গল্প

বুদ্ধর বিস্মৃতি



উত্তম পুরকাইত


ইদানীং রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই বুদ্ধর মনে হয়, বোধহয় কিছু একটা সে হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কি হারিয়েছে সেই দুশ্চিন্তাতেই যেন সকাল সকাল চমকে চমকে ঘুম ভেঙে যায়। বেশি রাতে ঘুমাতে যাওয়া চিরকালের অভ্যেস। তাই সকাল সকাল উঠে পড়া ধাতে সয় না। এতদিন সকালের এই ঘুমটুকু বুদ্ধর খুব প্রিয় ছিল। তাই মনে মনে বিরক্ত হয়। এই হয়েছে এক জ্বালা! বিছানায় বসে অনেক্ষণ ধরে ভাবে কী এমন গুরুত্বপূর্ণ বস্তু সে হারাতে পারে!

তারপর সারা ঘর তন্ন তন্ন করেও খুঁজে পায় না কি হারিয়েছে। কাঁচা ঘুমে এই এক উটকো ঝামেলা একদিন দুদিন হয় তাও মানা যায়। প্রতিদিন! কোনো কোনো দিন এদিক ওদিক খোঁজ করে দেখেছে। বড়ো জোর একটা লাল পেন দিন কয়েকের মধ্যে খুইয়েছে। কিংবা সভামঞ্চে গলায় যে উত্তরীয়টা পরিয়ে দিয়েছিল আয়োজকরা সেটা ফেলে রেখে চলে এসেছে। এর বেশি কিছু খুঁজে পায় না। লাল পেন কিংবা উত্তরীয় যাইহোক, এগুলো সে আগেও অনেকবার হারিয়েছে। আবার কখনও কখনও ফিরেও পেয়েছে। পেন না হোক, উত্তরীয় আয়োজকরা ঠিক পাঠিয়ে দিয়েছে কারও হাতে।

ছেলেবেলা থেকেই একটু খেয়ালি মানুষ। কথায় কথায় অন্যমনস্ক হয়ে পড়া স্বভাব। তাই এইসব ছোটোখাটো বস্তু হারাবার জন্য কখনো আফসোস হয় না। জীবনে লাল পেন বা উত্তরীয় নয়, সবচেয়ে বেশি সে হারিয়েছে ছাতা। দামি ছাতা এখন একদম কেনে না, গেলে অল্পের উপর দিয়েই যাবে। আজ পর্যন্ত কতগুলো ছাতা বুদ্ধ হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এমন, এখন প্রয়োজন পড়লেও স্ত্রী, মেয়ে কখনও নিজেদের ছাতা দিতে চায় না।

ভেবে দেখলে দোষ ঠিক বুদ্ধর নয়। আয়নায় দেখেছে মায়ের মুখের সঙ্গে তার মুখের আশ্চর্য মিল। মামার বাড়ি গেলেই শুনত, এ যে তোর মুখ হুবহু বসানো অনিমা? মায়ের সঙ্গে এই সাদৃশ্যের তুলনা ছেলেবেলায় বুদ্ধর বেশ ভালো লাগত। বড়ো হয়ে বুঝতে পারে শুধু চেহারায় নয়, বুদ্ধর মায়েরও ছিল যখন তখন এটা ওটা হারিয়ে ফেলা স্বভাব। বুদ্ধ ভেবে বিস্মিত হয়, কত কিছু নিয়েই আমরা জন্মাই। ডাক্তারদের পরিভাষায় এই হারানো বা ভুলে যাওয়াও নাকি একটা বংশগত রোগ। এই অস্বস্তির মধ্যেও হারানো মায়ের কথা মনে পড়ায় বুদ্ধর কষ্ট বাড়ে।

মনে পড়ে কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে মা বলতে শুরু করবে – ওরে আমার এ কি সব্বনাশ হল রে! ওরে বাবা রে! এ আমি কি করে ফেলনু গো! হাঁউ মাউ করে পাড়া মাত করে দেবে। ঠিক কি হয়েছে বোঝা যাবে আরও কিছুটা শোনার পর- একটু আগেও আমি যে কানে হাত দিয়ে দেখেছি। কোথা পড়ে গেল কে জানে! ওগো আমার কি হবে! আমার সোনার কানের!

