স্মরণে-শ্রদ্ধায়

নবকান্ত বরুয়া: শতবর্ষ



পরমানন্দ মজুমদার


অসমের একজন প্রসিদ্ধ কবি নবকান্ত বরুয়া(১৯২৬-২০০২)-র জন্মের একশো বছর পূর্ণ হলো। বলতে গেলে স্বাধীনতার পরবর্তী কালে নবকান্ত বরুয়া অসমের কাব্যজগতে শুকতারা হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে ছিলেন। স্বাধীনতার আগে ১৯৪৩ সালে 'জয়ন্তী' পত্রিকার দ্বিতীয় পর্যায়ে অসমিয়া কাব্যে আধুনিক কবিতার ধারা বয়ে এনেছিলেন। নতুন চিন্তা, নতুন চেতনা বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তীকালের বিশ্ব পরিস্থিতি অসমিয়া কবিতায় স্থান পেতে শুরু করেছিল। ভবানন্দ দত্ত, হেম বড়ুয়া, অমূল্য বরুয়ার কবিতায় এই নতুন সুর স্পষ্ট করে ফুটে উঠেছিল। বিশেষ করে হেম বরুয়া এই নব্য কাব্যধারাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। হীরেন গোহাঁই লিখেছেন,"তাঁর থেকে (হেম বরুয়া) আগেও এবং তাঁর সঙ্গে এক সময়েই আধুনিক রীতির পথ ধরে অন্য দু'চারজনও চলতে শুরু করেছিলেন। অমূল্য বরুয়ার মতো কেউ কেউ হয়তো গন্তব্যস্থলের ধারণাও করতে পেরেছিলেন। কিন্তু শেষে দেখা গেল যে, হেম বরুয়াই এই পথে তাঁর অগ্রজ এবং সমবয়সি সবার চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পেরেছিলেন।"

প্রতিভাধর কবি

নবকান্ত বরুয়া ছিলেন হেম বরুয়ার পথ অনুসরণ করে চলা এক প্রতিভাধর কবি, যিনি ছয় দশক ধরে অসমিয়া কাব্যজগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে রেখেছিলেন। তিনি নিজেই হেম বরুয়ার সঙ্গে তাঁর সংযোগের কথা স্বীকার করে বলেছেন:
"কবিতায় আবেগের সঙ্গে যে চিন্তার সংযোগ রয়েছে, সেই ধারণাটি আমাদের মনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল হেম বরুয়ার রচনা থেকে। সেই একই সময়ে 'জয়ন্তী' পত্রিকার মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যে 'প্রগতিবাদ' নামে একটি চিন্তাধারার প্রবেশ ঘটে। ...আমরা হেম বরুয়াকে আমাদের এক ধরনের নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম – এবং মেনে নিয়েছিলাম ভবানন্দ দত্তকেও। তাঁদের চিন্তাধারার মধ্যে পার্থক্যের আভাস পরবর্তী সময়ে পেলেও তার দ্বারা প্রভাবিত হইনি। ...হেম বরুয়ার নেতৃত্ব ছিল কিছুটা অন্য ধরনের। তিনি আমাদের তাঁর অনুগামী হতে শেখাননি, বলেননি যে তাঁর পথই একমাত্র পথ; ...মার্কস এবং ফ্রয়েড – দু'জনেই তাঁর কবিতায় পাশাপাশি না হলেও মুখোমুখি অবস্থান করতেন। তিনি যেন আমাদের হাতে পতাকা তুলে দিয়ে বলেছিলেন, 'নিজের পথে এগিয়ে চলো'; নিজের প্রদীপের শিখা দিয়ে আমাদের প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে বলেছিলেন – 'নিজের পথ খুঁজে নাও।' "

হ্যাঁ, নবকান্ত বরুয়া নিজের পথ খুঁজে নিয়েছিলেন এবং সেই পথ ধরেই এগিয়ে গিয়েছিলেন। 'জয়ন্তী' পত্রিকার পাতাতেই তিনি তাঁর প্রথম কবিতাটি লিখেছিলেন:
"আমিতো নাপালো হায় পৃথিৱীৰ প্ৰথম যৌৱন/অৰণ্যৰ সেউজী সুৰভি।" ('আমরা তো পেলাম না হায় পৃথিবীর প্রথম যৌবন, অরণ্যের সবুজ সৌরভ')

ভবানন্দ দত্তের মতে, এটি ছিল "গভীর প্রাণের রোমান্টিক সুর। সেই সুরই তাঁর জীবন-উপলব্ধির ক্ষেত্রে বিষাদ ও হতাশার সুর মিশিয়ে দিয়েছে।" অবশ্য তিনি এ কথাও বলেছেন, "কিন্তু তাঁর জীবনদৃষ্টি গভীর; জীবনের প্রতি মমতা এবং জগতের প্রতি আত্মীয়তা নিবিড়।"

