"অসমিয়া সুরে পাশ্চাত্য সংগীতের সমন্বয়ে রূপকোঁওর জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা অসমিয়া গান-বাজনাকে এক চিরসবুজ পথে নিয়ে গেছেন। সেই পথেই তাঁরই দীক্ষিত ডঃ ভূপেন হাজারিকা অসমিয়া গানকে এক নতুন স্তরে উন্নীত করলেন। জ্যোতিপ্রসাদের 'রোমান্টিক' স্বাদেশিকতাকে ভূপেন হাজারিকা 'সমাজতান্ত্রিক' বাস্তবতার দোরগোড়ায় তুলে আনলেন।... সেই সুরের অসমিয়া স্থাপত্য অক্ষুণ্ণ রেখেও ডঃ ভূপেন হাজারিকা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত এবং পাশ্চাত্য সুরের সংমিশ্রণে তার ঔজ্জ্বল্য আরও বৃদ্ধি করেছিলেন।" (অনূদিত)
ভূপেন হাজারিকার সংগীত সম্পর্কে এই অসাধারণ মূল্যায়ন করেছিলেন গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট গণশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তিনি এই কথাগুলি উচ্চারণ করেছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ-র গুয়াহাটি শাখা প্রকাশিত(১৯৫৪) ভূপেন হাজারিকার প্রথম গানের সংকলন 'জিলিকাব লুইতরে পার'-এর মুখবন্ধে।
বহুমুখী প্রতিভার সমন্বয়ে গড়া এক বর্ণময় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন ভূপেন হাজারিকা। অসমের সংস্কৃতির ভুবনে শ্রীমন্ত শংকরদেব, মাধবদেব থেকে জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার সুবিশাল অবদানের পর ভূপেন হাজারিকার সংগীতকে এক নতুন সৃষ্টি বলে অনায়াসে আখ্যা দেওয়া যায়। তিনি ছিলেন একইসঙ্গে গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রশিল্পী, অধ্যাপক, দীর্ঘদিনের পত্রিকা সম্পাদক, বিধায়ক সহ নতুন সৃষ্টির অন্বেষণে মগ্ন এক ক্লান্তিহীন যাযাবর। তবে সমস্ত প্রতিভাকে ছাপিয়ে তিনি দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছেন একজন অসামান্য গীতিকার, সুরকার, গায়ক এবং গণশিল্পী হিসেবেই । এবছর এই অনন্য প্রতিভাধর শিল্পীর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপিত হচ্ছে নানা আয়োজনে। সেই উপলক্ষ্যে ভূপেন হাজারিকার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর সাংগীতিক জীবন ও সৃষ্টির কিছু দিক খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে তুলে ধরা হলো।
জন্মকথা
সবুজ বনানী, পাহাড় ও নদীবেষ্টিত উজান অসমের পূর্ব প্রান্তে সদিয়ায় ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্ম ভূপেন হাজারিকার। তাঁর জন্মের সময় বাবা নীলকান্ত হাজারিকা ছিলেন সদিয়ার মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মা শান্তিপ্রিয়া দেবী। সাত ভাই ও তিন বোনের মধ্যে ভূপেনই ছিলেন বড়ো। মা শান্তিপ্রিয়া দেবী ভালো গান গাইতে পারতেন। শিশুবয়সে মায়ের গাওয়া লোকগীতি ও ঘুমপাড়ানি গান শুনে শুনে তাঁর মধ্যে সংগীতপ্রতিভার উন্মেষ হয়েছিল।
তাঁর বাবার কর্মসূত্রে কিছুদিন গুয়াহাটি ও ধুবড়ি শহরে প্রাথমিক শিক্ষার পর ১৯৩৬ সালে আসেন সাংস্কৃতিক শহর তেজপুরে। এখানে তিনি ভরতি হন ষষ্ঠ শ্রেণিতে। এই তেজপুর শহর ভূপেনের জীবনের পট পরিবর্তনে বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল। এখানেই তিনি সান্নিধ্যে আসেন অসমের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম প্রধান দুই কাণ্ডারি রূপকোঁওর জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা ও সৈনিক শিল্পী বিষ্ণু রাভার। সেইসঙ্গে নটসূর্য ফণী শর্মারও সংস্পর্শে আসেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন, "আমার শৈশবকালটা এতটাই সৌভাগ্যে ভরা যে দৌড় মারলেই বাণ স্টেজের পিয়ানো শুনি,স্কুলের ক্লাস সিক্সে ঢুকলেই দণ্ডিনাথ কলিতার মতো সাহিত্যিকের পড়া শিখি। ওদিকে গেলেই জ্যোতিপ্রসাদ-বিষ্ণুদাদাকে দেখি – সুর দিচ্ছেন। সেটা আমাকে শেখাবেনই। না হলে থাকতে পারেন না। আমাকে কাছে ডেকে বলেন, সুরটি দে তো। গানটিতে রক্ত-মাংস দে। সেই পরিবেশে আমি বেড়ে উঠেছি। মার্কসজিম দেখেছি, পেয়েছি বিষ্ণুদাদার কাছ থেকে। উদার গান্ধীবাদ পেয়েছি জ্যোতিদাদার কাছ থেকে।"
একদিকে পারিবারিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অন্যদিকে তেজপুর শহরের সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রভাবে তিনি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন বিশাল অন্তরের একজন স্বভাবসুলভ শিল্পী।
শিক্ষার আঙিনায়
১৯৪০ সালে তেজপুর হাইস্কুল থেকেই ভূপেন ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর গুয়াহাটির কটন কলেজ থেকে আইএ পাশ করে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হন। সেখান থেকেই তিনি ১৯৪৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও ১৯৪৬ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ছোটোবেলায় তেজপুর শহর যেমন ভূপেনের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনা সঞ্চার করেছিল,তেমনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন তাঁর স্বদেশচেতনা, রাজনৈতিক বোধ ও সংগীত প্রতিভার স্ফুরণে সাহায্য করেছিল। এখানে তিনি সান্নিধ্যে আসেন স্বনামধন্য দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও তৎকালীন উপাচার্য ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন,স্বাধীনতা সংগ্রামী ও মার্কসবাদী পণ্ডিত আচার্য নরেন্দ্র দেব,স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শিক্ষাবিদ মদনমোহন মালব্য সহ বিখ্যাত সব পণ্ডিত,সাহিত্যিক ও শিল্পীদের।