কিছুক্ষণ ধরে চলবে কীভাবে ব্যপারটা জানা গেল তার বিবরণ – ভাগ্যিস সেজ কাকিমা বলল তাই! এসেই বলে – বৌমা! ব্যাপার কি বলত? তোমার বাঁ কানে কানেরটা নেই কেন ? তখন কানে হাত দিয়ে দেখি সত্যিই তো নেই! ওরে বাবা রে, আমার কি হবে গো! ও বুদ্ধ, একবার ছুটে গিয়ে দেখ না বাবা! আমি যে কোথাও খুঁজে পেলুম না! তোর বাবা জানতে পারলে আর রক্ষে থাকবে? – যেন বুদ্ধ গিয়ে দেখলেই খুঁজে পাওয়া যাবে।

আমাদের তখন খেলা বেশ জমে উঠেছে। খেলার মাঝে এভাবে হুট করে চলে যাওয়া যায় না। আর এটা প্রায়শই ঘটত বলে বন্ধুরাও মায়ের প্রতি বিরক্ত ছিল। তাছাড়া খেলার একটা নিয়ম আছে। চোর হয়ে খেলায় চোর না দিলে পরের দিন ওরা আর খেলতে নেবে না। তাই সহজে মায়ের কথা কানে নিত না বুদ্ধ। যেন শুনেও শোনে না ভান করত। কিন্তু মায়ের তখন আর ধৈর্য ধরে না। বার কয়েক ডাকার পর শেষে আর থাকতে না পেরে বুদ্ধর কান ধরে টেনে হিড় হিড় করে নিয়ে যেত ঘরে। বুদ্ধ চিৎকার করত – আ! লাগছে! লাগছে! ছাড়ো! ছাড়ো! মা কি আর সে কথা শোনে? অগত্যা চিৎকার করতে করতে যেতেই হতো একেবারে বাড়িতে।

আর ঘরে যাওয়া মাত্র বুদ্ধ হারানো কানের খুঁজে এনে মার হাতে দিলে মায়ের যেন বিশ্বাসই হতো না। হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ হাঁ করে কানেরটার দিকে তাকিয়ে থাকত। সোনার জিনিস ফিরে পাওয়ার স্বস্তি আর ছেলের প্রতি মনে মনে গর্ব ঝরে পড়ত সেই তাকিয়ে থাকায়। বিশ্বাস ফিরে পেলে আতঙ্কিত মুখটা মুর্হূতে একেবারে হাসিতে ভরে উঠত। তখন বুকে জড়িয়ে মায়ের সে কি আদর! বুদ্ধর সুড়সুড়ি লাগত খুব। আসলে মা যতই বলুক একটু আগে কানে হাত দিয়ে দেখেছে, ওটা যে বালিশের ওয়াড়ের পিছনে গাঁথা থাকবে সে বুদ্ধর জানা হয়ে গিয়েছিল।

মা চলে যাবার এই পনেরো বছর পরে বুদ্ধর এখন রোজ মনে হয়, প্রতিদিন সে একটা না একটা কিছু হারিয়ে ফেলছে। কিন্তু সেটা কি? কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। ইদানীং প্রতিদিনই ভুলেও যায় আগের দিন ঠিক কি হারিয়েছে বলে মনে হয়েছিল। শুধু সেদিনটার কথাই মনে থাকে। কখনো কখনো সেদিনটার কথাও ভুলে যায় একটু বেলা হলে। অথচ হারানো কোনো কিছুই আর ফিরে পায় না। এই মনোভাবের কারণ কিছুতেই খুঁজে পায় না বুদ্ধ।