'জয়ন্তী'র কাব্যধারা পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল হেম বরুয়ার সম্পাদনায় স্বাধীনতার এক বছর পর প্রকাশিত, মাত্র এক বছর আয়ুসম্পন্ন মাসিক পত্রিকা 'পছোয়া'-য়। 'পছোয়া'র সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি ছিলেন নবকান্ত বরুয়া।

সেখানেই তিনি লিখেছিলেন 'অপটিমিজম' কবিতাটি –
"অসম্ভৱ বসুন্ধৰা।তেজৰ তেলেৰে চলে
জীৱনৰ কল। অবিশ্ৰান্ত যন্ত্ৰণাৰ
অশ্লীল বৰ্বৰতাৰ, আমাৰ স্থিতিৰ গান।
সিঁহতৰ যঁতৰৰ বীভৎস স্পন্দনে কাটে
আমাৰ স্থিতিৰ সূতা,সৰু সৰু অসংখ্য মৃত্যুৰে;
হেজাৰ হেজাৰ আধা-জীৱনৰ মণি
তাতে বুৰঞ্জীয়ে গুঁঠি যায়...
পাণ্ডুৰ প্ৰতীক তাৰ সৃষ্টিৰ লজিক।"

(অসম্ভব বসুন্ধরা। রক্তের তেলে চলে
জীবনের কল। অবিশ্রান্ত যন্ত্রণার,
অশ্লীল বর্বরতার, আমাদের অস্তিত্বের গান।
তাদের জাঁতার বীভৎস স্পন্দনে কেটে যায়
আমাদের অস্তিত্বের সুতো, ছোটো ছোটো অসংখ্য মৃত্যুর মধ্য দিয়ে;
হাজার হাজার অর্ধজীবনের মণি
সেখানেই ইতিহাস গেঁথে চলে...
পাণ্ডুর প্রতীক তার সৃষ্টির লজিক)

'পছোয়া'র পাতাতেই ধ্বনিত হয়েছিল নবকান্ত বরুয়ার পৃথিবীর কবি হওয়ার স্বপ্ন – হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে, বাটালি দিয়ে গড়ার প্রতিজ্ঞা –
"আমি পৃথিবীৰ কবি
আমি পৃথিবীৰ কবি
জীয়াই থকাৰ ছদ্মৱেশেৰে আমি
জীৱনৰ মিঠা বিহৰ বুকুত
ৰচি যাম বিস্বাদ অমৃতৰ কবিতা
অহেতুক আনন্দৰ বেদনা নহয়
জীৱনৰ বন্দনা।
হাতুৰিৰে ভাঙি বটালিৰে ফিৰিঙ্গতি ছিটিকাই
আমিও জীয়াই থাকিম
সলনিৰ স'তে সবল সন্ধি কৰি।"(বুদ্ধ পূৰ্ণিমা)

(আমরা পৃথিবীর কবি
আমরা পৃথিবীর কবি
বেঁচে থাকার ছদ্মবেশে আমরা
জীবনের মধুর বিষের বুকে
রচনা করে যাব বিস্বাদ অমৃতের কবিতা
 অহেতুক আনন্দের বেদনা নয়,
জীবনের বন্দনা।
হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে, বাটালি দিয়ে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে
আমরাও বেঁচে থাকব,
পরিবর্তনের সঙ্গে সবল সন্ধি করে)

পরিবর্তনের সঙ্গে সবল সন্ধি করা নবকান্ত বরুয়া 'চাওতালী নাচ' কবিতায় সমুদ্রের স্বপ্ন দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর চোখে এই নাচ ছিল সমুদ্রের চেয়েও লাবণ্যময় –
"মাটিৰ বুকুৰ শিশু
পাহাৰৰ হাড়ৰ জীয়ৰী
ক'ত বাৰু সাগৰৰ সপোন দেখিলি
হেৰ মোৰ মৰমৰ,খোপাত কেতেকী ফুল
কলীয়া শিলেৰে গঢ়া
চাওতালী গাভৰু ছোৱালী

......

