স্মরণে-শ্রদ্ধায়

'তুমি আমাকে বলো উত্তমকুমার' (শতবর্ষে মহানায়ক উত্তমকুমার)



সিদ্ধার্থ সেন


এই লেখার শিরোনামে যে পঙ্‌ক্তিটি ব্যবহৃত হয়েছে সেটি জানে না এমন বাঙালি বোধহয় হাতে গোনা যাবে। প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক দীনেন গুপ্ত পরিচালিত জনপ্রিয় কমেডি ছায়াছবি 'বসন্ত বিলাপ' (১৯৭৩)–এ সিধু (চিন্ময় রায়)-এর শিবানী বসুর সঙ্গে একান্তে প্রেমের মুহূর্তের সংলাপ যা দেখে শুনে দর্শক হেসে গড়িয়ে পড়ে! লিকপিকে চেহারার চিন্ময় শুধু নয়, গত শতকের আশির দশকের শেষ পর্যন্ত মনে হয় প্রত্যেক বাঙালি যুবকের মনের আড়ালে এই বাসনা লুকিয়ে ছিল। কিংবা পরিচালক তপন সিংহ পরিচালিত 'উপহার' (১৯৫৫) ছবিতে এক অধ্যাপক চরিত্রের অভিনেতা উত্তমকুমার পরীক্ষার খাতা দেখবার মুহূর্তে খারাপ খাতার প্রথম পরীক্ষক হিসেবে যখন বিরক্তিতে ভরপুর তখন বাড়ির পরিচারকের প্রশ্নের উত্তরে তাঁরই মুখে সংলাপ শোনা যায়,"পরীক্ষার খাতায় যা তা লিখবে, এদের কী নম্বর দিই বল তো?" তার উত্তরে ভৃত্যের সংলাপ শোনা যায় "আজকালকার ছেলেপুলেদের কী আর লেখাপড়ায় মন আছে? দেখো গিয়ে, সিনেমা-থিয়েটারে দেখে বেড়াচ্ছে সব।" আর তারপরেই শোনা যায় সেই সংলাপ: "যা বলেছিস, কোথায় কোন্ উত্তমকুমার, কীরকম চুল ছাঁটল, কোন্ জামা পরল, কোন্ কাপড় পরল, সেই নিয়ে মাথা ফাটাফাটি সবার।" বোঝাই যাচ্ছে এখানে দ্বিতীয় সংলাপটির অনেক পরে লেখা প্রথম সংলাপটির সময় উত্তমকুমার জনপ্রিয়তার শিখর ছুঁয়ে ফেলেছেন। কিন্তু জনপ্রিয়তার শীর্ষে তাঁর উত্থানের কাহিনিটি খুব সহজ নয়, তার নেপথ্যে আছে একটি মানুষের হার না মানা এক দীর্ঘ লড়াই। টানা পাঁচ দশক ধরে প্রায় ২১৩টি ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি 'দৃষ্টিদান' (১৯৪৮) দর্শকসাধারণ গ্রহণ করেননি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, 'মায়াডোর' (১৯৪৭) ছিল তাঁর প্রথম ছবি। এটি ছিল একটি হিন্দি ছবি। এই ছবিতে তিনি একটি ছোট্ট অতিরিক্ত অভিনেতা (এক্সট্রা) হিসেবে ছিলেন। তবে ছবিটি মুক্তি পায়নি। প্রথম অভিনয়ের সময় তাঁর নাম ছিল অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। তারপর 'কামনা' (১৯৪৯), 'মর্যাদা' (১৯৫০), 'ওরে যাত্রী', 'সহযাত্রী' ও 'নষ্টনীড়' (১৯৫১)-এও তথৈবচ। কেরিয়ারের শুরুতে একের পর এক ছবির অসাফল্য তাঁকে 'ফ্লপ মাস্টার জেনারেল' নামে ছবির জগতে চিহ্নিত করেছিল, সেই উত্তমকুমারই পরের পাঁচ দশকের মধ্যে টালিগঞ্জ সিনেমার অন্যতম নায়ক হয়ে উঠলেন! ১৯৫২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তিনটি ছবির মধ্যে 'বসু পরিবার' দর্শকের ভালো লেগেছিল, কিন্তু ১৯৫৩ সালের ৪টে ছবির পর হঠাৎই ১৯৫৪ সালে ১১টি, ১৯৫৫ সালে ১২টি, ১৯৫৬ সালে ১১টি এবং ১৯৫৭ সালে ১১টি ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠলেন তিনি! বাংলা কেন, ভূভারতে