পরবর্তীকালে এই বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন: "হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় তখন আশ্রমের মতো ছিল। হিন্দু কথাটার একটা সর্বজনীন অর্থ আমি এখানেই উপলব্ধি করেছি। আমি এখানে মুসলিম ছেলেকে গীতা পড়তে দেখেছি। যারা গোরুর মাংস মাছ খেত, তাদের জন্য আলাদা হোস্টেল ছিল। তাছাড়া আর কোনো পার্থক্য ছিল না।" তিনি এখানকার পরিবেশ সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি ব্যক্ত করেছেন এভাবে, "বেনারসে আসার পর আমার জীবনের চিন্তাধারাই পালটে গিয়েছিল। এই সময়ে মারাঠি বা গুজরাটি বা অন্য প্রদেশের মানুষ দেখলে মনে হতো, কত আপন। আবার যখন সহপাঠী হিসেবে একজন আফ্রিকার ছেলে, একজন ইন্দোনেশিয়ার ছেলে বা একজন জাপানের ছেলে দেখেছিলাম, কিংবা একজন মুসলিম সহপাঠীকে সংস্কৃত পড়তে দেখি,তখনই বিশ্বমানবতার প্রকৃত স্বরূপ ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।"
ভূপেন হাজারিকা ১৯৪৯ সালে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি নিয়ে নিউইয়র্ক যান। এখানে থাকার সময়ই তাঁর বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা আরও প্রসারিত ও সমৃদ্ধ হয়। এখানে তিনি নানা ক্ষেত্রের বেশ কয়েকজন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তির সাক্ষাৎ পান। এই সময়ে ভারতের দু'জন স্বনামধন্য ব্যক্তির সান্নিধ্যে আসেন তিনি। তাঁরা হলেন কবি,শিক্ষাবিদ ও একসময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য সচিব ডঃ অমিয় চক্রবর্তী (তখন তিনি ছিলেন হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক) এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও পরবর্তীকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ডঃ জাকির হোসেন। তখন ভূপেন হাজারিকা হিন্দুস্তান অ্যাসোসিয়েশন অফ আমেরিকা (নিউইয়র্ক চ্যাপ্টার)-র সাধারণ সম্পাদক। সেই সময়ে নিউইয়র্কে ভারতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এলে তাঁরা সাক্ষাৎ করতে যেতেন।
এখানে তিনি মাস কমিউনিকেশন বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তারপর ১৯৫২ সালে ভারতে বয়স্কদের শিক্ষায় অডিয়ো-ভিসুয়াল পদ্ধতির ব্যবহার বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পরের বছর তিনি ফিরে আসেন ভারতে।
পল রবসনের সান্নিধ্যে
এই কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েই তাঁর সুযোগ হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত গণশিল্পী এবং মানবাধিকার আন্দোলন ও বর্ণ বৈষম্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব পল রবসনের সান্নিধ্যে আসার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রথম সাক্ষাতের দিন পল রবসনকে গাইতে শুনেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গান 'ওল ম্যান রিভার' (Ol' man river)। সেদিন রবসনকে প্রথম দেখা এবং তাঁর সংগীত পরিবেশনায় অভিভূত হবার কথা বর্ণনা করে ভূপেন লিখেছেন: "অসাধারণ লাগল পল রবসনের সংগীত পরিবেশনা রীতি। আমি পাগলের মতো হয়ে গেলাম। দেখা করলাম তাঁর সঙ্গে। বললাম, আমি কিন্তু মাঝে মাঝে আপনাকে এসে বিরক্ত করব। বললেন, নিশ্চয়ই আসবেন। ওখান থেকে ফিরে এসে বন্ধুদের বললাম, সার্থক হয়ে গেল আমেরিকা দর্শন।"
নিউইয়র্কে প্রগতিশীল প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র 'জেফারসন স্কুল অফ সোশ্যাল সায়েন্স'-এ রবসন বক্তৃতা করতে আসতেন এবং গান শোনাতেন। ভূপেন রাতের দিকে লুকিয়ে সেখানে যেতেন রবসনের 'মিউজিক অ্যান্ড লাইফ' বিষয়ে ক্লাসে যোগ দিতে। এমনই একদিন ক্লাসের অসাধারণ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন ভূপেন। তাঁর কথায় – পল রবসন একবার তাঁর গিটারটা তুলে নিয়ে তুলে ধরে জানতে চেয়েছিলেন কী ওটা। ভূপেনরা উত্তরে প্রথমে গিটার ও পরে বলেছিলেন মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট। তখন পল রবসন উচ্চস্বরে বলেছিলেন, "নো, দিস ইজ সোশ্যাল ইন্সট্রুমেন্ট। উইথ ওয়ান স্ট্রোক অফ গিটার, ইউ ক্যান চেঞ্জ দ্য প্যাটার্ন অফ হোল সোসাইটি।"
ছেলেবেলায় জ্যোতি প্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা এবং ফণী শর্মার সান্নিধ্য যেমন ভূপেনের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল,তেমনি যৌবনে তাঁর সাংস্কৃতিক চেতনাকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিল বিশ্বখ্যাত গণশিল্পী পল রবসন। তাই আমেরিকা থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসার পর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়ার কথা না ভেবে প্রথমে তিনি নিজেকে যুক্ত করেছিলেন গণনাট্য আন্দোলনের প্রবাহে। ভূপেন হাজারিকার সৃষ্টি এবং সংগীত পরিবেশনশৈলীতেও পল রবসনের প্রভাব স্পষ্টভাবেই লক্ষ করা যায়।