এখন আফসোস হয়, মায়ের কানের দুল বা পায়ের নূপুর, রূপোর আংটি না হয় বুদ্ধ খুঁজে দিত, তার এই হারিয়ে যাওয়া গুলোকে খুঁজে দেবে তাকে? এভাবে হারাতে হারাতে একদিন নিঃস্ব হয়ে যাবে না তো? মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়াই ভবিতব্য। তবু যতদিন বেঁচে আছে কি নিয়ে বাঁচবে? স্ত্রীর মৃত্যুর পর বাড়িতে সে একপ্রকার নিঃসঙ্গ। হাতের কাছে কেউ থাকে না। নিছক অধ্যাপক বলেই এলাকার যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আয়োজকরা বক্তা হিসাবে ডাকে। আগে সমস্ত অনুষ্ঠানে যেতে সম্মত না হলেও অবসরের পর কাউকে না করে না।

হারানো বস্তু বা বস্তুর স্বরূপ খুঁজে না পেয়ে বুদ্ধর হতাশা দিন দিন বাড়ে। মনে পড়ে কথায় আছে 'বার্ধক্যে দিনগত পাপক্ষয়। বুদ্ধর এখন প্রতিটি দিনই ক্ষয়ে যাচ্ছে। অনেকে বলেন তৃতীয় প্রজন্মের আয়নায় নাকি অনেক হারানো দিন কিছুটা খুঁজে পাওয়া যায়। দাদু ও নাতির স্বভাবের মিল সে নিজেও দেখেছে। গালবাজ রথীনকে দেখে বয়স্কদের অনেকেই বলত, শালা একেবারে দাদুর হাত রেখেছে। কিন্তু বুদ্ধর সে সুযোগ থেকেও নেই। কারণ ছেলে, মেয়ে কেউ এখন এদেশে থাকে না। ছেলে আমেরিকা, মেয়ে ইংল্যান্ডে। তাছাড়া ছেলের পক্ষে তাদের নাতি নাতনি কেউ হলো না। মেয়ের দুটি ছেলেও দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে গেল। কোনো বছর দেশে আসে কোনো বছর আসে না। আর এলেও বুদ্ধ যে তাদের খুলে বলতে পারবে ঠিক কী কী হারিয়েছে, সে বিশ্বাসও এখন বুদ্ধর নেই। প্রথমত স্মৃতিশক্তি আগের মতো কাজ করে না, তার উপর রোজই মনে হয় নতুন কিছু সে হারিয়েছি। আগের দিন কি হারিয়েছিল সেটা একপ্রকার ভুলেই যায়।

অবশেষে ডাক্তারের কাছে যাওয়া ছাড়া বুদ্ধর উপায় থাকে না। ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার বলেন – দেখুন, এখন আপনার যে বয়স তাতে অল্প-বিস্তর বিস্মৃতি স্বাভাবিক। এটা নিয়ে চিন্তা করবেন না। পয়েন্ট ফাইব একটা ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি খান, দেখবেন ঘুমটা একটু ভালো হলে বিস্মৃতিটাও কমবে। এটাকে অসুস্থতা না ভেবে স্বাভাবিক বলে মনে করুন। আপনি তো চাইলেও আর শৈশবে ফিরে যেতে পারবেন না। শৈশবকে এনজয় করেছেন। তারুণ্যকে, আই মিন যৌবনকে এনজয় করেছেন, এখন এই বয়সটাকেও এনজয় করুন।

বুদ্ধ কিছুতেই ডাক্তারকে বোঝাতে পারে না, এরকমটা যে সে ভাবেনি তা নয়। এটা সে রকম ভুলে যাওয়ার ব্যাপার নয়। প্রতিদিন ঘুম ভাঙে একই বোধ আর হতাশা নিয়ে। তাই আবার বলে – দেখুন, প্রতিদিন মনে হয় একটা কিছু হারিয়েছি, কিন্তু কি আশ্চর্য বলুন তো, কি হারিয়েছি তা ঠিক খুঁজে পাওয়া যায় না। ডাক্তার বুদ্ধর হারিয়ে যাওয়ার কথাটা বেমালুম উড়িয়ে দিয়ে ভুলে যাওয়া কথাটাকেই ধরে বসে থাকেন।

