, ধানখেত থেকে একজন মাঝবয়সি লোক ছুটে আসছে। দু-হাত বাড়িয়ে গানের মতো সুর করে টেনে বলছে, আয় রে ভাই, কদ্দিন তোরে দেখিনি —!
লোকটার কাঁচাপাকা দাড়ি উড়ছে হাওয়ায়। লুঙ্গি খুলে যায় আর কী! মাথার ফেজ টুপিটা হাওয়ার ধাক্কায় উড়ে গেল। কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই লোকটার। আপনি শঙ্কিত হয়ে ভাবলেন, পাগল নাকি!
তখনই কোচোয়ান আপনার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, প্রেমনগরে আপনাকে সম্ভাষণ জানাতে আসছে রমজান।
বলতে বলতে রমজান নামের আধবুড়ো লোকটা সোজা এসে আপনার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবেগে জড়িয়ে ধরে বলল, আয় ভাই, আমাদের প্রেমনগর যে তোর জন্য অপেক্ষা করছে।
রমজান আপনাকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে গেল একটা ছোট্ট কুটিরের সামনে। বেশ সাজানো গোছানো মাটির বাড়ি। নিকনো দেওয়াল, উঠোন। তুলসীমঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে সজোর হাঁক পাড়ল রমজান, কই গো, দ্যাখো কে এসেছে!
কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল এক অল্পবয়সি বউ। মাথায় টানা সিঁদুর, হাতে শাঁখা। মুখে একগাল হাসি নিয়ে এত দেরি করে আসতে হয় ভাই! এসো-এসো, বোসো ভাই। জল-বাতাসা খাও।
আপনি বারবার চোখ কচলাচ্ছেন। বুঝতে পারছেন না, যা দেখছেন, শুনছেন সেটা কি কোনও স্বপ্নদৃশ্য, নাকি বাস্তবিকই সত্য! আপনি অসহায়ের মতো তাকালেন কোচোয়ানের দিকে। আকারে ইঙ্গিতে জানতে চাইলেন, এর রহস্য কী?
কোচোয়ানের মুখে সেই মিটিমিটি হাসি। বুঝতে পারছেন কোচোয়ান কোনও জবাব দেবে না। আর সেটা বুঝেই আপনি আর কোনও প্রশ্ন করলেন না।
রমজানের বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা পুকুরপাড় ধরে কোচোয়ান আপনাকে নিয়ে চলল। পুকুর জুড়ে শাপলা ফুটে আছে। তাতে প্রজাপতির ঝাঁক। রঙের যেন বন্যা বয়ে যাচ্ছে। ঘাটের পাড়ে এক দম্পতি হাঁ করে দেখছে প্রজাপতির খেলা। কোচোয়ান ওদের সামনে দাঁড় করাল আপনাকে। আপনি অবাক। বুঝতে পারছেন না কী দেখার ন্য আপনাকে দাঁড় করাল কোচোয়ান! শাপলা ফুল, প্রজাপতি নাকি ওই দম্পতি! দেখার কী আছে! এসব তো আপনার অপরিচিত নয়। কোচোয়ান জানাল, ওই সকিনা মেয়েটা অন্ধ। ওর ধারণা এক হাজার প্রজাপতি চোখের পাতায় বসলে ও দৃষ্টি ফিরে পাবে। আর ওই যে পাশে বসে আছে সুবল, ওর কাজ হলো প্রজাপতি গোনা। বলে কোচোয়ান সুবল নামের লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, কত হলো রে সুবল?
সুবল হেসে বলল, এখনও পর্যন্ত দুশো হয়েছে। হাজার হতে আর বেশি বাকি নেই। আমার সকিনা নিশ্চয়ই আলো পাবে চোখে।
আপনি ফিসফিসিয়ে কোচোয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন, ওরা কি স্বামী-স্ত্রী?