বোধহয় এমন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না! এর নেপথ্যে অভিনেতা হিসেবে যে কঠোর অনুশীলন, পরিশ্রম, ডিটারমিনেশন ছিল তাকে উপলব্ধি না করতে পারলে 'উত্তমকুমার' নামের শিল্পী মানুষটিকে বোঝা সম্ভব নয়! তাঁর হলিউডের ছবি দেখার অভ্যাস ছিল। তাঁর দেখা বিদেশি ছবি 'Random Harvest' সরযূবালা দেবীর অনুরোধে দেখে সঙ্গী পরিচালক অজয় কর ও সাহিত্যিক-চিত্রনাট্যকার নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের ভাবনায় তৈরি হলো 'হারানো সুর' (১৯৫৭) - যে ছবি দর্শকের কাছে আবার সমাদৃত হলো এবং বাংলা সিনেমায় তৈরি হওয়া চিরকালীন এক জনপ্রিয় 'হরগৌরী' জুটি সুচিত্রা-উত্তম যা প্রথম দেখা দিয়েছিল 'সাড়ে চুয়াত্তর' (১৯৫৩) ছবিতে যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তা আরও সুস্থিত হলো। এর আগে 'ওরা থাকে ওধারে' (১৯৫৩), 'সদানন্দের মেলা' (১৯৫৪), 'অন্নপূর্ণার মন্দির' (১৯৫৪), 'অগ্নিপরীক্ষা' (১৯৫৪), 'সাঁঝের প্রদীপ' (১৯৫৫), 'শাপমোচন' (১৯৫৫), 'সবার উপরে' (১৯৫৫), 'সাগরিকা' (১৯৫৬), 'একটি রাত' (১৯৫৬), 'ত্রিযামা' (১৯৫৬), 'শিল্পী' (১৯৫৬) সিনেমার পর 'হারানো সুর' সিনেমায় আবার দেখা গেল সুচিত্রা-উত্তম জুটি। এই সময় থেকে প্রায় এক দশক উত্তমের অভিনয় জীবনের সেরা দশক বলা যেতে পারে। তাঁর নিজের কলমে দেখা যায় এমন কথা: "সুচিত্রা-উত্তম জুটিতে খ্যাতি বাড়তে লাগল। খ্যাতির প্রথম সোপানে 'অগ্নিপরীক্ষা', - 'পথে হল দেরী', - 'সবার উপরে' - 'সাগরিকা' - 'শিল্পী' - 'চন্দ্রনাথ' - সাফল্যের পর সাফল্য। শেষে এমন অবস্থা দাঁড়াল যে, সুচিত্রা-উত্তম থাকলে আর কথা নেই - লোক যেন ভেঙে পড়ে। সবিস্ময়ে দেখলাম আমিই বাংলার একমেবাদ্বিতীয়ম!" উত্তম-সুচিত্রা জুটির ছবির সংখ্যা মাত্র ৩০ একথা মনে রাখা দরকার। উত্তম একদিক থেকে সামাজিক স্তরে এক ফেনোমেনন। তিনি পর্দার মতোই সব অংশের বাঙালি মহিলা-পুরুষের কাছে কারোর ছেলে, কারোর প্রেমিক, কারোর ভাই, কারোর বা বন্ধু। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধরনের চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন, সেইসব ছবির মধ্যে রয়েছে রোমান্টিক, কমেডি, ট্র্যাজেডি, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক,থ্রিলার প্রভৃতি। 'সখের চোর' - 'ছদ্মবেশী' - 'মৌচাক'-এর মতো ছবিতে কমেডিয়ান, 'সাগরিকা' - 'শিল্পী' - 'হারানো সুর'-এর মতো ছবিতে আত্মত্যাগী রোমান্টিক সব ধরনের চরিত্রে তিনি দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। আবার 'সবার উপরে' ছবিতে একজন আদর্শবাদী সমাজকর্মী, যিনি নানা সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। আবার 'জীবন তৃষ্ণা' ছবিতে আত্মসংকটে দীর্ণ এক মানুষ। বিভিন্ন সিনেমায় তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির যদি শ্রেণিবিন্যাস করা যায় তাহলে দেখা