স্মরণে-শ্রদ্ধায়

শরৎচন্দ্র ও তৎকালীন বাংলার কৃষক সমাজ (সার্ধশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি)



সুব্রত চট্টোপাধ্যায়


অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০–১৮৮৬) ১৮৫০ সালে 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন – 'পল্লীগ্রামস্থ প্রজাদের দুরবস্থা বর্ণন'। এই প্রবন্ধে উনিশ শতকের গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষ বিশেষত কৃষকদের চরম অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক শোষণ এবং তাদের মর্মন্তুদ জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। জমিদারি শোষণের তিনি চিত্র: "তিনি (জমিদার) ছলে বলে কৌশলে তাহারদিগের যথাসর্বস্ব হরণে একাগ্রচিত্তে প্রতিজ্ঞারূঢ় থাকেন। তাহাদের দারিদ্র্য দশা, শীর্ণ শরীর, ম্লান বদন, অতি মলিন চীর বসন, কিছুতেই তাঁহার পাষাণময় হৃদয় আর্দ্র করিতে পারে না, কিছুতেই তাঁহার কঠোর নেত্রের বারিবিন্দু বিনির্গত করিতে সমর্থ হয় না। তিনি ন্যায্য রাজস্ব-ভিন্ন ভাটা, যথাকালে অনাদায়ি রাজস্বের নিয়মাতিরিক্ত বৃদ্ধি, বাটার বৃদ্ধি, বৃদ্ধির বৃদ্ধি, আগমনে, পার্বণী, হিসাবানা প্রভৃতি অশেষ প্রকার উপলক্ষ করিয়া ক্রমাগতই প্রজা নিপীড়ন করিতে থাকেন।"

এর ২২ বছর পর ১৮৭২ সালে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র লেখেন 'বঙ্গদেশের কৃষক' প্রবন্ধ। সেই প্রবন্ধে প্রথমেই তিনি একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেনঃ "আজি কালি বড় গোল শুনা যায় যে, আমাদের দেশের বড় শ্রীবৃদ্ধি হইতেছে।... এই হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত্তর কি উপকার হইয়াছে?" সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেন: "জীবের শত্রু জীব; মনুষ্যের শত্রু মনুষ্য; বাঙ্গালী কৃষকের শত্রু বাঙ্গালী ভূস্বামী।" এই প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র জমিদারি শোষণের সঙ্গে যুক্ত করে দেন মহাজনি-ব্যবস্থাকেও। মুমূর্ষু গ্রাম-বাংলার চিরন্তন দুই জুটি – মহাজনি ঋণ ও জমিদারি শোষণ।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করে। পুরোনো জমিদারিগুলি নিলামে কিনে নিয়ে চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বাৎসরিক রাজস্বের ভিত্তিতে নতুন জমিদারগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আশীর্বাদপুষ্ট ধনী ব্যবসায়ী। তাঁদের বসবাস ছিল কলকাতা শহরে। এখান থেকেই একটা শব্দের সৃষ্টি হয় 'Absentee Landlord'। জমিদাররা তাদের জমিদারি নির্দিষ্ট খাজনার ভিত্তিতে 'পত্তনি' দিতেন, পত্তনিদার থেকে জমিদারি যেত দর-পত্তনিদারের হাতে; এইভাবে জমিদার ও কৃষকের মাঝখানে বহুবিধ মধ্যস্বত্বভোগীর আবির্ভাব ঘটে; এর ফলে চিরাচরিত কৃষিব্যবস্থা ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। ইংল্যান্ডে বসে কার্ল মার্কস ১৮৫৩ সালে এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে: "ভূতপূর্ব বংশানুক্রমিক উচ্ছন্ন ভূমি-মালিকগণের ওপর অপ্রশমিত ও অসংযত লুণ্ঠন চালানো সত্ত্বেও আদি জমিদারশ্রেণি কোম্পানির চাপে অচিরেই অন্তর্হিত হয় ও তার জায়গা নেয় ব্যবসায়ী দাঁওবাজেরা, সরকারের খাস তত্ত্বাবধানে দেওয়া মহাল ছাড়া বাংলার সমস্ত জমিই এখন এদের হাতে। এই দাঁওবাজেরা পত্তনি নামক বিভিন্ন প্রকারের জমিদারি প্রজাবিলির প্রবর্তন করেছে। ব্রিটিশ সরকারের প্রসঙ্গে নিজেদের মধ্যস্বত্বভোগী-অবস্থায় সন্তুষ্ট না হয়ে তারাও আবার পত্তনিদার নামক 'বংশানুক্রমিক' মধ্যস্বত্বভোগীর একটা শ্রেণি সৃষ্টি করেছে, এরা আবার তৈরি করেছে দর-পত্তনিদার ইত্যাদি – ফলে গড়ে উঠেছে মধ্যস্বত্বভোগীদের একটা বিস্তৃত বহু-ধাপ ব্যবস্থা, যা তার গোটা ভার চাপাচ্ছে হতভাগ্য কৃষকের ওপর।" [কার্ল মার্কস: ঔপনিবেশিকতা প্রসঙ্গে, পৃঃ ৮৩]

