গল্প

জেলখানার চিঠি



শাশ্বত নিপ্পন


ক্যেন্দু না গো বুন, ক্যেন্দু না, আল্লারে ডাকো, বলেই নিজের ময়লা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মোছে হাশেদের মা। হাশেদের মায়ের এই সুগভীর সান্ত্বনার পরও হাঁসুলি বানুর বুকের মধ্যে শত সহস্র বছরের জমে থাকা কান্না দ্বিগুন বেগে বেরিয়ে আসতে চায়। তারপর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে সে বলে, এই সেদ্দো ডিম দু'টো নাও; ছেলেকে বিনি দাও। ও আল্লা, খালা ককুন আলি? কলায়ের ডালের বড়ি দিয়ে রান্না ছোলার শাকের ঘন্টো দিয়ে ভাত খেতে খেতে জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করে হাশেদ।

এই একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমাদের গ্রামের; একজনের আনন্দ-বেদনায় অন্যকে দাওয়াত করা লাগে না। গ্রামের মানুষের আপদে-বিপদে বর্ষায় ভেসে যাওয়া বিলের পানির মতো ছুটে আসে আশে-পাশের মানুষ। এই যে, বেশ কিছু দিন পর হাশেদ আজ বাড়ি ফিরেছে; আনন্দ হিল্লোল বয়ে যাচ্ছে ওর মায়ের শুকনো প্রাণে। সেই আনন্দের টানে এসছে হাঁসুলি বানু; আসার সময় দেশি মুরগির দুটো ডিমও এনেছে সিদ্ধ করে।

হাশেদ বাড়ি এসেছে আজ দুপুরের পর। ওর মা জানত না যে, আজ হাশেদ আসবে। উঠানের বাতাবি লেবু গাছটার নিচ থেকে হাশেদ যখন ডাক দিল, 'মা...এ...মা' – তখন জোহরের অক্ত পার হয়েছে। ডাক শুনে চমকে উঠেছিল ছমিরন বেওয়া, হাশাদের মা। দৌড়ে আসতে গিয়ে পড়ে আর কি! তারপর ছেলে আসার আনন্দে কাজের দিশা পায় না বুড়ি।

বউ নেই। বাপের বাড়ি গিয়েছে বেশ ক'দিন। ধান আনতে। বউ থাকলে সে-ই সব করত। ছমিরনের এই বয়সে দেহ চলে না; তাছাড়া ছেলে ঘরে ফেরার আনন্দে তার সর্বাঙ্গ কাঁপছে। সেই কাঁপা হাতেই ছমিরন রান্না করেছে বড়ি দিয়ে ছোলার শাক আর বেগুন শুটকি। ছেলে খাচ্ছে; এই দৃশ্য দেখে খুশির বান ডেকেছে বুড়ির প্রাণে! খেতে খেতে গা চুলকায় হাশেদ। তারপর আঙুল চেটে খাওয়া শেষ করে। কুলোকুচি সেরে দাওয়ার মেলে রাখা বউ-এর পেটিকোটে মুখ মোছে সময় নিয়ে। গন্ধ নেয়। তারপর সদর থেকে কেনা সিগারেট জ্বালায়; একবুক ধোঁয়া ছেড়ে বলে, বেশি চিন্তা কোরু না খালা; ছিফাত ভালই আছে;
তুমার সাথে দেখা হইলো বাপ?

দ্যাখ মা, খালা কী বুলে। আরে আমার কাছেই তো থাকতুক – সেই পরথম থেকেই। কথাগুলো মন দিয়ে শোনে হাঁসুলি বানু। শুনে সজল চোখে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে সে।

আধ-খানা পান হাতে দিয়ে ছমিরন বলে, তুই কুনু চিন্তা করিসনি বুন; একটু সময় তো নাগবেই; গ্যালোই তো সেদিন; আমি তো আইত – দিন আল্লা আল্লা করতাম; আল্লা মুক তুলে চেইচে – ছমিরনের গলায় কিছুটা অহংকার ঝড়ে পড়ে।

তা তো ঠিকই বু; ক্যান্ত ছিফাতের শরিলডা ভাল না; বুকে আসোক; ওর বাপেরও তাই ছ্যালো –

বছর তিন চারেক হলো ছিফাতের আব্বা মারা গিয়েছে। কাঁচা বাজারে মোট টেনে আর এক ফালি জমি আবাদ করে দিন চলে যেত তাদের। একদিন কাঁচা মাল বোঝাই ট্রাক উলটে মারা যায় ছিফাতের বাপ, বশির মিয়া। একচিলতে জমিটুকু দিয়ে বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এখন থাকা বলতে, পুরোনো মাটির কলসির তলানিতে পড়ে থাকা পচা পানির মতো এই জীর্ণ ঘর, আর মা-বেটা। এখন শুধুই মা।