অবশেষে হারানোর ব্যপারটাকে আবারও জোর দেওয়ায় ডাক্তার বলেন – দেখুন, এই যে হারিয়েছি হারিয়েছি বলছেন, এটাও এই বয়সে খুবই কমন ব্যাপার। বলতে পারেন এ আসলে একটা উদ্‌বেগ। এ বয়সে টেনশন বেড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। শুধু আপনার কেন, অধিকাংশ মানুষেরই হয়। জীবনের এতগুলো বছর ধরে এতকিছু সঞ্চয় করেছেন, এখন বয়সের কারণে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস কমেছে। কোথায় কার হাতে সব দিয়ে যাবেন – এ উদ্‌বেগ থাকবেই। তাই টেনশন বেড়েছে। এ নিয়ে চিন্তা করার বিশেষ কিছু নেই।

পুনরায় বুদ্ধ ডাক্তারকে আশ্বস্ত করে জানায় – না, বয়সের কারণে তার কোনও টেনশন বাড়ছে না। সে জানে বয়স বৃদ্ধি স্বাভাবিক, জীবন কোথাও থেমে থাকে না। চল্লিশ-পঞ্চাশের পর প্রায় সকলকেই তার প্রিয় মানুষদের একে একে হারাতে হয়। অভিজ্ঞতার সঙ্গে মনের একটা অ্যাডজাস্টমেন্ট হয়েই যায়। তাই বয়স কিংবা মৃত্যু এসব নিয়ে কোনো উদ্‌বেগ তার মধ্যে কাজ করছে না।

দেখুন, উদ্‌বেগ সর্বদা বোঝা যায় না – ডাক্তার বলেন। আপনার মনে হচ্ছে বটে আপনার কোনো টেনশন নেই। নানা কারণে আপনি সেটা বুঝতে পারছেন না। আসলে এই বয়সে সকলেরই টেনশন থাকে। আচ্ছা, আপনি কি মশাই অনেক টাকা-পয়সা সঞ্চয় করে ফেলেছেন? কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না? তাহলে এক কাজ করতে পারেন। যারা সেবামূলক কাজকর্ম করে – এরকম নির্ভরযোগ্য একটা সংস্থা দেখে ওদের কিছু দান করে দিন। দেখবেন মনে মনে বেশ তৃপ্তি অনুভব করছেন। আমি নিশ্চিত আপনার টেনশন অনেকটা কমবে। ডাক্তার হয়েও বলছি, দেখুন মায়া বাড়াবেন না। বরং এভাবে ভাবুন, আপনি তো কিছু নিয়ে পৃথিবীতে আসেননি, কিছু নিয়েও যাবেন না। তাহলে আপনি এমন কী হারাবেন, যার জন্য আপনার টেনশন হবে!

বুদ্ধ মনে মনে ভাবে, আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল তো! বার্ধক্যের টেনশনের কথা জানাতে সে ডাক্তারের কাছে আসেনি, এসেছে কেন মনে হয় প্রতিদিন কিছু না কিছু হারাচ্ছেন তার কারণ জানতে। অথচ ডাক্তার ওই একই বিষয়ের উপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন। প্রচণ্ড একটা বিরক্তি ও বিভ্রান্তি নিয়ে বুদ্ধ ডাক্তারখানা থেকে বেরিয়ে আসে। মনে মনে বলে, ডাক্তার না ছাই। এদের বিজ্ঞান পড়ানো বৃথা। ব্যাটা নিশ্চয়ই কোনো সেবাশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। না হলে অমন দার্শনিক কথা বলবেন কেন রোগীর সঙ্গে? রামকৃষ্ণ মিশন এমনি কি আর কোটি কোটি টাকা পায়! আজকাল বিজ্ঞানের লোকেরা দেখছি বেশি বেশি ভাববাদী কথা বলে। ধুর! যেদেশে বিজ্ঞানে ঈশ্বরকণা, গোরুর দুধে সোনা, গণেশের প্ল্যাস্টিক সার্জারি নিয়ে লোকে মাতামাতি করে সেদেশে আর কী হবে!