যায় কবি, গায়ক, পকেটমার, পুরোহিত, লেখক, ডাক্তার, বিপ্লবী, চাষি, সাংবাদিক, লম্পট, খুনি, মাতাল, ঠগ-জোচ্চর, উকিল, তাঁতি, বেদে, ভিলেন, বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি সব মানুষ। কখনো দ্বৈত চরিত্রেও তিনি সহজ স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন। কোনো নির্দিষ্ট চরিত্রাভিনয়ে আবদ্ধ না থেকে এক কেন্দ্রহীন সত্তার তিনি নির্মাণ করেছেন। ১৯৫৯-এর মধ্যে উত্তমকুমার নিজে এতখানি আত্মবিশ্বাসী যে, সেই সময় থেকে তিনি 'মরুতীর্থ হিংলাজ', 'বিচারক' (১৯৫৯), 'কুহক', 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন', 'শেষ অঙ্ক', 'নিশীথে' (১৯৬৩), 'লাল পাথর' (১৯৬৪), 'জীবন মৃত্যু' (১৯৬৭), 'দুটি মন' (১৯৭০), 'স্ত্রী', 'ছিন্নপত্র', 'আলো আমার আলো' (১৯৭২), 'রৌদ্রছায়া' (১৯৭৩), 'যদুবংশ', 'অমানুষ' (১৯৭৪), 'আমি সে ও সখা', 'অগ্নীশ্বর', 'বাঘবন্দী খেলা' (১৯৭৫)-র মতো ছবিতে নানা জটিল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর সব ছবিগুলি দেখলে একথা উপলব্ধ হয় যে, তাঁর অভিনয়জীবনে একাধিক ধারা পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েছে। এইসব ছবিতে অভিনয়ের কোথাও কোথাও তিনি সচেতনভাবে খানিক উচ্চকিত, আবার কোথাও ম্যানারিজমের আশ্রয় নিয়েছেন, কেননা তিনি তাঁর দর্শককুলের মনস্তত্ত্ব বুঝতে সচেষ্ট। আবার অভিনয়জীবনের শেষ পর্বে 'দুই পৃথিবী' (১৯৮০) সিনেমায় যে অভিনয় তা সম্পূর্ণ এক অন্য রীতির। জীবনে ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, যেই ছবিতে অভিনয় সেই ছবির, মেজাজ, কাঠামো অনুযায়ী অভিনয়ের ভিন্ন ভিন্ন ফর্ম আবিষ্কারের চেষ্টা করতে হবে, আর এই রূপান্তরের ক্ষমতা অর্জনে সফল হতে পেরেছেন বলেই তিনি অনন্য।

।। দুই ।।

সত্যজিৎ রায় তাঁর 'নায়ক' (১৯৬৬) ছবি তৈরির অনেক আগেই উত্তমকুমারকে 'ঘরে বাইরে'-র সন্দীপ চরিত্রে ভেবেছিলেন, বিমলা চরিত্রে সুচিত্রা সেন, নিখিলেশ বসন্ত চৌধুরী। কিন্তু সেই সময় উত্তমকুমার সত্যজিতের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। উত্তমকুমারের এক সময় স্তাবককুল ছিল যাদের পরামর্শে তিনি মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হয়েছেন। এই বিভ্রান্তি তিনি পরবর্তীকালে দূর করতে সক্ষম হয়েছেন এবং বাংলা সিনেমার দর্শকদের চমৎকার সব ছবি উপহার দিয়েছেন। উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর সত্যজিৎ রায় টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় আয়োজিত এক স্মরণসভায় বলেছিলেন: "উত্তমকুমারকে স্টার হবার জন্য যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে। আমি যখন প্রথম তাঁর ছবি দেখি তখন তিনি কিছুটা নাম করে ফেলেছেন। ... উত্তমকুমারকে আমার ভালো লেগেছিল কারণ তাঁর মধ্যে একটা সাবলীলতা ছিল, একটা ব্যক্তিত্ব ছিল। ... এর পর যখন 'নায়ক' করার কথা হলো, আমি লিখলাম উত্তমকুমারের কথা ভেবেই, কারণ সেখানে এমন একজন অভিনেতার কথা বলা