সপোনৰ ঢৌ
সাগৰৰ ঢৌ জানো ইমান লাৱনী?
পছোৱাৰ পাততে প্ৰকাশ পালে কবিৰ জীৱন-জিজ্ঞাসাৰ আকুতি –
আশা কৰা নেকি বন্ধু
তোমাৰ বাক্যৰ পৰা বুৰঞ্জীয়ে কবিতা শুনাৰ
অনাগত মানুহৰ জীৱন সভাত;
কথাৰ শিলেৰে গাঁথি চীনৰ প্ৰাচীৰ
আমি চিৰন্তন হ'ম?...
কথাৰ শিলেৰে আমি নগঢ়ো প্ৰাচীৰ
স্থিতিৰ গীতেৰে গঢ়ো
সুৰৰ সৰণি।"(যোগসূত্ৰ)

(মাটির বুকের শিশু
পাহাড়ের হাড়ের কন্যা
কোথায় বলো সাগরের স্বপ্ন দেখলে?
ও আমার আদরের, খোঁপায় কেতেকী ফুল
কালো পাথরে গড়া
সাঁওতালি তরুণী মেয়ে...

স্বপ্নের ঢেউ –
সাগরের ঢেউ কি এতই লাবণ্যময়?)

'পছোয়া'র পাতাতেই প্রকাশিত হয়েছিল কবির জীবন-জিজ্ঞাসার আকুলতা –
"আশা কৰা নেকি বন্ধু
তোমাৰ বাক্যৰ পৰা বুৰঞ্জীয়ে কবিতা শুনাৰ
অনাগত মানুহৰ জীৱন সভাত;
কথাৰ শিলেৰে গাঁথি চীনৰ প্ৰাচীৰ
আমি চিৰন্তন হ'ম?...
কথাৰ শিলেৰে আমি নগঢ়ো প্ৰাচীৰ
স্থিতিৰ গীতেৰে গঢ়ো
সুৰৰ সৰণি।" (যোগসূত্ৰ)

(আশা করো কি বন্ধু,
তোমার বাক্য থেকে ইতিহাস কবিতা শুনবে
অনাগত মানুষের জীবনসভায়;
কথার পাথর দিয়ে চিনের প্রাচীর গেঁথে
আমরা কি চিরন্তন হব?...

কথার পাথর দিয়ে আমরা প্রাচীর গড়ি না,
অস্তিত্বের গান দিয়ে গড়ি
সুরের সরণি)

'পছোয়া'র পাতাতেই তিনি 'সীমা দত্ত' ছদ্মনামে লিখেছিলেন 'এন্ধাৰ ৰাতিৰ ইলিজী' (অন্ধকার রাতের এলিজি)।

এর পরবর্তী সময়টি নবকান্ত বৰুৱার কাব্যজীবনের স্বর্ণময় কাল। তাঁর প্রথম ক্ষুদ্রাকৃতির কাব্যগ্রন্থ 'হে অরণ্য, হে মহানগর' প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে। এই দশকেই প্রকাশিত হয় তাঁর আরও তিনটি কাব্যগ্রন্থ – 'এটি দুটি এঘারটি তারা' (১৯৫৭), 'এখন স্বচ্ছ মুখারে' (১৯৬০) এবং 'যতি আরু কেইটামান' (১৯৬০)।

এর পরের দশকে প্রকাশিত হয় তাঁর বহুল আলোচিত দুটি কাব্যগ্রন্থ – 'সম্রাট' (১৯৬২) এবং 'রাবণ' (১৯৬৩)।

এর পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যসংকলনগুলি হলো – 'মোর আরু পৃথিবীর' (১৯৭৩), 'রত্নাকর' (১৯৮৬), 'সূৰ্যমুখীর অঙ্গীকার' (১৯৯০) এবং 'দলঙত তামীঘরা' (১৯৯১)।

এই গ্রন্থগুলিতে সংকলিত 'মনত পরেনে অরুন্ধতী', 'ইয়াত নদী আছিল', 'পলস', 'রাবণ', 'মহাকাব্যর পাণ্ডুলিপি' প্রভৃতি কবিতা কাব্যরসিকদের কাছে অসমিয়া কাব্যসাহিত্যের অনন্য সৃষ্টি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। কবিতা সম্পর্কে তাঁর গভীর চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর লেখা দুটি গদ্যগ্রন্থে – 'অসমীয়া ছন্দ শিল্পর ভূমিকা' (১৯৫৮) এবং 'কবিতার দেহ বিচার' (১৯৮৭)।

শিশু সাহিত্যে নবকান্ত বরুয়া

নবকান্ত বরুয়ার বিচরণক্ষেত্র কেবল কবিতার জগতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন অসমের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিশুসাহিত্যিক। শিশুদের মনস্তত্ত্ব তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই লিখতে পেরেছিলেন 'শিয়ালি পালেগৈ রতনপুর' (১৯৫৫), 'ভত উকারে ভু' (১৯৬০), 'আখরর জখলা' (১৯৫৮), 'মই টুনীয়ে টুন টুনালো' (১৯৮১), 'গোলাপ আরু বেলিফুল' (১৯৮১) এবং 'কিশোর রামায়ণ' (১৯৮৭)-এর মতো শিশুদের মন ছুঁয়ে যাওয়া বই। শিশুদের কবিতার একটি দুর্লভ সংকলনও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। সেটি হলো 'মরুয়া ফুল' (১৯৮৪)।