গানের ভুবনে
আগেই বলা হয়েছে, বাবা-মা এবং পরিবারের কয়েকজন সংস্কৃতিমান মানুষ এবং তেজপুরের সংস্কৃতিময় পরিবেশের প্রভাবেই ভূপেন হাজারিকা একজন স্বভাবসুলভ শিল্পীতে পরিণত হতে পেরেছিলেন। তবে তাঁর সুরেলা কণ্ঠ ছিল জন্মগত । মা ভালো গান গাইতেন। সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছিল মার কাছেই। ছেলেবেলায় মায়ের শেখানো শ্রীমন্ত শংকরদেব ও তাঁর শিষ্য শ্রী মাধবদেব বিরচিত বরগীত গেয়েই তিনি জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা এবং বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার নজরে আসেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে গুয়াহাটির কটন কলেজিয়েট স্কুলে একটি গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তিনি স্বনামধন্য সাহিত্যিক সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার আশীর্বাদ অর্জন করেছিলেন। লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া পরবর্তীকালে সেদিনের ঘটনার কথা উল্লেখ করে তাঁর 'মোর জীবন সোঁওরণ' (আমার জীবন স্মৃতি)-এ লিখেছেন, "ছাত্রদের সভায় একটি অতি কম বয়সি ছেলে( শিশু বললেই হয়) হারমোনিয়ামের সাহায্যে সুন্দর করে একটি গান গেয়েছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে আসন থেকে উঠে সভায় ছেলেটির গালে একটি চুমু খেয়েছিলাম। সেই সময় কলকাতায় 'মাস্টার মদন' বলে তেমন গান গাওয়া ছেলে একটির গান শুনেছিলাম। আজ অসমিয়া মাস্টার মদনকে দেখে বড়ো সন্তুষ্ট হলাম।" ওই শিশুবয়সেই তাঁর মধ্যে যে অসামান্য সংগীত প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছিল,এই ঘটনা তারই সাক্ষ্য দেয়।
এছাড়াও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, ১৯৩৬ সালে যখন ভূপেনের বয়স মাত্র ১০ বছর, তখন তাঁর সংগীত প্রতিভা উপলব্ধি করে জ্যোতিপ্রসাদ-বিষ্ণু রাভা তাঁকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে গানের রেকর্ড করান। ১৯৩৯ সালে আবার তাঁরা ভূপেনকে নিয়ে যান কলকাতায় 'ইন্দ্রমালতী' ছবিতে গান গাওয়ানো ও অভিনয়ের জন্য। তাই ভূপেন নিজের লেখায় অকপটে উল্লেখ করেছেন, "আমাকে যদি জ্যোতিপ্রসাদ বিষ্ণুরাভা কলকাতায় নিয়ে গিয়ে গান গাওয়ার সুযোগ না দিতেন, তাহলে আমি সংগীতকে আমার জীবনে এভাবে হয়তো আলিঙ্গন করে নিতাম না। সংগীতকে কেবল বাথরুম সং হিসেবেই ব্যবহার করতাম।"
অসমের সমাজ জীবন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিলেন বিশিষ্ট ভক্তিবাদী সমাজসংস্কারক তথা 'মহাপুরুষীয়া' ধর্ম প্রবর্তক শ্রীমন্ত শংকরদেব(১৪৪৯-১৫৬৮) এবং তাঁর শিষ্য মাধবদেব (১৪৮৯-১৫৯৬)। এই দু'জন মহাপুরুষ সমাজ জীবনে শান্তি, সম্প্রীতি এবং ভ্রাতৃত্ববোধ অটুট-অম্লান রাখার জন্য আমরণ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁদের জীবনাদর্শের দ্বারা কৈশোরেই প্রভাবিত হয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা। যার ধারাবাহিকতা তাঁর সংগীত ও গীতি-সাহিত্যে অক্ষুণ্ণ ছিল। ভূপেন হাজারিকাও রচনা করেছেন শান্তি, সম্প্রীতি ও সংহতির গান। তিনি তাঁর জীবনের প্রথম গানটি রচনা করেছিলেন শ্রীমন্ত শঙ্করদেবকে নিয়ে। তখন তিনি তেজপুর হাইস্কুলের ছাত্র,বয়স মাত্র ১১ বছর। অসমিয়া ভাষায় রচিত সেই গানের অর্থ হলো: "কুসুম্বের পুত্র শ্রীশংকর গুরু ধরেছিলেন /নাম গানের তান/ নামের সুরে আনন্দে নেচেছিল পবিত্র / বরদোয়া থান।"...
শ্রীশংকরদেব প্রবর্তিত 'মহাপুরুষীয়া' ধর্মের মাধ্যমে সমাজসংস্কার আন্দোলনের জন্য বিভিন্ন সময়ে তিনি ও তাঁর অনুগামীরা আক্রমণ ও অত্যাচারের সম্মুখীন হন। একসময়ে কাছারি(কছারি) দের আক্রমণ ও অত্যাচারের কারণে শংকরদেব এবং তাঁর অনুগামীদের বরদোয়া থান থেকে চলে যেতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণদের বিরোধিতা ও আহোম রাজশক্তির সঙ্গে সংঘাতের জন্য তাঁদের চলে যেতে হয় পার্শ্ববর্তী কোচ রাজ্যে। সমাজ জীবনের সংকটময়তার মধ্যে অবস্থান করেও এই দু'জন ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক রেখে গেছেন বৃহৎ সাহিত্য সম্পদ, সংস্কৃতি, এক উৎকৃষ্ট জীবন চর্চা,সাম্প্রদায়িক সদ্ভাবনার সম্পদ সহ আরো অনেক কিছু। এই অমূল্য সম্পদের মর্ম উপলব্ধি করেই কিশোর বয়সে ভূপেন হাজারিকা লিখেছিলেন : নামঘর সাজিলা,রাইজক থাপিলা/ একতার আসনত আনি"... (নামঘর নির্মাণ করলেন, মানুষকে বসালেন /একতার আসনে এনে) আবার এই দু'জন মহাপুরুষের জীবনে সম্মুখীন হওয়া নিদারুণ যন্ত্রণা উপলব্ধি করে ভূপেন সে গানেই উল্লেখ করেন, 'অশেষ যাতনা ভোগ করেছ শ্রীশংকর ধর্মের নামে তুমি' (অনূদিত)। এই দু'জন মহাপুরুষের সৃষ্টি করা কাব্য-সাহিত্য ও উন্নত জীবনচর্যা এবং সম্প্রীতির ঐতিহ্যের অনাদর দেখে শৈশবেই আক্ষেপ করে ভূপেন লিখেছিলেন: "অসমের আকাশে দুখের রোল উঠছে আজ/ শ্রীশংকর নাই গুরু ঐ,আজ শ্রীশংকর নাই।"...