।। দুই ।।

সকাল সকাল ছোটো নাতির ফোন। গত দশ বারো দিন ফোনালাপ একপ্রকার বন্ধ ছিল। এ'কদিনে যাওয়ার মতো কোনো সভা বা অনুষ্ঠানও ছিল না। তাই মনটা একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছিল। নাতির ফোনটা যেন মরুদ্যানে ওয়েসিস। মেয়ে বলে ওদেশের স্কুল, কলেজে পরীক্ষা নাকি খুব টাফ। ছেলের পরীক্ষাসূচি হাতে পাওয়ার পর মেয়েই ফোনে জানিয়ে দিয়েছিল, ছোটোর সামনে পরীক্ষা বাবা। তাই এ ক'দিন আর ওকে ফোন করো না। সেমিস্টার ক্লিয়ার করতে না পারলে প্রিন্সিপাল ওদের বাবাকে স্কুলে ডেকে পাঠাবেন। অগত্যা ফোন করা হয়নি।

বিদেশে থাকে, মেয়ে বুদ্ধর সঙ্গে বাংলাতে কথা বললেও নাতিরা কেউ প্রায় বাংলা জানে না। দিনরাত বাবা মায়ের মুখে ইংরাজি শুনতে শুনতে ইংরেজিটাই ওদের ব্যবহারিক ভাষা হয়ে উঠেছে। বুদ্ধও ইদানীং ওদের সঙ্গে ইংরাজিতেই কথা বলে। কিন্তু ইংরেজিতে এতকাল অধ্যাপনা করে এলেও ইদানীং কখনো কখনো এক একটা বাংলা শব্দের সঠিক ইংরাজি প্রতিশব্দটি ঠিক তৎক্ষণাৎ খুঁজে পায় না। তখন কথা বলতে বলতে চুপ করে যায়। থতমত খায়। অথবা অন্ধের মতো শব্দ হাতড়াতে থাকে। এই বিস্মৃতির কথা ভেবে বুদ্ধ মনে মনে ভীষণ লজ্জিত হয়। নাতিরা অবশ্য তাতে কিছু মনে করে না। শুধু ইংরাজিটা মনে করিয়ে দেয়। মেয়ের কাছে শুনেছে, ওদেশে বয়স্ক মানুষদের নিয়ে উপহাস অশ্লীলতার থেকে কম অপরাধ নয়।

বুদ্ধ প্রায়শই ভেবে এসেছে, নাতিরা বিদেশে জন্মালেও জামাই তো আর বিদেশি নয়! বর্ধমানের সাত পুরুষের বাঙালির ছেলে। চাকরি সূত্রে প্রবাসে। তাই নাতিরাও বাঙালির ছেলে, প্রবাসী বাঙালি। জন্ম বা নাগরিকত্ব কোনোটাতেই জাতিসত্তা মুছে যেতে পারে না। আর বাঙালি সে যে বাঙালিই হোক, বাংলা জানবে না তা হয় না! দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়লেও সব জাতি কিছু না হোক মাতৃভাষাটা অবশ্যই শিখে নেয়। ওদেরকেও বাংলাটা দ্রুত শিখিয়ে দিতে হবে তাকে। তাছাড়া দেশে বিদেশে পৃথিবীর কোনো বাঙালিই বাঙালির কালচারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারেনি। কিছু না হোক দুর্গাপুজো, ভাইফোঁটা সারা বিশ্বের বাঙালি পালন করে। কিন্তু ভাবলে কী হবে ওদের বাংলা শেখাব শেখাব করেও বুদ্ধর আর শেখানো হয় না। কথাটা সকালে মনে পড়ে তো বিকেলে ভুলে যায়। ইদানীং তো বেমালুম ভুলে বসে আছে। একবারও মনে হয়নি ওদেরকে বাংলা শেখানোটা তার কর্তব্য ছিল।