ব্রিটিশ সরকার ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে অষ্টম আইন জারি করে এই মধ্যস্বত্বভোগীদের আইনগত স্বীকৃতি দেয়। শরৎচন্দ্রের জন্ম-বছরে (১৮৭৬–৭৭) একটা অসম্পূর্ণ হিসাবে দেখা যায় দেড় লক্ষ জমিদারের নিচে নয় লক্ষ মধ্যস্বত্ব সৃষ্টি হয়েছে। [আবদুল্লাহ রসুল, কৃষকসভার ইতিহাস] চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলায় দুর্ভিক্ষ চিরস্থায়ী আসন লাভ করে। ১৮০২-৫৪ – এই ৫৩ বছরে দুর্ভিক্ষ হয়েছে ১৩ বার, মৃত্যু ৫০ লক্ষ। আর ১৮৬০-৭৯ – এই ২০ বছরে দুর্ভিক্ষ হয়েছে ১৬ বার, মৃত্যু হয়েছে ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের। [S. K. Chatterjee: The Starving Millions, p. 12]

শরৎচন্দ্র(১৮৭৬-১৯৩৮)-এর গল্প-উপন্যাসে এই জরাগ্রস্ত পল্লিবাংলার জীবন্ত চিত্র ফুটে উঠেছে। 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসে নিঃস্ব-রিক্ত গ্রাম-বাংলার ছবি: "দিঘি নেই, পুকুর নেই, কুয়ো নেই, কোথাও একফোঁটা খাবার জল নেই⋯। ম্যালেরিয়া কলেরা হর-রকমের ব্যাধি-পীড়ায় লোক উজার হয়ে গেল কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা।" শ্রীকান্ত বলে: " বাণিজ্যের নাম দিয়া ধনির ধনভাণ্ডার বিপুল হইতে বিপুলতর করিবার এই অবিরাম চেষ্টায় দুর্ব্বলের সুখ গেল, শান্তি গেল, অন্ন গেল, ধর্ম্ম গেল...।" এছাড়া 'পল্লীসমাজ' এবং 'পণ্ডিতমশাই' উপন্যাসেও গ্রামীণ অর্থনীতির ভাঙন এবং গ্রামের মানুষের ভয়ংকর দারিদ্র্যের চিত্র পাওয়া যায়। একের পর এক মন্বন্তরের আসল কারণ যে পরাধীনতা ও নির্বিচার লুণ্ঠন 'পথের দাবী' উপন্যাসের সব্যসাচী সে কথা ব্যক্ত করেছে। 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসে গঙ্গামাটি গ্রামের অর্থনৈতিকভাবে পীড়িত নিম্নবর্গের মানুষের অসহায় চিত্র: "গ্রামখানি ছোট এবং আমরা যাদের ছোট জাত বলি তাহাদেরই। ...বেচারীরা ঘরগুলিকে প্রাণপণে ছোট করিতে ত্রুটি করে নাই, তথাপি এত ক্ষুদ্র গৃহও যথেষ্ট খড় দিয়া ছাইবার মতো খড় এই সোনার বাংলাদেশে তাহাদের ভাগ্যে জুটে নাই। এক ছটাক জমিজায়গা প্রায় কাহারও নাই, কেবলমাত্র চাঙারি চুবড়ি হাতে বুনিয়া এবং জলের দলে গ্রামান্তরে সৎ গৃহস্তের দ্বারে বিক্রয় করিয়া কি করিয়া যে ইহাদের দিনপাত হয় আমি তো ভাবিয়া পাইলাম না।"

শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাস জুড়ে অনুপস্থিত জমিদার (Absentee Landlord) এবং তাদের কার্যকলাপ চিত্রিত হয়েছে। 'দত্তা' উপন্যাসের বনমালী, 'অনুরাধা'র হরিহর ঘোষাল, 'শেষের পরিচয়'-এর ব্রজবাবু – সকলেই কলকাতাবাসী। 'বড়দিদি'র ব্রজরাজ লাহিড়ীরও বসবাস কলকাতায়। 'দেনাপাওনা'র জমিদার জীবানন্দ রায়ের বসবাস কলকাতায়। এমনকি 'অভাগীর স্বর্গ ' গল্পেও দেখা যায়, "জমিদার স্থানীয় লোক নহেন; গ্রামে তাঁহার একটা কাছারি আছে, গোমস্তা অধর রায় তাহার কর্ত্তা।"

এবার আসি তৎকালীন কৃষক প্রসঙ্গে। কী অবস্থা ছিল তাদের? লেখকের দৃষ্টিতে দেখি "একদিন কৃষিপ্রধান ভারতের পল্লীই ছিল প্রাণ, পল্লী ছিল তার অস্থি-মজ্জা-শোণিত। আজ সে ধ্বংসোন্মুখ। ভদ্র জাতি তাদের ত্যাগ করে শহরে এসেছে, সেখান থেকে অহর্নিশি শাসন করে এবং শোষণ করে। এ ছাড়া আর কোন সম্বন্ধ-বন্ধন তারা রাখে নি। চিরদিন যারা এদের মুখের অন্ন এবং পরণের বস্ত্র জুগিয়ে দেয়, সেই কৃষককুল আজ নিরন্ন, নিরক্ষর এবং নিরুপায় হয়ে মৃত্যুপথে দ্রুতবেগে চলেচে।" বেদনার্ত হৃদয়ে তিনি লিখেছেন: 'আমি কোনমতেই ভুলিতে পারি না দেশের নব্বুই জন নর-নারীই ঐ পল্লীগ্রামেরই মানুষ।'

শরৎচন্দ্র গ্রাম-বাংলাকে গভীরভাবে জানতেন, আর জানতেন জমিদারি শোষণে ক্লিষ্ট দারিদ্র্যের চেহারা ঠিক কেমন হতে পারে। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য তাঁর নিত্যসঙ্গী। স্মৃতিচারণায় তিনি জানিয়েছেন: "আমার শৈশব ও যৌবন ঘোর দারিদ্র্যের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। অর্থের অভাবেই আমার শিক্ষালাভের সৌভাগ্য ঘটেনি। পিতার নিকট হতে অস্থির স্বভাব ও গভীর সাহিত্যানুরাগ ব্যতীত আমি উত্তরাধিকার সূত্রে আর কিছুই পাই নি। পিতৃপ্রদত্ত প্রথম গুণটি আমাকে ঘরছাড়া করেছিল,...। আর পিতার দ্বিতীয় গুণের ফলে জীবন ভ'রে আমি কেবল স্বপ্ন দেখেই গেলাম।"