ভিতরে ছিফাত কী করে বাপ? আকুল হয়ে জানতে চায় হাঁসুলি বানু। সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে হাশেদ বলে, ওখানে খালা সকাল হয় ফজরে; নামাজ পড়ি যে যার মতো; কেউ কুরান পড়ে, কেউ তসবি টেপে – আমার ছিফাত কি করতু আব্বা? এক বুক মায়া জড়ানো কৌতূহল নিয়ে আবার জানতে চায় হাঁসুলি বানু; তার এই কৌতূহল ঝরে পড়ে এক নিঃশব্দ হাহাকার।

দেখতে দেখতে বেলা পড়ে আসে। পাশের বাগানের বড়ো লিচু গাছটার ফাঁক গলে দিনের সূর্যটা তেল শেষ হওয়া কুপির শিখার মতো দপদপ করতে থাকে। ক্লান্ত বকের ঝাঁক আগেই ফিরছে। শীতের বিকেল দাঁড়াই না মোটেও। এলোমেলো বাতাসে মাঘ মাসের শীত নামতে থাকে কাটাখালের দক্ষিণ পাড়ের তাল গাছের কালো শরীর বেয়ে। বেলা পড়ে আসার সাথে সাথে হাশেদ ব্যস্ত হয়ে উঠে। মা, ট্যাকা পয়সা কিছু থাকলি দেদিনি; বাজারে যাই, একটু চা খাই – বলেই হাশেদ ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। যেতে যেতে বলে, ও খালা তুমার সাথে পরে কতা বুলবু – মাঘ মাসের হিম নামার মতো ইাঁসুলি বানুর বুক চিড়ে নামে দীর্ঘশ্বাস। মনে পড়ে মুরগি আর চীনা হাঁসগুলো বাইরে আছে; ঘরেও জ্বালানো হয়নি কুপি।

তুই বাড়ি যা বুন; আল্লা আল্লা কর; তোর শরিলও তো খারাপ; হেরি গিইচিস এক্কেবারে; না খেয়ি থাকিসনি বুন; মনডারে দড় কর – এই বলে, একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে ছমিরন বেওয়া তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এই আন্তরিক স্পর্শে অনেক দিন পর হাঁসুলি বানুর মায়ের কথা মনে পড়ে। খুন খুন করে কেঁদে উঠে সে। আর খাওয়া বুবু! একটু পানিও গিলতে পারিনি! খালি ছেলিডার কতা মনে পড়ে বুবু গো... চোখ মুছতে মুছতে উত্তর দেয় হাঁসুলি বানু।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসে তাদের চারপাশে।

।। ২ ।।

জীর্ণ ঘরে দিপ দিপ করে আলো জ্বলে। বেড়ার ফাঁক গলে ঠান্ডা বাতাস ঘরের সবকিছু ভাসিয়ে দেয়। চীনা হাঁসগুলো অযথা শব্দ করে; আকাশের প্রান্ত ছুঁয়ে আদ্দিকালের সেই রহস্যময়ী চাঁদ উঠেছে প্রতিদিনের মতো। টিনের থালায় ভাতের মোটা দাঁনাগুলো জমাট বেঁধে পড়ে থাকে ঘরের এক কোণে। নিতান্ত অবহেলায়।

হাঁসুলি বানুর গা গুলিয়ে উঠে হঠাৎ; পায়ের তলার মাটি দুলতে থাকে হাল ভাঙা নৌকার মতো। বমি হয়। নাড়ি ছেঁড়া বমি। পেট থেকে সবুজ লালা বেরিয়ে আসে; পেট থেকে মুখ পর্যন্ত তেঁতো হয়ে যায়। আর বসে থাকতে পারে না সে; চারপাশে কুয়াশার মতো আবছা তন্দ্রা নিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ে হাঁসুলি বানু। তার শ্বাস আটকে আসে; তার মনে হয় এক বাতাসহীন কবরে কাফন ছাড়া কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে সে। এর মধ্যেই হাঁসুলি বানু দেখতে পায় ছিফাতের বাপ এসেছে। খুবই ঘর্মাক্ত সে। উঠানে বসে হাঁপাচ্ছে। সে দেখে, এক সময় ছিফাতও এসে তার পাশে বসে। অবাক হয়ে হাঁসুলি বানু ছেলেকে জিজ্ঞেস করে, কুতাই গিয়েছিলি বাপ আমার?

মা, আমি কিছু জানিনি; ওদেরকে যতই বলি বিশ্বাস করে না; পিটায়;

আহারে! কাছে আয় বাপ,ত্যাল নাগাই দি; হাঁসুলি বানু সরিষার তেল গরম করে দুপুরের রান্না শেষ হওয়া চুলার আঁচে; তারপর সেই তেল ছেলের পিঠে ডলে দেয় খসখসে হাতে। গভীর মমতায় জানতে চায় আরাম নাগচি বাপ?