কোচোয়ান আবার হাসল। কোনও কথা বলল না। আপনি বিরক্ত হলেন। লোকটা কি ওর সঙ্গে ন্যাকামি করছে? একবার ভাবলেন কথাটা বলবেন কিনা। পরক্ষণে অবশ্য খারিজ করলেন। প্রেমনগরের মানুষজন আসলে কেমন, সেসম্পর্কে আপনার স্পষ্ট কোনও ধারণা এখনও গড়ে ওঠেনি। কোনও কারণে যদি কোচোয়ান লোকটা রুষ্ট হয়, তবে এখানে আসাই বৃথা। আপনি এসেছেন একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। সেক্ষেত্রে কোচোয়ানের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কেননা প্রেমনগরের আসল চাবিকাঠি ওই লোকটাই। ওকে হাতছাড়া করা যাবে না কোনও মতেই। লোকটা মুখ খোলে না সহজে। তবে আপনার দৃঢ় বিশ্বাস, একসঙ্গে পাশাপাশি চলতে চলতে একসময় ওর বিশ্বাস অর্জন করতে পারবেন। তখন নিশ্চয়ই প্রেমনগরের আসল চাবিকাঠির সন্ধান দেবে সে।
আপনি ক্রমাগত হেঁটে চলেছেন কোচোয়ান লোকটার পাশাপাশি। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, আপনার কোনও কষ্ট হচ্ছে না। অথচ মাসটা জ্যৈষ্ঠ। এখন গরমে হাঁসফাঁস করার কথা। অথচ এই প্রেমনগরে আপনার শরীরে ক্লান্তিজনিত কোনও ঘাম নেই। এমন মিষ্টি রোদ আপনি কখনও উপভোগ করেননি। দিনের সূর্যকে মনে হচ্ছে চাঁদের প্রতিভূ।
পথের দু-পাশে গাছের শোভা দেখতে দেখতে আপনি এগোচ্ছেন। কোথায়, কোনদিকে চলেছেন, আপনার নিজস্ব কোনও ধারণা নেই। কোচোয়ান আপনাকে যেদিকে নিয়ে চলেছে, আপনি সেইভাবেই অনুসরণ করছেন ওকে। আপনার চোখে ভাসছে সবুজের বন্যা। এত সবুজ অঞ্চল আপনি এর আগে কখনও দেখেননি। প্রতিটি বাড়ির সামনে যেন সবুজ ঘাসের গালিচা পাতা। নানারকম ফুলের গাছ। আর প্রজাপতি! আপনি জীবনে এত প্রজাপতি দেখেননি কখনও। এত মহিরুহও চোখে পড়েনি কখনও। কৌতূহলে আপনি জিজ্ঞেস করলেন, এসব গাছ কেটে নেয় না কেউ!
কেননা, আপনার অভিজ্ঞতা আছে, গাছ কেটে নেওয়াটাই আপনাদের সমাজের দস্তুর। সেসব নিয়ে একটু-আধটু হইচই হয় বটে, তবে অচিরেই সেসব ধামাচাপা পড়ে যায়। সেখানে এই ব্যতিক্রমী ঘটনা আপনাকে অবাক করছে। এসব রক্ষা করে কে?
আপনার জিজ্ঞাসার জবাবে কোচোয়ান সেই মৃদু হেসে বলল, এখানকার মানুষ।
— কেউ কেটে নেয় না?
কোচোয়ান মাথা নাড়িয়ে জানাল, যাদের ভিতরে প্রেম আছে, তারা এসব অকারণ হত্যা করবে কেন! প্রেমনগরে তো প্রেমেরই প্রাধান্য।
আপনি মাথা নাড়লেন। কথাটা মনে ছিল না। সত্যি, প্রেম ছাড়া প্রেমনগর বৃথা। এই যে গাছপালা, পশুপাখি, মানুষজন এখানে নির্বিচারে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে, সেসব তো প্রেমেরই কারণে। আপনি আসলে এই প্রেম সম্পর্কেই জানতে চান, বুঝতে চান। দেখতে চান তার স্বরূপ।
আপনি হাঁটতে হাঁটতে দেখছেন, দূরের পথ দিয়ে পিল পিল করে মানুষ চলেছে। নারী-পুরুষ। বুড়ো-বুড়ি থেকে কচিকাঁচা পর্যন্ত। কেউ লাঠি হাতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, তার হাত ধরে নিয়ে চলেছে আর এক খঞ্জ মানুষ। এক অন্ধ মানুষকে হাত ধরে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে একটা বাচ্চা মেয়ে। প্রত্যেকের মুখে হাসি। একটা অদ্ভুত গান উঠে আসছে সকলের কণ্ঠ থেকে। কোচোয়ান আপনার হাত ধরে ওদের পিছু পিছু নিয়ে চলল। আপনারও মনে কৌতূহল। সেই টানে কোচোয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, ওরা কোথায় যাচ্ছে?