ভূপেন হাজারিকার গানে বিহু সুরের প্রভাবও অপূর্ব মাত্রা সংযোজন করেছে। পাশ্চাত্য ও দেশীয় সুর মিশিয়ে তার সঙ্গে বিহু সুর যুক্ত করে অসমিয়া গানে নতুন তরঙ্গ সৃষ্টি করেছেন তিনি। বিহু সুরে রচিত তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গান হলো: "মিঠা মিঠা বহাগর/ গীত এটিকে লিখো বুলি ভাবিলোঁ / এনেতে চুচুক চামাককৈ কাষ চাপিলা?/ মই যেন ভাষা পালোঁ" (অপরূপ বৈশাখে গান লিখতে মন চাইলো /তুমি কাছে এলে /তাই আমি যেন ভাষা খুঁজে পেলাম)।
এছাড়াও তাঁর রচিত 'বা বাগিচার চা চাকরি/ নে নেলাগে লা লাহরী', 'বিহুরেণু বিরিণা পাতে অ', 'দোলা হে দোলা', 'গুম গুম গুম গুম মেঘে গরজিলে' ইত্যাদি গানে বিহু সুরের প্রভাব অপূর্ব ব্যঞ্জনা তৈরি করে।
ভূপেন হাজারিকার গানে বিহু ছাড়াও কামরূপী লোকগীত, গোয়ালপাড়িয়া, পূর্ববঙ্গের ভাটিয়ালি, সাঁওতালি, ঝুমুর ইত্যাদি লোকসংগীতের সুরের অপরূপ মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় – 'অসম দেশর বাগিচারে'(ঝুমুর),'কানাই পার করা হে' (কামরূপী লোকগীতি), 'আরে গেইলে কি আসিবেন' (গোয়ালপাড়িয়া), 'গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা' (ভাটিয়ালি) ইত্যাদি।
ভূপেন হাজারিকা তাঁর শিল্পী-জীবনে সংগীতের ডালি নিয়ে পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছেন (তিনি একজায়গায় উল্লেখ করেছেন, পৃথিবীর ৪৮ টা দেশের ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন) এবং সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন দেশের বৈচিত্র্যময় সুর। সেই সমস্ত সুর তাঁর গানে সংযোজন করে গানগুলিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। পাশ্চাত্য সুরের প্রভাবে তাঁর অন্যতম সৃষ্টি পল রবসনের বিখ্যাত গান 'Ol' man river' অবলম্বনে "বিস্তীর্ণ পাররে অসংখ্য জনরে" (বাংলায় 'বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের')। এছাড়া আমেরিকা-পর্বে শেখা মানবতাবাদী প্রতিবাদের গান 'We are in the same boat brother' অবলম্বনে রচিত 'আমি একেখন নাওরে যাত্রী' ('মোরা যাত্রী একই তরণীর')। এছাড়া 'আমি এক যাযাবর', 'মানুষ মানুষের জন্য' ইত্যাদি গানে লক্ষ করা যায় পাশ্চাত্য সুরের সুস্পষ্ট প্রভাব।
এসবের বাইরেও ভূপেন হাজারিকার গানে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর সুযোগ হয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বহু বিশিষ্ট শিল্পীর অনুষ্ঠান শোনার। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কণ্ঠশিল্পী সিদ্ধেশ্বরী দেবী, বিনায়ক রাও পট্টবর্ধন,হীরাবাই বরোদাকর, তবলা শিল্পী আনোখেলাল,কণ্ঠে মহারাজ প্রমুখ। শেষোক্ত দু'জন সহ অনেক শিল্পীর বাড়িতেও যাতায়াত ছিল ভূপেনের। বিশিষ্ট সানাই শিল্পী বিসমিল্লাহ খানের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর রেওয়াজ শুনেছেন। সেই সময়ে এভাবেই তাঁর পক্ষে যতটুকু সম্ভব শাস্ত্রীয় সংগীতের জ্ঞানকে হৃদয়ঙ্গম করে নিয়েছেন । শৈশবে কলাগুরু বিষ্ণু রাভা তাঁকে কয়েকটি ছোটো খেয়াল শিখিয়েছিলেন। এমনকী ছেলেবেলায় তিনি খেয়াল প্রযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছিলেন। (তিনি শৈশবে রবীন্দ্রসংগীত গেয়েও পুরস্কার অর্জন করেছিলেন)। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক নতুন পথনির্মাতা পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে রচিত বাংলায় অনূদিত গ্রন্থ তিনি শৈশবেই পড়েছিলেন। এ সব কিছুর মধ্য দিয়ে শাস্ত্রীয় সংগীত যতটুকু আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন তার ভিত্তিতেই অনবদ্য কিছু গান তিনি রচনা করেন। সেগুলির মধ্যে অন্যতম 'স্নেহে আমার শত শ্রাবণর', 'কত জোয়ানর মৃত্যু হ'ল', 'অসম আমার রূপহী', 'কি যে তোমার সঙ্গ প্রিয়া' ইত্যাদি। এছাড়া তাঁর গাওয়া 'গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা' গানটিতেও রাগের আভাস লক্ষ করা যায়। তাঁর গাওয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় 'জিলিকাব লুইতরে পার' গানটির মধ্যে অসমিয়া লোকসুরের সঙ্গে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অপূর্ব মিশ্রণ গানটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, এই গানগুলি বিভিন্ন রাগে নিবদ্ধ হলেও ভূপেন হাজারিকার নিজস্ব সুরের মাধুর্যে গানগুলোকে স্বকীয়তা প্রদান করেছেন।
ভূপেন হাজারিকার প্রতিটি গান যেন এক একটি জীবন্ত চিত্র, এক একটি অনবদ্য সুখপাঠ্য কবিতা। তাঁর গানে 'লুইত' অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্রও জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। তারমধ্যে 'জিলিকাব লুইতরে পার','লুইতর পার দুটি', 'বিস্তীর্ণ পাররে অসংখ্য জনেরে... বুঢ়া লুইত বোয়া কিয়?', 'লুইততে মোর ঘর', 'আজি, ব্রহ্মপুত্র হ'ল বহ্নিমান', 'মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র মহামিলনর তীর্থ', 'শংকর মাধবর মহা মহা সৃষ্টিরে উজ্জ্বল লুইতর পার' ইত্যাদি অসংখ্য গানে মহাবাহু ব্রহ্মপুত্রের মহিমা প্রতিবিম্বিত হয়েছে।
অবশ্য ব্রহ্মপুত্র ছাড়াও চিয়াং, লোহিত, সুবনসিরি হয়ে গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, মিসিসিপি, ভোলগা ইত্যাদি অসংখ্য নদীর নাম ভূপেন হাজারিকার গানে বাঙ্ময় হয়েছে।
চলচ্চিত্র জগতে
ভূপেন হাজারিকার বহুমুখী প্রতিভার দীপ্তি ছড়িয়েছিল চলচ্চিত্রের জগতেও। তাঁর সাংস্কৃতিক গুরু জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার হাত ধরেই ১৩ বছর বয়সে তিনি চলচ্চিত্রের অঙ্গনে প্রবেশ করেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, জ্যোতিপ্রসাদ পরিচালিত 'ইন্দ্রমালতী' ছবিতে ভূপেন শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন। এই ছবিতে তিনি গানও গেয়েছেন। এই ছবির অভিজ্ঞতা এবং অসমিয়া চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা ও তাঁর অন্যতম সহযোগী বিষ্ণুর রাভার চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াস নিঃসন্দেহে ভূপেনকে প্রভাবিত করেছিল। যা পরবর্তীকালে ভূপেনকে চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রাণিত করে। তবে ভূপেন হাজারিকা তাঁর আত্মজীবনীর একজায়গায় লিখেছেন: "আমার বাবার বন্ধু ছিলেন প্রমথেশ চন্দ্র বড়ুয়া। মাঝে মাঝে ধুবড়িতে আসেন। বাবার সঙ্গে 'মুক্তি' ছবির শুটিং দেখতে যাবার সুযোগ হয়েছিল। সেখানেই আমি প্রথম দেখি যমুনা দেবী, কানন দেবীকে। বুঝতেই পারিনি, তখন আমার অজান্তে প্রমথেশ বড়ুয়া হবার তথা সিনেমা করার কথাটা মাথায় ঢুকে পড়েছিল।"