সে যাইহোক, বুদ্ধর বিস্মৃতি ইদানীং বুদ্ধকে হীনমন্যতায় ভোগায়। মনে হয় এ বিস্মৃতি কোনো স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। অধ্যাপক হিসাবে তার এ ধরনের বিস্মৃতি শুধু তারই ক্ষতি করছে না, সমগ্র বাঙালি জাতিকে, আগামী প্রজন্মকেও দুর্বল করছে। তার উপর আজ ছোটো নাতির ফোনটা সত্যিই বুদ্ধর কাছে দারুণ একটা শকিং। ভুলে যাওয়ার এতটা মাসুল দিতে হবে সে ভাবতেও পারেনি। কী আশ্চর্য! বিদেশে বসে নাতি তাকে ফোনে জানাচ্ছে, পরশু ইন্টারন্যাশানাল মাদারটাং ডে, টুয়েন্টি ওয়ান ফেব্রুয়ারি। তাই ওদের স্কুলে ওকে একটা স্পিচ দিতে হবে। বুদ্ধকে ইংরাজিতে লিখে দিতে হবে তার একটা খসড়া। ফোনটা পাওয়ার পর থেকে বুদ্ধ কেবলই আক্ষেপ করে, ইশ্‌! এ কথা তো তারই নাতিকে জানানোর কোথা ছিল।

শোনা মাত্র লজ্জায় মাথা কাটা যায় বুদ্ধর। মনে পড়ে যায় বাহান্নর ইতিহাসটা এখনও শোনান হয়নি ওদেরকে। অথচ প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে দুটো থেকে তিনটে বক্তৃতার আমন্ত্রণ আসে শুধু ভাষা আন্দোলন বিষয়ে কিছু বলবার জন্য। এমনকী পরশু বিকেলেও একটি লাইব্রেরির অনুষ্ঠানে তাকে ভাষা দিবস নিয়ে বক্তৃতার আমন্ত্রণ করে রেখেছে। বিগত পাঁচ বছরে কম করে হলেও অন্তত বিশ-ত্রিশ বার তার মনে হয়েছে, ওদের শোনাবে কীভাবে ভাষা আন্দোলন থেকে একটা নতুন দেশের জন্ম হয়েছে। সে বড়ো গর্বের, সে বড়ো বেদনার আখ্যান। দেশের শিশুদের আগে ওদেরকেই তো শোনানো উচিত ছিল তার। তবে তো বাঙালি হিসাবে ওরা বিদেশেও গর্ব করতে শিখবে!

মনে মনে ভাবে বাংলাদেশে বার বার রাজনৈতিক পালাবদল হলেও ভাষা আন্দোলন নিয়ে উন্মাদনা এখনও কিছু কমেনি। সারা বছর একাধিক সংগঠন শুধু ভাষা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে। আর এই বাংলায় প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি এলে তবেই মনে পড়ে। তাও ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি দিয়েছে বলেই একুশের কিছুটা কদর বেড়েছে। অথচ বিদেশে থাকলেও বিশ্বের সমস্ত বাঙালিদেরই জানা দরকার মাতৃভাষার জন্য আত্মবলিদান শুধু বাঙালিরাই বারবার দিয়েছে। কিন্তু তাদেরকে শোনাবেটা কে ? শোনানোর দায়িত্ব তো নিতে হবে বুদ্ধদের মতো শিক্ষিত বাঙালিদের। কিন্তু যে সচেতনতা শিক্ষিত বাঙালির থাকা উচিত ছিল তা সে কবেই হারিয়ে ফেলেছে। ভুলতে ভুলতে বুদ্ধর আজ এমন দশা হলো যে, নাতির কাছেই তাকে শুনতে হলো পরশু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আসলে হারিয়ে যাচ্ছে, বুদ্ধর বুঝতে বাকি থাকে না একের পর এক ভাবনা, কর্তব্য অবলীলায় হারিয়ে যাচ্ছে। এ রোগ কি শুধুই তার, নাকি তার মতো আরও অনেক বুদ্ধের ? বোধহয় সমস্ত বাঙালির।