হয়েছে যে স্টার হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে গেছে। ... এক্ষেত্রে উত্তম ছাড়া আর কাউকে এই ভূমিকায় জনগণ গ্রহণ করবে না ফলে উত্তমের কথাটা প্রথমে মনে হয় এবং তারপর তাঁর সঙ্গে কাজ করে আমার সেই উপলব্ধি হল।" দার্জিলিংয়ে থেকে সত্যজিৎ এই ছবির চিত্রনাট্য রচনা করেন এবং সেখানে উপস্থিত তপন সিংহ ও অরুন্ধতী দেবীকে সেটি শোনান। তপন সিংহ-এর লেখাতেও দেখতে পাওয়া যায়: "...দুজনেই গেলাম। ঝাড়া চার ঘণ্টা চিত্রনাট্য শুনলাম। চমকিত হওয়ার মতো অভিজ্ঞতা। বললেন, "এ ছবিতে উত্তমকে নেব ভাবছি, ঠিক হবে না?" বললাম, "উত্তম ছাড়া এ চরিত্র হয় না।..." এই সিনেমার কাহিনি অন্য ধারার। মৌলিক কাহিনি, দুটি স্বপ্ন দৃশ্য ও সাতটি ফ্ল্যাশব্যাকের উপর ভিত্তি করে চিত্রনাট্যের বিস্তার। কলকাতা-দিল্লি রেলপথে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার যাত্রায় কামরার ভিতরে অধিকাংশ ঘটনা ঘটে। অনেক বিদগ্ধ চলচ্চিত্র সমালোচক এই ছবির সঙ্গে বার্গম্যানের 'ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ'-এর কিছু কিছু সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করলেও অমিলও কম নয়। উত্তমকুমারের অভিনয় ক্ষমতা নিয়ে সত্যজিতের মনে কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিল না কেননা 'সাড়ে চুয়াত্তর', 'বসু পরিবার', 'চাঁপাডাঙার বৌ' ছবিগুলোতে উত্তমের অভিনয় তাঁর ভালো লেগেছিল। সত্যজিৎ আরও লিখেছেন, "...তাঁর যে অভিনয় ক্ষমতা আছে সেটা আমি বুঝি কিছু ছবির অভিনয় দেখে। যেখানে আমি বুঝতে পারছি যে পরিচালক খুব সুবিধের কাজ জানেন না বা তেমনভাবে দক্ষ নন সেইখানে কিন্তু উত্তমের কাজ দেখে আমাকে স্বীকার করতে হয়েছে, আমাকে বুঝতে হয়েছে, আমি বুঝতে পেরেছি যে এই ছেলেটির মধ্যে জিনিস আছে।" সত্যি কথা, যত সময় এগিয়েছে উত্তমকুমার তত নিজের অভিনয়কে শাণিত করেছেন। অভিনয় জীবনের যে বাঁকের মুখে এসে উত্তমকুমার 'নায়ক' ছবিতে অভিনয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই ছবির নায়ক অরিন্দম মুখার্জির চরিত্রে তিনি প্রাণ ঢেলে অভিনয় করেছিলেন। প্রথমত, ছবির পরিচালক সত্যজিৎ রায়, দ্বিতীয়ত, তখন তাঁর বয়স চল্লিশ। সেই কারণে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে দর্শকের কাছে সমাদর বিষয়ে প্রশ্ন জাগছে তাঁর মনে। প্রেমিক নায়কের ইমেজ ভেঙে চরিত্রাভিনয়ের দিকে যাওয়া দরকার এই ভাবনা তাঁকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছিল। কিন্তু তাঁর মন চাইলেও বাস্তবে তা সম্ভব হলো না ফিল্ম ইন্ড্রাস্টিকে বাঁচাতে অনেক সাধারণ ছবিতে তিনি অভিনয় করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের নানা সীমাবদ্ধতা তাঁকে বাধ্য করেছিল এই কাজ করতে। অভিনয়ের অনেক খুঁটিনাটি সম্পর্কে সত্যজিৎ রায়ের সান্নিধ্যে তিনি সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের পত্নী বিজয়া রায়ের 'আমাদের কথা' রচনায় পাওয়া যায়: "...