কোচোয়ান উত্তর না দিয়ে আপনাকে ওদের পিছু পিছু টেনে নিয়ে এলো একটা খোলা চত্বরে। আপনি দ্বিতীয়বার একই প্রশ্ন করলেন। কোচোয়ান হেসে বলল, প্রেমনগরে আজ অতিথি বরণ উৎসব। ওরা আপনাকে আজ বরণ করবে নেচে গেয়ে।
আপনি অবাক চোখে দেখলেন ওই মানুষগুলো — নারী-পুরুষ, বুড়ো-বুড়ি, কচিকাঁচা, সবাই আপনাকে ঘিরে নাচ শুরু করল। গাইছে বিচিত্র সুরে। আপনি দেখছেন এখানে সবাই, সবকিছু একাকার। কাউকে আর আলাদা করে চেনার উপায় নেই — কে কোন ধর্মের বা বর্ণের। ওরা হাত বাড়িয়ে আপনাকে ডাকছে। গানের সুরে বলছে — এসো ভাই, আমাদের হাতে হাত রাখো —।
আপনি টের পেলেন, পিছন থেকে কোচোয়ান আপনাকে ঠেলে দিল। আপনি সম্মোহিতের মতো ওদের হাত স্পর্শ করলেন। মুহূর্তেই যেন বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে গেল আপনার শরীর বেয়ে। অসম্ভব এক ভালোলাগায় আপনি ওদের মধ্যে ভেসে গেলেন। ওদের গানে নাচে মেতে উঠলেন। ওরা আপনাকে ঘিরে নাচছে আর গানের সুরে বলে চলেছে, আয়রে ভাই, আমাদের মাঝে রয়ে যারে ভাই...।
সঙ্গে সঙ্গেই আপনার মন বিদ্রোহ করে উঠল। আপনি তো এখানে থাকতে আসেননি। আপনাকে ফিরে যেতেই হবে। এতক্ষণ যে আবেগে ওদের গানে নাচে মাতোয়ারা ছিলেন, সেই আবেগ যেন এক লহমায় ফিকে হতে শুরু করল। মনে পড়ল আপনার ঘর আছে, পরিবার আছে। সর্বোপরি আছে শ্রীময়ী। ওদের অবহেলা করতে পারেন না। আপনাকে ফিরতেই হবে। কিন্তু ওরা যেভাবে আপনাকে ঘিরছে, মনে হচ্ছে আপনাকে কিছুতেই যেতে দেবে না এখান থেকে। আপনার ভালো লাগছে না। টের পাচ্ছেন, যে প্রেম আপনার ভিতরে ছিল, দ্রুত উবে যাচ্ছে। তখনই টের পেলেন আপনার শরীর ভারি হয়ে আসছে। দু-চোখ জুড়ে নেমে আসছে ঘোর গভীর অন্ধকার আর অন্ধকার...।
##
চোখ মেলতেই নিজেকে আবিষ্কার করলেন সেই বাসরাস্তার ধারে, সেই গাছতলায় — যেখান থেকে আপনি যাত্রা শুরু করেছিলেন। আপনাকে ঘিরে আছে কিছু মানুষ। কৌতূহলী চোখে দেখছে। ওদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করল, আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন?
মানুষগুলোকে দেখে আপনার খুব চেনা মনে হলো। এদেরই তো দেখেন চারপাশে। কিন্তু প্রেমনগর! আর সেই কোচোয়ান! কোথায় গেল! আপনি বললেন, আমি কোথায়?
ওদের একজন বলল, আপনি তো রানিনগরে আছেন।
আপনি অবাক হয়ে বললেন, কিন্তু আমি তো ছিলাম প্রেমনগরে!
প্রেমনগর! সমস্বরে হাসির রোল উঠল চারপাশ জুড়ে। একজন বলল, ওই হোসেন মিয়ার পাল্লায় পড়েছেন তো?
— কে হোসেন মিয়া?
— আরে ওই যে কোচোয়ান বলে যাকে চেনে সবাই। আস্ত পাগল একটা। কোথাকার কোন ময়না দ্বীপ থেকে এসেছে। সে দ্বীপ জলে তলিয়ে গেছে। এখন এখানে এসে সবাইকে শোনায় তার প্রেমনগরের গপপো। দুর-দুর, প্রেমই নেই তো প্রেমনগর! ওরকম নামে কোনও গ্রাম আছে নাকি কোথাও! সব গাঁজাখুরি গপপো।
আপনি গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন, কোথায় হোসেন মিয়া?
একগাল হাসির সঙ্গে উত্তর পেলেন, তাকে পাবেন কোথায়! দেখুন গে, আপনারই মতো আরেকজনকে জুটিয়ে ওর গাঁজাখুরি গপপো শোনাচ্ছে। আপনি ফিরে যান। ওই আপনার বাস আসছে।
বাসে চলতে চলতে আপনি বারবার চোখ কচলাচ্ছেন। ভাবছেন, প্রেমনগর কি সত্যিই নেই? যা দেখেছেন, তা কি মিথ্যে হতে পারে! কে জানে!