বাইরে তখন জমাট অন্ধকার। দুএকটা জোনাক পোকা লেজের প্রান্তে আলো জ্বালিয়ে উড়ে। খাঁচাতে পুরুষ হাঁসটা অন্যদের ঠুকিয়ে দেয়; অন্য হাঁসগুলো কাঁকিয়ে উঠে। ঘরের কোণে জ্বলে থাকা কুপির মাথায় কালো পুঁটলি জমে; মোটা ধোঁয়া এঁকেবেঁকে উপরের দিকে উঠে যায়।

মা, ওরা খুব মারে, ছিফাত বলে;

তুমি আল্লাকে ডাকপা আব্বা;

কাল আমাকে ওরা রিমান্ডে নেবে মা,– কাঁদো কাঁদো গলায় ছিফাত বলে;

উকানে তুমাকে নেবে ক্যানে বাপ?

রিমান্ডে কি হয় মা?

আমি জানিনি; তোর আব্বাকে শুদাস; ভাত খাবি বাপ? হাঁসের গোস দিয়ে?

মা, আমি ক্যান্ত ছায়া হয়ি এইচি; না হলে আসতি পারতাম না; হি হি হি – ছিফাত হাসে।

খুব ভালো করিচো আব্বা জান; না হোলি আমাকে আর পেতি না;

ক্যানে মা?

উমা, আমি চলি যাচ্ছি যে; ও দে, তোর বাপ নিতি এইচে;

কুতাই? আমি জানি? হাঁসুলি বানু ছেলেকে বুকের মাঝে টেনে নেয়।

আবার তার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়; বুক সহ পাঁজরটা চেপে বসে। হাঁসুলি বানু ছিফাতের চুলের গন্ধ পায়; তেল-সাবান-চিরুনিহীন আঠা আঠা চুল – তবুও কি সুন্দর গন্ধ! হাঁসুলি বানু হাঁ করে বাতাস খোঁজে; অন্ধকার ঠেলে তার চোখ দু'টো বেড়িয়ে আসে; সে চোখ থেকে স্বপ্ন নয়, একটা দগ্ধ জীবন যেন বেরিয়ে আসতে চায় –

ঘরে কুপির মাথায় জমে উঠা কালো পুঁটলিটা একসময় ভেঙ্গে পড়ে। আলো ফুরিয়ে আসে। আর তখনই জীর্ণ ঘরে বাতাচিতে সাপের গায়ের মত অন্ধকারের গা ঘেঁসে একটা কালো কুচকুচে ক্ষুধার্ত বিড়াল নিংশব্দে এসে দাঁড়ায়; তীক্ষ্ম চোখে সে তাকিয়ে থাকে জমাট বাঁধা ভাতে থালার দিকে নয় বরং তার উপর বসে থাকা যুবক ইঁদুরটার দিকে।

।। ৩ ।।

সকাল হয়েছে আমাদের গ্রামে। মাঘ মাসের ঠান্ডা সকাল। আমি চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়েছি; এ সময়ের ঠান্ডা সাংঘাতিক। এবার রবি শষ্য ভালো হয়েছে। গমের শিষগুলো ঘন কালচে হয়ে উঠেছে। আমি মুগ্ধচোখে সরিষা ফুল দেখতে দেখতে হাঁটি।

ক'জন পুলিশ আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমি সভয়ে দাঁড়াই; তারপর ঠিকানা অনুযায়ী ছিফাত, পিতা, মোঃ বশির আলি মৃত, মাতা, হাঁসুলি বানু, সাং আমাদের গ্রাম-বাড়িটা দেখিয়ে দিই।

ততক্ষণে একদল কৌতূহলী মানুষ হাঁসুলি বানুর বাড়ির উঠানে জড়ো হয়েছে। ছমিরন বেওয়াও বাদ যায়নি। সূর্যের মোলায়েম রোদ এসে পড়েছে একচিলতে উঠানে; ঘরের পিছনের সজনে গাছটাতে দুটো শালিক গা ফুলিয়ে বসে আছে।

ধমকের সুরে পুলিশদের একজন বলে, একটা চিঠি ছিল; জেলখানার চিঠি; আসামির নাম মোঃ ছিফাত; বডিটা তার মায়ের কাছে হস্তান্তর করতে হবে – কে নেবে? হাঁসুলি বানু কে?

জড়ো হওয়া মানুষগুলো যেন পাথরের মানুষ! শব্দহীন চারপাশ জুড়ে নৈঃশব্দ্য জেঁকে বসে। শুধু পুলিশের খরখরে গলার আওয়াজটা এক চিলতে উঠানের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়ে।