যখন ওঁর সময় আসত ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবার, বেশিরভাগ সময় কোনো ভুল হত না। মানিক তো ওঁর কাজ দেখে মহা খুশি। মানিক ফ্লোরে ঢুকলে ওঁ দেখতে পেয়ে তক্ষুনি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে উঠে নমস্কার করত। ভারী সুন্দর সহবত-শিক্ষা। ...আমরা মন দিয়ে ওঁর কাজ দেখতাম। মানিকের কথা বলার ধরণ-ধারণ চলন, বলন এমনভাবে রপ্ত করেছিল, যা বেশির ভাগ সময়েই এক টেকেই শট ওকে হয়ে যেত।..." এই ছবিতে কাজ করতে এসে মেকআপ নিয়েও উত্তমকুমারের দীর্ঘদিনের ধারণা ভেঙে গিয়েছিল। বিনা মেকআপে যে ফিল্মে অভিনয় করা সম্ভব এই অসম্ভব তাঁর কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল। অভিনেতা হিসেবে এক দৃঢ় প্রত্যয়ের জন্ম হয়েছিল তাঁর মনে যার প্রমাণ বিভিন্ন চরিত্রে তাঁর অভিনয়। এই সত্য তিনি নিজে স্বীকার করেছেন সত্যজিৎ রায়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে 'ঘরোয়া' পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় 'আমার অভিনয়ের মুক্তি' এই শিরোনামে প্রকাশিত লেখায়। পেশাগত সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও একজন সফল চিত্রনায়কের নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতা উপলব্ধির কাহিনি 'নায়ক'। নায়কের জীবনের রিল ও রিয়েল লাইফের মধ্যের নানা সিকোয়েন্স সত্যজিৎ এই ছবিতে উপস্থাপন করলেন আর উত্তমকুমার প্রাণ ঢেলে অভিনয় করে তাকে জীবন্ত করে তুললেন। 'আধুনিকা' পত্রিকার পূজা সংখ্যায় 'অভিনয়ের কথা' নামের লেখাটিতে উত্তমকুমার লিখেছিলেন: "আমি যখন 'নায়ক' করতে যাই তখন সত্যজিৎবাবু বলেছিলেন - ওহে উত্তমকুমার? আমি বললাম, হ্যাঁ, বলুন স্যার। - না প্রথম সিনটা একটু ছবিবিক ঢঙে অভিনয় করতে হবে।" ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের ওই বিখ্যাত টাইমিং ও পজ। এরপর সত্যজিৎ-উত্তম জুটি বাংলা সিনেমাকে উপহার দিলেন কথাসাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা কাহিনির জনপ্রিয় চরিত্র সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে 'চিড়িয়াখানা' ছবি, যে ছবিতে আবার ছকের বাইরে এসে উত্তমকুমার অভিনয় করলেন ব্যোমকেশ চরিত্রে। বিখ্যাত পরিচালক-চলচ্চিত্র আলোচক অশোক বিশ্বনাথন লিখেছেন: "...এখানে জাপানির ছদ্মবেশে জাপানি কথা বলেছেন, অদ্ভুত স্বচ্ছন্দ ফিল করছেন। ব্যোমকেশ বক্সীর রোলের জন্য অ্যাপ্রোপ্রিয়েট উত্তমকুমার।" পরিচালক সন্দীপ রায় মনে করেন 'চিড়িয়াখানা' উত্তমকুমারের কয়েকটি ছবির মধ্যেও অন্যতম। এই ছবিতে তাঁর অনেক ছোটো ছোটো অভিব্যক্তি আছে যা অতুলনীয়।