জমিদারি শোষণ-বঞ্চনার বাস্তব কাহিনি বিবৃত হয়েছে 'পল্লীসমাজ' উপন্যাসে। দুদিনের বৃষ্টিতে চাষিদের একশো বিঘা চাষের জমি জলে ডুবে গেছে। শরৎচন্দ্র লিখেছেন: "ইহার পূর্ব্ব-ধারে সরকারী প্রকাণ্ড বাঁধ, পশ্চিম ও উত্তর-ধারে উচ্চ গ্রাম, শুধু দক্ষিণ-ধারের বাঁধটা ঘোষাল ও মুখুয্যেদের। এই দিক্ দিয়া জল নিকাশ করা যায় বটে, কিন্তু বাঁধের গায়ে একটা জলার মত আছে। বৎসরে দু'শ টাকার মাছ বিক্রি হয় বলিয়া জমিদার বেণীবাবু তাহা কড়া পাহারায় আটকাইয়া রাখিয়াছেন। চাষারা আজ সকাল হইতে তাঁহাদের কাছে হত্যা দিয়া পড়িয়া থাকিয়া এইমাত্র কাঁদিতে কাঁদিতে উঠিয়া এখানে আসিয়াছে।" রমেশ বেণী ঘোষাল ও রমাকে অনুরোধ করে দক্ষিণ দিকের বাঁধটা যেন কেটে দেওয়া হয়। কিন্তু 'সমস্ত গাঁয়ের ধান হেজে' গেলেও দু-তিনশো টাকার মাছের জন্য তারা বাঁধ কাটতে রাজি নয়। রমেশের প্রশ্ন, ফসল নষ্ট হলে চাষিরা 'সারা বছর খাবে কি?' বেণীমাধব এর উত্তরে নির্দ্বিধায় বলে, "খাবে কি? দেখবে, ব্যাটার যে যার জমি বন্ধক রেখে আমাদের কাছেই টাকা ধার করতে ছুটে আসবে।"

জমিদারি অত্যাচারের আরও ভয়ংকর চিত্র ফুটে উঠেছে 'দেনাপাওনা' উপন্যাসে। জমিদার রামানন্দ চণ্ডীগড় গ্রামে এসেছেন দিন-আষ্টেকের জন্য। কিন্তু তার ফল: "মাত্র পাঁচদিন চণ্ডীগড়ে পদার্পণ করিয়াছেন, এইটুকু সময়ের অনাচার ও অত্যাচারে সমস্ত গ্রামখানা যেন জ্বলিয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে। নজরের টাকাও আদায় হইতেছে, কিন্তু সে যে কি করিয়া হইতেছে তাহা জমিদার-সরকারে চাকরি না করিয়া বুঝিবার চেষ্টা করাও পাগলামি।"