ভূপেন হাজারিকা একটি বাংলা এবং একটি হিন্দি সহ মোট দশটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। জ্যোতি-বিষ্ণুর ভাবাদর্শে আলোকিত ভূপেন হাজারিকা নির্মিত ছবিগুলিতে যে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দায়বদ্ধতা বিশেষ প্রাধান্য পাবে, তা খুবই স্বাভাবিক। তাঁর পরিচালিত ছবিগুলি হলো: 'এরা বাটর সুর' (১৯৫৬) 'মাহুত বন্ধুরে' (১৯৫৮), 'শকুন্তলা' (১৯৬১), 'প্রতিধ্বনি' (১৯৬৪), 'লটি ঘটি' (১৯৬৬), 'চিকমিক বিজুলী' (১৯৬৯), 'মেরা ধরম মেরি মা' (১৯৭৭), 'মন প্রজাপতি' (১৯৭৭), 'সিরাজ' (১৯৮৮) এবং 'মিরি জিয়রি' (১৯৮৯)।
এই ছবিগুলি ছাড়াও ভূপেন হাজারিকা কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। সেগুলির মধ্যে 'রূপকোঁওর জ্যোতিপ্রসাদ আরু জয়মতী' (১৯৭৬), 'থ্রু মেলোডি অ্যান্ড রিদম' (১৯৭৭), 'অ্যালং দ্য রিভার ব্রহ্মপুত্র' (১৯৮১), 'গ্লিমসেস অফ দ্য মিস্ট্রি ইস্ট' (১৯৯৬), 'সত্রজ অ্যান্ড নামঘরস অব আসাম' (১৯৮১), এবং 'দ্য ব্রহ্মপুত্র: আন এন্ডলেস জার্নি' (২০০৬)।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, 'এরা বাটর সুর' ছবি সহ আরও কয়েকটি ছবিতে গণনাট্য সংঘর প্রগতিশীল এবং জনমুখী ভাবাদর্শের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। তাঁর নির্মিত ছবি 'শকুন্তলা' 'প্রতিধ্বনি' ছবি দুটি রাষ্ট্রপতির পুরস্কার অর্জন করেছিল।
পত্রপত্রিকার অঙ্গনে
ভূপেন হাজারিকার বহুমুখী সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় সাংবাদিকতা, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সম্পাদনা এবং লেখালেখির দক্ষতা ইত্যাদিও বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি যদি শুধু এই জগতেই বিচরণ করতেন, তাহলেও তিনি অনন্য কীর্তির স্বাক্ষর রেখে যেতে পারতেন।
তাঁর গান লেখার সূচনা তো ছেলেবেলাতেই হয়েছিল। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় 'অমৃতবাজার পত্রিকা'য় আর্ট নিয়ে সমালোচনামূলক নিবন্ধ লিখতেন। ১৯৫৩ সালে আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পর প্রবল উৎসাহে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মনোনিবেশ করেন। সেই সঙ্গে যুক্ত হন শ্রমজীবী মানুষের চেতনা জাগ্রত করার লক্ষ্যে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। এই সময়ই তিনি তখনকার জনপ্রিয় 'জয়ন্তী', 'আবাহন' ইত্যাদি পত্রিকার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেন। আবার 'আবাহন' পত্রিকায় তিনি চিত্রশিল্পী হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, বেনারসে তিনি বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীদ্বয় রণদা উকিল, সারদা উকিলের কাছে ছবি আঁকাও শিখেছেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে 'মিনি', 'বিন্দু', 'প্রতিধ্বনি' পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন।
১৯৫৫-৫৬ সালে তিনি নিজের কাজের সূত্রে কলকাতা এসে একটি সাংস্কৃতিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। তারই ফসল 'গতি'। এই পত্রিকার সম্পাদনা এবং প্রকাশের দায়িত্বে ছিলেন তিনি নিজে। তাঁর স্ত্রী প্রিয়ম হাজারিকা এবং গুরুপদ চৌধুরী ছিলেন সহযোগী হিসেবে। সত্যজিৎ রায়, রবিশঙ্কর, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, মুল্করাজ আনন্দ, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রসাদ, বিষ্ণু রাভা প্রমুখের লেখা এই পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।
এরপর ১৯৬০ সালে কলকাতায় 'শ্রীভূমি পাবলিশিং'-এর মাধ্যমে প্রকাশিত হয় মাসিক পত্রিকা 'আমার প্রতিনিধি' (আমাদের প্রতিনিধি) পাঠকদের কাছে এই পত্রিকার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ছিল 'শিল্পীর পৃথিবী' কলামটি, যেটা পরিচালনা করতেন ভূপেন হাজারিকা স্বয়ং। অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে এই কলামটিতে ভূপেন হাজারিকা সাংস্কৃতিক জগতের কথা তুলে ধরেছেন, পাশাপাশি চলচ্চিত্র, সংগীত, নাটক ইত্যাদির সংবাদ পরিবেশন করেছেন। প্রথমে পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন পদ্ম বরকটকী। ১৯৬৫ সালে ভূপেন হাজারিকা সম্পাদকের দায়িত্বে আসেন। পত্রিকাটি চলেছিল ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। ভূপেন হাজারিকা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর অন্যান্য কলামের সাথে 'অর্থশাস্ত্রীর চ'রা' (অর্থনীতিবিদের আসর) শীর্ষক নতুন কলাম সংযোজন করেন। তাতে সারস্বত জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, অর্থনীতিবিদের নানা গুরুত্বপূর্ণ লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও এই পত্রিকায় জ্যোতিপ্রসাদ, বিষ্ণু রাভা, ফণী শর্মা, পার্বতী প্রসাদ বড়ুয়ার মতো শিল্প-সাহিত্য জগতের অগ্রগণ্য ব্যক্তিদের জীবন ও সৃষ্টি পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। এছাড়াও এই পত্রিকায় আরেকটি জনপ্রিয় কলাম ছিল 'সহস্র জনে মোক প্রশ্ন করে'। এই কলামে মূলত ছাত্রদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতেন তাদের প্রিয় এই শিল্পী। এই কলমে হাস্যরসের প্রাধান্য লক্ষণীয় ছিল, কিন্তু 'সিরিয়াস' প্রশ্নের উত্তর সিরিয়াসভাবে এবং 'লঘু' প্রশ্নের উত্তর লঘু কথার মাধ্যমেই দিতেন তিনি।