উত্তমকুমার পরিচালক হিসেবে চারটি ছবি পরিচালনা করেন - 'শুধু একটি বছর' (১৯৬৬), 'বনপলাশীর পদাবলী' (১৯৭৩), 'দুই পৃথিবী' (১৯৮০ - এই ছবির পরিচালক পীযূষ বসুর আকস্মিক প্রয়াণের পর ছবির অবশিষ্ট অংশ পরিচালনা করেন স্বয়ং উত্তমকুমার) এবং 'কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী' (১৯৮১)। চারটি ছবিই জনসমাদর পেয়েছিল এবং সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছিল। সত্যজিৎ রায় ছাড়াও পরিচালক নির্মল দে, মৃণাল সেন, তপন সিনহা, অজয় কর, অগ্রদূত, অগ্রগামী, সুশীল মজুমদার, হরিদাস ভট্টাচার্য, অসিত সেন, বিকাশ রায়, পীযূষ বসু, সলিল দত্ত, হীরেন নাগ, পিনাকী মুখোপাধ্যায়, হরিসাধন দাশগুপ্ত, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, সলিল সেন, যাত্রিক, রবি ঘোষ প্রমুখের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা, চিত্রনাট্যকার বিধায়ক ভট্টাচার্য সহ অন্যান্যদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, চলচ্চিত্র বিষয়ে নানা প্রযুক্তি - আলো, ক্যামেরা, লেন্স, ফ্রেম, সম্পাদনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে অনুসন্ধিৎসা তাঁকে অভিজ্ঞ করে তুলেছিল, তার বড়ো প্রমাণ 'শুধু একটি বছর'-এর মতো একটি পরিচ্ছন্ন রোমান্টিক কমেডি ছবি। আবার 'বনপলাশীর পদাবলী' ছিল গ্রামবাংলার সাধারণ জনজীবনের প্রাত্যহিক চলচ্ছবি। সেই ছবির প্রিমিয়ারে আমন্ত্রিত বিখ্যাত কথাকার রমাপদ চৌধুরীর ছবি দেখার পর এমন প্রতিক্রিয়া ছিল: "...খুব লম্বা সিনেমা। আমার বইটিও বিশাল। এতটা সময় কিন্তু বুঝতে পারিনি। বেশ গতি ছিল সিনেমার। ছবি শেষ হয়ে গেছে। সিটে চুপচাপ বসে। হঠাৎ আমাকে ধাক্কা দিয়ে আমার স্ত্রী বলল, 'কী গো, বাড়ি যাবে না! সিনেমা তো অনেকক্ষণ শেষ হয়ে গেছে!' আসলে আমি ভাবছিলামা আমার ভাবনাকে একেবারে তছনছ করে দিয়েছেন। তখন ভাবলাম, আমার বইটা ভালো নাকি উত্তমকুমারের 'বনপলাশীর পদাবলী' ভালো! স্থির করতে পারিনি সেদিন।" অভিনয় সম্পর্কিত নানা বিষয়ে উত্তমকুমারের শেখার আগ্রহ ছিল বরাবরের। তিনি প্রচুর বিদেশি ছবি দেখতেন। 'অগ্রদূত'-এর প্রাণপুরুষ বিভুতি লাহা বলেছিলেন: "...অনেক গুণের মধ্যে একটা বিশেষ গুণ ছিল সিনেমা তৈরির টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলি জানবার অনুসন্ধিৎসা। ...ওর শট টেকিং, এবং এডিটিং সেনসটা যে ভালোভাবেই গড়ে উঠেছিল সেটা 'শুধু একটি বছর' ছবিটা দেখেই বুঝেছিলাম।"

।। তিন ।।

চলচ্চিত্রের উত্তমকুমার বিষয়ে আলোচনা আর সেখানে গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে দু-চার কথার উত্থাপন ঘটবে না এমন কি হতে পারে? যদিও অনেকে জানেন এই জুটির প্রথম ছবি 'শাপমোচন' (১৯৫৫) কিন্তু প্রকৃত তথ্য হলো উত্তমকুমারের লিপে হেমন্তের প্রথম প্লেব্যাক 'সহযাত্রী' (১৯৫১) ছবিতে। কবি শৈলেন রায় রচিত ও রবীন চট্টোপাধ্যায় সুরারোপিত দুটি গান 'ভালোবাসার পরশমণি কোথায় তারে পাই' এবং 'গগনে ঘনঘটা উড়ে যায় মেঘের জটা'। গান দুটি স্বল্পশ্রুত। বাস্তবে এই দুজনের আলাপ উত্তমকুমারের অভিনয়জীবন শুরু হওয়ার অনেক আগে। মাত্র ষোলো বছর বয়সে