'মহেশ' গল্পের আখ্যান যুগপৎ ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র এবং জমিদার-তন্ত্রের দাপট ও এক অসহায় প্রান্তিক চাষির কৃষক সত্তা ছেড়ে মজুর সত্তায় অবনমনের আখ্যান। গল্পের শেষ অংশে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে গফুরের মর্মন্তুদ হাহাকার আমাদের বিমূঢ় করে দেয়। সে নালিশ জানায় আল্লার কাছে: "আল্লা! আমাকে যত খুশি সাজা দিয়ো, কিন্তু মহেশ আমার তেষ্টা নিয়ে মরেচে। তার চ'রে খাবার এতটুকু জমি কেউ রাখে নি। যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি, তার কসুর তুমি যেন কখনো মাপ ক'রো না।" 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পেও সর্বস্বান্ত এক অন্ত্যজ নারীর স্বর্গ আকাঙ্ক্ষা ও তার পরিণতি চিত্রিত হয়েছে। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র, জাতপাতের বেড়াজালে আচ্ছন্ন গ্রামে অভাগীর স্বর্গযাত্রার ছবিটি বড়ো মর্মস্পর্শী ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন শরৎচন্দ্র: "নদীর চরে গর্ত খুঁড়িয়া অভাগীকে শোয়ান হইল। রাখালের মা কাঙালীর হাতে একটা খড়ের আঁটি জ্বালিয়া দিয়া তাহারই হাত ধরিয়া মায়ের মুখে স্পর্শ করাইয়া ফেলিয়া দিল। তার পরে সকলে মিলিয়া মাটি চাপা দিয়া কাঙালীর মায়ের শেষ চিহ্ন বিলুপ্ত করিয়া দিল।" গ্রাম বাংলায় জমিদারতন্ত্রের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ছিল মহাজনি কারবার। শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যে নানান প্রসঙ্গে এই মহাজনি ব্যবস্থার বিপজ্জনক দিকটি ফুটে উঠেছে। 'দেনাপাওনা' উপন্যাসে এই ধরনেরই একটি চরিত্র জনার্দন রায়। জনার্দন 'শুধু ধনী নয়, গুণী। চিতা, খত, তমসুক, দলিল, যথাইচ্ছা ইনি প্রস্তুত করে দিতে পারেন – নকল নয়, অনুকরণ নয়, একেবারে অভিনব, অপূর্ব্ব, যাকে বলে সৃষ্টি। মহাপুরুষ ব্যক্তি।' জনার্দনের কৌশলে এককালের গৃহস্থ কৃষকের অবস্থা, শরৎচন্দ্রের ভাষায়: "এখন অধিকাংশ ভূমিহীন – পরের ক্ষেত্রে মজুরী করিয়া বহু দুঃখে দিনপাত করে। সমস্ত জমিজমা হয় জনার্দন, না হয় জমিদারের কর্মচারি স্বনামে বেনামে গিলিয়া খাইয়াছে"। 'একাদশী বৈরাগী' গল্পে লেখক লিখেছেন: "একাদশীর পেশা তেজারতি। বয়স ষাটের উপর গিয়াছে। সমস্ত দেহ যেমন শীর্ণ, তেমনি শুষ্ক। কণ্ঠভরা তুলসীর মালা।... ইক্ষু যেমন নিজের রস কলের পেষণে বাহির করিয়া দিয়া, অবশেষে নিজেই ইন্ধন হইয়া তাহাকে জ্বালাইয়া শুষ্ক করে, এ ব্যক্তি যেন তেমনি মানুষকে পুড়াইয়া শুষ্ক করিবার জন্য নিজের সমস্ত মনুষ্যত্বকে নিঙড়াইয়া বিসর্জন দিয়া মহাজন হইয়া বসিয়া আছে।" 'শ্রীকান্ত' (৪র্থ) উপন্যাসের কালিদাস মুখুয্যে 'মহাজন – এবং দুর্দান্ত মহাজন'। 'পল্লীসমাজ'র বেণীমাধব ঘোষাল একইসঙ্গে জমিদার ও মহাজন। 'দর্পচূর্ণ'-র শম্ভুবাবু মহাজন। 'অনুরোধ'-র ত্রিলোচন গাঙ্গুলীও মহাজন।

শরৎচন্দ্র তাঁর সমকালীন সমাজ বাস্তবতাকে নিজস্ব সৃষ্টিতে নির্মমভাবে প্রতিফলিত করেছেন। তাঁর উপন্যাস ও ছোটো গল্পের আকাশ জুড়ে রয়েছে উনিশ শতকের শেষার্ধ ও বিংশ শতকের প্রথমার্ধের গ্রাম বাংলার কৃষক জীবন যন্ত্রণা। কিন্তু সেই জীবন যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ কী হবে সে সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট কোনো ধারণার পরিচয় পাওয়া যায় না। তিনি প্রতিকারের পথ সন্ধান করেন নি। আসলে সেটা তাঁর লক্ষ্যও ছিল না। তিনি সামন্ততন্ত্রের নির্মোহ বিশ্লেষণ করেছেন, কিন্তু সব সমস্যার মূলে যে সামন্ততন্ত্র, তা তিনি উপলব্ধি করতে পারেন নি।

পরিচিতি: কো-অর্ডিনেটর, স্নাতকোত্তর বাংলা বিভাগ, নবগ্রাম হীরালাল পাল কলেজ, কোন্নগর। প্রাবন্ধিক। রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘ। কোন্নগর, হুগলি।