'আমার প্রতিনিধি' পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধের বিষয় হিসেবে বিভিন্ন সময়ে তিনি তুলে ধরেছেন মহাত্মা গান্ধী, লেনিন থেকে জ্যোতিপ্রসাদ, বিষ্ণু রাভা এবং কাজী নজরুল ইসলামকে। কখনো কখনো গানের বাণীতেও তিনি সম্পাদকীয় রচনা করেছেন।
গণনাট্য আন্দোলনে
বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পর কিছুদিন কলেজে অধ্যাপনা, গান,চলচ্চিত্র নির্মাণ সহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং রেডিয়োর কাজ ইত্যাদিতে যুক্ত থাকেন। এমন একটি সময়েই জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা এবং নগেন কাকতির অনুপ্রেরণায় তিনি যোগ দেন গণনাট্য আন্দোলনে। সৃষ্টি করেন নতুন নতুন গান। তারপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান আমেরিকায়। উচ্চশিক্ষা শেষে ফিরে এসে (১৯৫৩) কিছুদিন গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ করেন। এর পরবর্তী সময়েই তাঁর সঙ্গে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সম্পৃক্ততা গভীর হয়। তখন গণনাট্য সংঘের প্রথম সভাপতি জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা চির বিদায় নিয়েছেন। সামনে পেলেন গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি গণশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে। তখন গণনাট্যে অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে পেলেন বিষ্ণু রাভা, মঘাই ওঝা, দিলীপ শর্মা, কেশব মহন্ত, ব্রজেন বড়ুয়া, রমেন বড়ুয়া, বোন সুদক্ষিণা শর্মা প্রমুখকে। পরবর্তী সময়ে যোগ দেন দীপালি বরঠাকুর, জয়ন্ত হাজারিকা (ভাই), রুবি হাজারিকা (বোন), খগেন মহন্ত সহ আরো অনেকে।
এই সময়ই ভূপেন হাজারিকা রচনা করেন 'নামি অহা সুন্দররে সেনা শিল্পীদল', 'প্রতিধ্বনি শুনো ময়', 'দোলা হে দোলা', 'মানুহ মানুহর বাবে', 'বিস্তীর্ণ পাররে', 'রুদ্ধ কারার দুয়ার ভাঙি', 'প্রথম নহয়, দ্বিতীয় নহয়, তৃতীয় শ্রেণির যাত্রী আমি', 'আহ আহ ওলাই আহ', সজাগ জনতা' ইত্যাদি অসংখ্য সাড়া জাগানো গান। এই সমস্ত গানেই শ্রমজীবী নিপীড়িত মানুষের মুক্তি ও প্রতিবাদের ভাষা মূর্ত হয়েছে।
১৯৬০ সালে ভাষা আন্দোলনের নামে অসমে ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়। যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্পর্কে চিড় ধরে। মৃত্যুর বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এমনই একটি পরিস্থিতিতে হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর গণনাট্যের সাথিদের নিয়ে উত্তপ্ত হিংসাশ্রয়ী অবস্থার অবসান ঘটানোর সংকল্প গ্রহণ করেন। কলকাতা থেকে ডেকে নিয়ে যান ভূপেন হাজারিকাকে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও ভূপেন হাজারিকা যৌথভাবে শিলংয়ে একটি সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ২৭ আগস্টের এই অনুষ্ঠানের অভাবনীয় সাফল্য আসে। সেখানে স্থির হয় রাজ্যের শান্তি ও সম্প্রীতির লক্ষ্যে একটি সাংস্কৃতিক স্কোয়াড গড়ে তুলে অসমের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংস্কৃতিক অভিযান সংঘটিত করা হবে। এতে প্রাথমিক উদ্যোগ গণনাট্য সংঘের থাকলেও, সংঘের বাইরের অনেক প্রথিতযশা শিল্পী যোগ দিয়েছিলেন। সেদিনের অনুষ্ঠানে অসমিয়া, বাঙালি, খাসিয়া, নেপালি শিল্পীরা সম্প্রীতির গান পরিবেশন করেন।গাওয়া হয় রবীন্দ্রনাথের গান। ভূপেন হাজারিকা অসমিয়া ও বাংলা ভাষায় পরিবেশন করেন তাঁর বিখ্যাত গান 'সাগর সঙ্গমে'। তবে সেদিনের অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছিল হেমাঙ্গ-ভূপেনের যৌথভাবে রচিত কথোপকথনমূলক গান 'হারাধন-রংমন কথা'। শিলংয়ের সেদিনের অনুষ্ঠানের পর এবং হেমাঙ্গ বিশ্বাস-ভূপেন হাজারিকার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক স্কোয়াড নানা ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি 'হারাধন-রংমন কথা' পরিবেশনের মাধ্যমে অসমের বিভিন্ন দাঙ্গা বিধ্বস্ত অঞ্চলে সাংস্কৃতিক অভিযান পরিচালনা করে শান্তি-সম্প্রীতির পরিবেশ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল।
ভূপেন হাজারিকা বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে আশির দশকে অসমে উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময়ও সামাজিক সংহতি ও সম্প্রীতির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সেই সময় তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গান – "মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র মহামিলনর তীর্থ"। ১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরিণতিতে অসমে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের দাবানল নেভাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
তিনি আফ্রিকার মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সংহতিতে অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে অভিবাদন জানিয়ে গেয়েছেন – 'জিন্দাবাদ ম্যান্ডেলা, ম্যান্ডেলা জিন্দাবাদ'। আবার নবজাতক বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে তিনি গিয়েছেন – 'জয় জয় নবজাত বাংলাদেশ, জয় জয় মুক্তিবাহিনী'।
ভূপেন হাজারিকার গান অসমের মতো বাংলায়ও ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছিল। এখানে তিনি শিল্পী হিসেবেও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁর গাওয়া বিখ্যাত গানগুলির মধ্যে রয়েছে – 'গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা', 'আমি এক যাযাবর', 'মানুষ মানুষের জন্য', 'দোলা হে দোলা', 'আজ জীবন খুঁজে পাবি', 'সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনাতে নজরুল' ইত্যাদি। এই অসাধারণ গানগুলির স্রষ্টা ছিলেন শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। ভূপেন হাজারিকাকে এ রাজ্যে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা ছিল তাঁর।