উত্তম শাস্ত্রীয় সংগীত শিক্ষা শুরু করেন নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। তারপর ঘরে-বাইরে অনেক অনুষ্ঠানে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সংগীত পরিবেশন করেছেন ও শ্রোতাদের ভালোবাসা পেয়েছেন। দুজনের জুটির কাছে আমরা প্রথম একাধিক জনপ্রিয় গান পেলাম 'শাপমোচন' ছবিতে - 'শোনো বন্ধু শোনো', 'বসে আছি পথ চেয়ে' এবং নেপথ্যে 'ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস'-এর মতো এই জুটির গান শুনে সাধারণ দর্শক আবিষ্কার করলেন উত্তমকুমারের কণ্ঠের সঙ্গে হেমন্তের আশ্চর্যরকম মিল! পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে এই জুটির কাছে আমরা উপহার পেলাম আরও বেশ কিছু কালজয়ী গান - 'দূরের মানুষ কাছে এসো', 'ঘরের বাঁধন ছেঁড়েই যদি', 'নীলামবালা ছ' আনা', 'মৌ বনে আজ মৌ জমেছে', 'মালতীভ্রমরে করে', 'সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসে', 'নীড় ছোটো ক্ষতি নেই', 'মনের কথাটি ওগো', 'যদি ভাবো এ তো খেলা নয়', 'শুধু আঁধার ধূ ধূ আঁধার', 'সারাটি দিন ধরে', 'তারে বলে দিয়ো', 'ওগো যা পেয়েছি', 'স্বপ্ন জাগানো রাত', 'ওগো কাজলনয়না হরিণী', 'যে আমার মন নিয়েছে', 'শুধু ভালোবাসা দিয়ে', 'কে জানে ক' ঘণ্টা', 'বিষ্ণুপ্রিয়া গো আমি চলে যাই', 'এতদিন পরে তুমি গভীর আঁধার রাতে', 'শরীরখানা গড়ো আগে শরীর গড়ো' ইত্যাদি। শেষ গানটিতে সুরকার নচিকেতা ঘোষ মার্চিং টিউনের চমৎকার ব্যবহার করেছিলেন। এক সময় এই জনপ্রিয় জুটির মধ্যে বেশ কিছুকাল বিচ্ছেদ ঘটেছিল। এই সময়পর্বে মান্না দে, শ্যামল মিত্র উত্তমকুমারের প্লেব্যাক করেন। কয়েকটি ছবিতে কিশোরকুমার প্লেব্যাক করেছেন। মান্না দের কণ্ঠে 'আমি যে জলসাঘরে', 'আমি যামিনী তুমি শশী হে', 'না না না আজ রাতে আর', 'কাহারবা নয় দাদরা বাজাও', 'ফুল সাজতে লাগে পুজোয় লাগে', 'বড়ো একা লাগে', 'যেদিন লব বিদায়', 'শাওন রাতে যদি', 'চোখ খুলে যে চেয়ে দেখি', 'পায়ে পায়ে ছড়িয়ে রাখ', 'আমি আগন্তুক বার্তা দিলাম', 'আমি কোন পথে যে চলি', 'তা বলে কি প্রেম দেবে না'–র মতো অসংখ্য হিট গান। আবার শ্যামল মিত্রের কণ্ঠে ও উত্তমকুমারের লিপে অনেক হিট গানের মধ্যে কতিপয় গানের উল্লেখ করা যায়। যেমন, 'আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে', 'আমি চেয়ে চেয়ে দেখি', 'জীবনখাতার প্রতি পাতায়', 'গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে', 'আহা মরি মরি', 'ভোলা মন মনের কথা কারে বলি আর', 'এ যেন অজানা এক পথ' ইত্যাদি। কিশোরকুমারের প্লেব্যাকে একাধিক জনপ্রিয় গান উত্তমকুমারের লিপে চিত্রায়িত হয়েছে। যেমন, 'এ কী হল, কেন হল, কবে হল জানিনা', 'বিপিনবাবুর কারণসুধা', 'কী আশায় বাঁধি খেলাঘর', 'শুধু তুমি নয় অবলাকান্ত', 'এই তো জীবন', 'আমি একজন শান্তশিষ্ট পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক', 'নারীচরিত্র বেজায় জটিল' ইত্যাদি। গানের প্রতি তাঁর ছিল সত্যিকারের টান। সেই ভালোলাগা তাঁকে ছায়াছবির সুরকারও বানিয়েছে। 