।। তিন ।।

বুদ্ধর বিস্মৃতি দিনদিন বাড়ে বৈ কমে না। আগে প্রতিদিন সকালে উঠে মনে হতো, এখন সকাল, দুপুর, সন্ধে এমনকী মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়। অস্থিরতায় বিছানায় উঠে বসে, অন্ধকারে হাতড়ায় যদি কিছু হাতে ঠেকে। মনে হয় এই মাত্র হাতের মধ্যে ছিল, কিন্তু কি ছিল মনে করতে পারে না। পাগলের মতো মাথার অবশিষ্ট কয়েকটা চুল ধরে টানাটানি করে, চেষ্টা করে মনে করার।

অবশেষে উত্তেজনা প্রশমিত হলে অনুভব করে এই শীতের মধ্যেও কপাল, পিঠ ঘামে ভিজে গেছে। আলো জ্বালায়। চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে পুনরায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে ঘরের যেখানে যা ছিল সেগুলো চোখ বুলিয়ে নেয়। না। কিছুই হারায়নি। স্ত্রী বিদায় নেওয়ার পর টেবিলে একটা ছবি ফটোস্ট্যান্ডে সাজানো থাকে। ত্রিশ বছরের পূর্ণ যুবতী সকরুণ দৃষ্টিতে তাকায় বুদ্ধর দিকে। লজ্জায় রাঙা হয়ে পুনরায় ঘুমাতে যায়, ঘুম আসে চোখে।

স্বপ্ন দেখে, বন্যার স্রোতে ভাসছে এক নদী। খুব পরিচিত নদী, এপারে পরিচিত জনপদ ওপারে অরণ্য। সবই চেনা-জানা তবু কিছুতেই নাম মনে পড়ছে না। স্রোতের ধাক্কায় ভাঙছে পাড়, বুক ফুলিয়ে জল ঢুকছে শস্য খেতে। মাঠ ডুবছে, রাস্তা ডুবছে, ঘর ডুবছে, গ্রাম ডুবছে তলিয়ে যাচ্ছে সবই। মানুষগুলো হাহাকার করছে সর্বস্ব হারিয়ে। একটি বালক ছুটছিল মায়ের হাত ধরে। পিছনে তাড়া করছে স্রোত, জল বাড়ছে, জল বাড়ছে। হঠাৎ একটা প্রকাণ্ড স্রোত এক ধাক্কায় ছিনিয়ে নিল ছেলেটিকে। ছেলেটি ভেসে যাচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে, কাঁটা জঙ্গলে ছিঁড়ে যাচ্ছে ছেলেটির সর্বাঙ্গ। কোথা ভেসে চলেছে ভাবতে ভাবতে ঘুম ভেঙে যায়। ইদানীং এমন হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন বুদ্ধ প্রায়ই দেখে।

দুঃশ্চিন্তায় বুদ্ধর অনিদ্রা রোগের প্রকোপ দিন দিন বেড়ে চলেছে। কিছুতেই ঘুম আসে না চোখে। ঘুম এলেও অনেকটা জেগে ঘুমানোর মতো অবস্থা। চেতন-অচেতনের মাঝে নিজেকে অবচেতন লোকের বাসিন্দা বলে মনে হয়। দিবাস্বপ্নের মতো মনে হয় সমগ্র জীবনকে। সচেতন মন যখনই সক্রিয় হতে চায় কিছু করার জন্য তখনই অবচেতন মনের প্রভাবে তা হারিয়ে যায়। আগামী জীবনের সমস্ত সংকল্প থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বুদ্ধ।