পুরস্কার ও সম্মাননা
ভূপেন হাজারিকা তাঁর শিল্পী-জীবনে অসামান্য অবদানের জন্য নানা পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'পদ্মশ্রী', 'সংগীত নাটক অকাডেমি পুরস্কার', 'দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার', 'পদ্মভূষণ', 'অসমরত্ন', 'লুইত রত্ন', 'শ্রীমন্ত শংকরদেব পুরস্কার', সহ মরণোত্তর 'পদ্মবিভূষণ' ও 'ভারতরত্ন' উপাধি। তিনি সংগীত নাটক অকাডেমির অধ্যক্ষ পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে 'ডি লিট' দিয়ে সম্মানিত করেছে। এছাড়া 'রুদালি', 'সীমানা পেরিয়ে' (বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি প্রদত্ত পুরস্কার) সহ বেশকিছু চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার জন্য তিনি নানা পুরস্কার পেয়েছেন।
ক্ষণিকের ভ্রান্তি
ভূপেন হাজারিকা সারা জীবন মানুষের জন্য, মানবতার জন্য, শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির জন্য, ঐক্য ও সম্প্রীতি জন্য এবং নতুন সমাজ গড়ার শপথ উচ্চারণ করেছেন তাঁর গানে। অথচ জীবন-পথে মুহূর্তের দোলাচলতায় তাঁর জীবন-দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী, বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও প্রগতিচেতনার বিপরীতে থাকা দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল বিজেপি'র প্রার্থী হিসেবে ২০০৪ সালে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। অসম ও বাংলাজুড়ে তাঁর একান্ত অনুরাগী ও গুণগ্রাহীরাও এই ভূমিকায় প্রচণ্ড বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হন। তখন অসম এবং বাংলার বিভিন্ন সংবাদপত্রে নিবন্ধ, চিঠিপত্রে নানা অংশের মানুষ তাঁদের ক্ষোভ ব্যক্ত করেন। সেই সময়ে 'দৈনিক অসম','অসমীয়া প্রতিদিন', 'আজি', 'অগ্রদূত', 'অসমিয়া খবর' ইত্যাদি অসমীয়া সংবাদপত্রের পাতায় চিঠিপত্রে, নিবন্ধে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। অসমের মানুষ আজন্ম প্রগতিশীল, সমাজতান্ত্রিক ও মানবতার ভাবধারায় বিশ্বাসী শিল্পীর এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেননি। তাই অনিবার্যভাবেই তিনি গুয়াহাটি লোকসভা কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছিলেন। পরে অবশ্য সংবাদ মাধ্যমে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর এই সিদ্ধান্তকে সবচেয়ে বড়ো ভুল বলে অকপটে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই সিদ্ধান্তটি তাঁর আদর্শের সঙ্গে মেলেনি। এজন্য তিনি গভীরভাবে অনুতপ্ত। শেষ পর্যন্ত তিনি ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক অধ্যায়কে একটি সাময়িক মোহ ও ভুল পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করে আবারও ফিরে আসেন তাঁর একান্ত প্রিয় সংগীত ও সংস্কৃতির ভুবনে।
এই ঘটনার পর ২০০৭ সালে অসমের বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক 'দ্য অসম ট্রিবিউন'-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কমিউনিজমের প্রতি তাঁর অনুরাগের কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছিলেন তিনি। ওই পত্রিকার সাংবাদিক বিতোপন বরবরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "কেউ রাশিয়ার পতন হয়েছে বলে অট্টহাস্য করলো বলেই কমিউনিজম শেষ হয়নি, শেষ হয়ে যায় না।... সেই মার্কসবাদের সান্নিধ্যে জীবন পাত করে আমার বিশ্বাস জন্মেছে আসল মার্কসবাদী কখনো বৃদ্ধ হন না। প্রতিজ্ঞা, অঙ্গীকার পূরণ করেও নিত্য নব নব মহিমায় উপনীত হন।"
ভূপেন হাজারিকার আত্মজীবনীতে উল্লেখ রয়েছে জ্ঞান হবার পর থেকেই পাহাড়ি মানুষদের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের কথা। তাই মাত্র তেরো বছর বয়সে তাঁর রচিত গানে ফুটে উঠেছিল বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের সঙ্গে ঐক্যের বন্ধন গড়ে বিভেদের প্রাচীর ভেঙে নতুন অসম তথা দেশ গড়ার অঙ্গীকার:
"অগ্নিযুগৰ ফিৰিঙতি মই/ নতুন অসম গঢ়িম।/ সৰ্ব্বহাৰাৰ সৰ্ব্বস্ব/ পুনৰ ফিৰাই আনিম/ নতুন অসম গঢ়িম।/
...হৰিজন, পাহাৰী, হিন্দু, মুছলিমৰ/ বড়ো, কোঁচ, চুতীয়া, কছাৰী, আহোমৰ/ অন্তৰ ভেদি মৌ বোৱাম/ ভেদাভেদৰ প্ৰাচীৰ ভাঙি/ সাম্যৰ সৰগ ৰচিম/ নতুন অসম গঢ়িম।"
(অগ্নিযুগের স্ফুলিঙ্গ আমি/ নতুন অসম গড়ব/ সর্বহারার সর্বস্ব/ আবার ফিরিয়ে আনব/ নতুন অসম গড়ব।...
হরিজন, পাহাড়ি, হিন্দু, মুসলিমের/ বোড়ো, কোঁচ, চুতিয়া, কাছারি, অহমের/ অন্তর ভেদ করে মধু বইয়ে দেব/ ভেদাভেদের প্রাচীর ভেঙে/ সাম্যের স্বর্গ রচনা করব/ নতুন অসম গড়ব।)
কৈশোরেই তিনি নিজেকে অগ্নিযুগের স্ফুলিঙ্গের সাথে তুলনা করেছেন এবং তার উত্তাপে তিনি পুরোনো জীর্ণ সমাজব্যবস্থাকে পালটে সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিসংবাদ ও শোষণমুক্ত,বিভিন্ন জাত-বর্ণের মধুর সমন্বয়ে এক প্রগতিশীল উন্নত অসম তথা দেশ গড়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তরুণ বয়সেই তাঁর মধ্যে উন্নত চেতনার দীপ্তি উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে দেখা যায়। সেই দীপ্তিই তাঁকে ভবিষ্যতের জন্য গড়ে দেয় অনন্য সৃষ্টির অভিযাত্রী রূপে।
অন্তিম বিদায়
২০১১ সালের ৫ নভেম্বর মুম্বাইয়ে এই অনন্যসাধারণ শিল্পীর জীবনের অভিযাত্রা থেমে যায়। অসমের জনমানসে মুকুটহীন সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন দু'জন বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী ভূপেন হাজারিকা এবং জুবিন গার্গ। তাঁদের প্রয়াণের পর অন্তিম যাত্রায় যেভাবে লাখো লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল গুয়াহাটির রাজপথে, তাতেই প্রতিভাত হয় অগণন মানুষ তাঁদের হৃদয়ের মণিকোঠায় কীভাবে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধার আসনে সাজিয়ে রেখেছিলেন তাঁদের প্রাণপ্রিয় দুই শিল্পীকে।
মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন ধিরুভাই আম্বানি হাসপাতালে দীর্ঘ চার মাস (২৯/৩০ জুন থেকে ৫ নভেম্বর, ২০১১) চিকিৎসাধীন থাকার পর ভূপেন হাজারিকার জীবনাবসান হয়। তাঁর প্রয়াণ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর অসমের বহু বাড়িতে প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। ৭ নভেম্বর তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় গুয়াহাটিতে। সেখান থেকে বিশাল শোভাযাত্রায় মরদেহ তাঁর নিজরাপারের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে ওই দিনই সাধারণ মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মরদেহ নিয়ে আসা হয় ঐতিহাসিক জাজেস ফিল্ডে। কাঁচের কফিনে শিল্পীর মরদেহ শায়িত রেখে মানুষকে শেষশ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়। অসমের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ আসেন তাঁদের প্রিয় শিল্পীকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে। বিপুল জনসমাগমের জন্য শেষকৃত্য একদিন পিছিয়ে দিতে হয়। ৯ নভেম্বর, ২০১১ জাজেস ফিল্ড থেকে মরদেহ শোভাযাত্রা করে নিয়ে আসা হয় গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জালুকবারি ক্যাম্পাসে,ব্রহ্মপুত্রের তীরে। এখানেই পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। পুত্র তেজ হাজারিকা উপস্থিত থেকে শিল্পীর চিতায় অগ্নিসংযোগ করেন। এই অন্তিম বিদায় মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন ভূপেন হাজারিকার অনুরাগী সংগীতপ্রেমী অগণিত মানুষ।
এই স্থানটিই পরে ভূপেন হাজারিকা সমাধিক্ষেত্র হিসেবে স্মৃতিসৌধে পরিণত হয়। শিল্পীর এই স্মৃতিসৌধে বছরের বিভিন্ন সময়ে সাধারণ মানুষ এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বরেণ্য সংগীত শিল্পী সুধাকণ্ঠ ভূপেন হাজারিকার প্রতি সম্মান জানাতে অসমের ঢোলা থেকে জন্মস্থান সদিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ৯.১৫ কিলোমিটার শিল্পী নামাঙ্কিত সেতু নির্মিত হয়। এই সেতুর উদ্বোধন হয় ১৯১৭ সালের ২৬ মে। এভাবেই জনমানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন বর্ণময় শিল্পী ডঃ ভূপেন হাজারিকা।
তাঁর গানে মূর্ত হয়েছে সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের চিরন্তন বার্তা ও প্রগতির আলোকিত পথে নিরন্তর অভিযাত্রার প্রতিধ্বনি –
"সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ/ চেতনাতে নজরুল/ যতই আসুক বিঘ্ন-বিপদ/ হাওয়া হোক্ প্রতিকূল/ একহাতে বাজে অগ্নিবীণা/ কণ্ঠে গীতাঞ্জলি/ হাজার সূর্য চোখের তারায়/ আমরা যে পথ চলি।।
এই সেই দেশ একদা যেখানে উপনিষদের ঋষি/ সমতার গান গেয়েছিল আর শুনেছিল দশ-দিশি/ প্রপিতামহের ভাষাতে আজও আমরা যে কথা বলি/ হাজার সূর্য চোখের তারায় আমরা যে পথ চলি।।
এই সেই দেশ এখনো এখানে শুনি আজানের ধ্বনি/ গীতা বাইবেল ত্রিপিটক আর শোনা যায় রামায়ণী/ কবি কালিদাস ইকবাল আর গালিবের পদাবলি/ হাজার সূর্য চোখের তারায় আমরা যে পথ চলি।"
তাঁর তীক্ষ্ণ জীবনবোধে প্রস্ফুটিত হয়েছিল সমাজ, সংসার, রাজনীতি, সমাজনীতির ভিন্ন ভিন্ন চিত্র। তাঁর গান সর্বকালের সকল মানুষের জন্য। মানবতাই তাঁর ধর্ম। বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ তাঁর গানের কথায়-সুরে সুন্দররূপে প্রকাশ পেয়েছে।
তিনি তাঁর আত্মজীবনী 'আমি এক যাযাবর'-এ স্পষ্টতই বলেছেন – "আমার সমস্ত গান রচনার মূল উদ্দেশ্য হলো – গানগুলো মানুষের গান হতে হবে।"
ভূপেন হাজারিকা লিখেছিলেন,
"প্ৰচণ্ড ধুমুহাই প্ৰশ্ন কৰিলে মোক –
: ‘তোমাৰ প্ৰাপ্য কি কোৱা?’
মনৰ দুৱাৰ মেলি নিৰ্ভীকভাৱে কʼলো –
: ‘তোমাৰ শক্তিখিনি দিয়াঁ।’
(প্রচণ্ড ঝড় আমাকে প্রশ্ন করলো/ 'তোমার প্রাপ্য কী, বলো?'/ মনের দুয়ার মেলে নির্ভীকভাবে বললাম –/ 'তোমার শক্তিটুকু দাও।')
এই গানের একেবারে শেষে তিনি উচ্চারণ করছেন: "মুমূৰ্ষু মানৱক জীৱনৰ বিদ্যুৎ/ কিঞ্চিতো যদি দিব পাৰোঁ/ আকাশ ধুমুহা আৰু বজ্ৰক/ তাৰ বাবে/ শতবাৰ প্ৰণিপাত কৰোঁ।"
("মুমূর্ষু মানবকে জীবনের বিদ্যুৎ/ কিঞ্চিৎও যদি দিতে পারি/ আকাশ ঝড় এবং বজ্রকে/ তার জন্য/ শতবার প্রণিপাত করি।")
এই গানটির মধ্য দিয়ে যেন শিল্পী ভূপেন হাজারিকার জীবনের দর্শন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি এই গানে প্রকৃতির শক্তি, আকাশের বিশালতা, ঝড়ের শক্তি, বজ্রের কণ্ঠ নিজের মধ্যে ধারণ করে মানবতার জন্য গান গাওয়ার সংকল্পের কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি এই গানে দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন, নিষ্ঠুর দানবের সমাজেও মানুষেরই গান গাইবেন। তাঁর লক্ষ্য মুমূর্ষু হতাশাগ্রস্ত মানুষদের জীবনে আশা জাগানো ও প্রাণসঞ্চার করা।
তাই তাঁর গাওয়া 'মানুহ মানুহৰ বাবে' – বাংলায় 'মানুষ মানুষের জন্য' গানটি হয়ে উঠেছে সমগ্র মানুষের গান, জীবনের গান, চিরন্তন মানবতার গান। এমনই অসংখ্য গানের মধ্য দিয়েই তিনি রাজ্য-দেশ ও দেশের সীমানা পেরিয়ে অগণিত সংগীত ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে সজীব থাকবেন অনন্তকাল।
প্রাসঙ্গিক সূত্র:
● 'আমি এক যাযাবর', ভূপেন হাজারিকা, প্রজাপতি, কলকাতা-৭০০০০৯।
● 'ভূপেন হাজরিকা', সম্পাদনা– রত্ন ওজা, অসম প্রকাশন পরিষদ, গুয়াহাটি-৭৮১০২১।
● 'ভূপেন হাজারিকা – গতির পরা আমার প্রতিনিধিলৈ', সম্পাদনা– ডঃ পরমানন্দ মজুমদার, অসম প্রকাশন পরিষদ, গুয়াহাটি -৭৮১০২১।
● 'শিল্পীযোদ্ধা হেমাঙ্গ বিশ্বাস', নির্বাচিত প্রবন্ধ ও স্বরলিপিসহ গানের সংকলন, জনমত, গুয়াহাটি-৭৮১০১১।
● 'গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা', শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা-৭০০০৭৩।
● 'বিহু, বহাগ আরু ভূপেন হাজরিকা', প্রবন্ধ, ডঃ পরমানন্দ মজুমদার, বাংলা অনুবাদ– সন্দীপ দে, ডটপেন ডট ইন ই-পত্রিকা, এপ্রিল, ২০২৬ সংখ্যা।

পরিচিতি: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক। নিবাস: শিবপুর, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ।