'কাল তুমি আলেয়া' ছবিতে তাঁর সুরারোপিত তিনটি গান অতীব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল - 'যাই চলে যাই' (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়), 'মনের মানুষ ফিরল ঘরে' এবং 'পাতা কেটে চুল বেঁধে কে টায়রা পরেছে' (আশা ভোঁশলে)। পরে গুরু নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে 'সব্যসাচী' ছবিতেও উত্তম সুর করেছিলেন।

বাংলার অবিসংবাদিত মহানায়ক মুম্বাইয়ে সফল হতে পারেননি। অনেক স্বপ্ন নিয়ে 'ছোটি সি মুলাকাত' (১৯৬৭) নামে ছবিটি প্রযোজক-নায়ক হিসেবে দর্শকের সামনে আনলেও এই ছবি সাফল্য পায় নি। এই ব্যর্থতা তাঁকে শারীরিকভাবে, আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন করেছিল। তাঁর জীবনের আর এক ব্যর্থতা হল রেডিয়োয় 'মহালয়া' ('দেবীং দুর্গতিহারিণিম্‌')-র উপস্থাপনা।

।। চার ।।

১৯৫১ সালে প্রয়াত হন প্রমথেশ বড়ুয়া। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সিনেমায় যে নায়কের শূন্যস্থানের সৃষ্টি হয় তা পূরণে পরিচালকদের প্রচেষ্টায় অসিতবরণ, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ধীরাজ ভট্টাচার্য সেইস্থান পূর্ণ করলেও একের পর এক ছবিতে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার উপায় বাংলা সিনেমা তাঁদের কাছে রাখতে পারেনি। সেদিক থেকে নির্মল দে পরিচালিত 'বসু পরিবার' (১৯৫২)ছবিতে একজন নায়কের দেখা বাঙালি পেল এবং সময়ের সঙ্গে অনেক লড়াই করে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি পরবর্তী সময়ে নিজেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত করলেন - তিনিই উত্তমকুমার (জন্ম: ৩ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬)। আর ১৯৮০ সালে তাঁর মৃত্যু (২৪ জুলাই) এক অসীম শূন্যতার সৃষ্টি করেছে সন্দেহ নেই। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে এক বৃহত্তর জনসম্মোহনী আবেগ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিলেন, যা তাঁর আগেও কেউ করতে সক্ষম হননি, পরেও নয়। তাই সমালোচক রবি বসু লিখেছিলেন: "তিনি সর্বকালের সর্বজনীন রোমান্টিক নায়ক। ভারতীয় সিনেমার সেরা নায়ক। কারণ দেশের অন্য কোনো তারকা মৃত্যুর এত বছর পরেও মানুষের মনে এমন অমর স্মৃতি গেঁথে রাখতে পারেননি।" শুধু কি তিনি বাংলা বা বাঙালির কাছে মহানায়ক না সত্যিকারের এক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান - তা প্রমাণের দায়ভার এই সময়ে বেঁচে থাকা বাঙালির! আজকের বা আগামীকালের বাঙালি রোমান্টিক প্রেমিক যুবকটি কি তাঁর একান্ত ভালোবাসার মানুষটির কাছে একান্তে দাবি জানায় বা জানাবে - "তুমি আমাকে বলো উত্তমকুমার!"

পরিচিতি: অধ্যাপক, কবি, প্রাবন্ধিক, সঙ্গীতশিল্পী।