গীতিকার নবকান্ত বরুয়া

নবকান্ত বরুয়া ছিলেন একজন প্রখ্যাত গীতিকার। তাঁর অনেক গান বীরেন্দ্রনাথ দত্তের কণ্ঠ ও সুরে মুখরিত হয়ে অসমিয়া সংগীতজগতে সমৃদ্ধি এনে দিয়েছে। 'ধুন ধুন ধুনীয়া মোর অকণমাণি', 'বহাগর দুপরীয়া', 'আকাশে বতাহে ইমান সুরর গুঞ্জন', 'আহিনক কোনে মাতে' প্রভৃতি গানের সুর অসমিয়াদের বিহ্বল করে রেখেছে। এ ছাড়াও ভূপেন হাজরিকা তাঁর 'নিয়রে ফুল এপাহ ফুলিল এপাহ সরিল কেনি' গানটি প্রাণঢেলে গেয়ে নবকান্তের সৃষ্টির মহত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। দ্বিপেন বরুয়া তাঁর 'এখন নেদেখা নদীর সীপারে' গানটি গেয়ে বহু শ্রোতার মন জয় করেছেন। দিলীপ শর্মা ও সুদক্ষিণা শর্মা 'এই আকাশ এখন মরু' এবং 'কমলা কুঁয়রী পানী কিমানে হ'ল' গান দুটি দ্বৈতকণ্ঠে পরিবেশন করে আধুনিক অসমিয়া সংগীতকে মহিমান্বিত করেছেন।

ঔপন্যাসিক নবকান্ত বৰুৱা

নবকান্ত বরুয়ার আরও দুটি পরিচয় আমাদের বিস্মিত করে। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত অসমিয়া ঔপন্যাসিক। এক ব্যতিক্রমী মনন ও চিন্তাভাবনার সাহায্যে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিজ্ঞানকে নিজের উপলব্ধির আলোয় উপন্যাসে তুলে ধরে তিনি অসমিয়া উপন্যাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন বলে বলা যায়। কবিতা চর্চার কিছু পরেই, ১৯৫২ সালে তিনি লিখেছিলেন 'কপিলীপরীয়া সাধু'। তাঁর বন্ধু সাংবাদিক তিলক হাজরিকা লিখেছেন, একবার কলেজের ছুটিতে নগাঁওয়ে গিয়ে ধরমতুল থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল কপিলী নদীর ভয়াবহ বন্যার কারণে। এক দিস্তা কাগজ নিয়ে এসে মাত্র তিন দিনের মধ্যে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে তিনি কপিলীর সেই ভয়াবহ বন্যার কথায় ফিরে গিয়েছিলেন। তিন দিনেই রচনা করেন কেউ লিখে না যাওয়া সেই সত্যকাহিনি।

এর প্রায় দুই দশক বিরতির পর তিনি লেখেন 'ককাদেউতার হাড়' (১৯৭৩)। এই উপন্যাসটির জন্যই তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার অর্জন করেন।

এর পর প্রকাশিত তাঁর উপন্যাসগুলি হলো – 'গরমা কুঁয়রী' (১৯৮০), 'মানুহ আটাইবোর দ্বীপ' (১৯৮০), 'অ-পদাৰ্থ' (১৯৮১) এবং 'পটাচরা' (১৯৮৭)। প্রতিটি উপন্যাসেই তাঁর আখ্যানরীতির বিন্যাস এবং দৃষ্টিভঙ্গির স্বকীয়তা প্রকাশ পেয়েছে।

অনুবাদক নবকান্ত বরুয়া

নবকান্ত বরুয়া অনূদিত সাহিত্যকর্মগুলির প্রতিটিই দিকদর্শী সাহিত্য। দেশি-বিদেশি বহু মূল্যবান গ্রন্থ তিনি অসমিয়ায় অতি সুন্দর অনুবাদ করেছেন।

তিনি ছিলেন রবীন্দ্র অনুরাগী। শান্তিনিকেতনে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করার সময় তিনি রবীন্দ্রনাথের বিপুল সাহিত্যসম্ভারের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন। রবীন্দ্রনাথের রচনার দুটি সংকলন তিনি অসমিয়ায় অনুবাদ করেছিলেন। গ্রন্থ দুটি হলো – 'বিশ্বমানবর অভিমুখে' এবং 'মুক্তধারা'। রবীন্দ্রসংগীতের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। বহু রবীন্দ্রসংগীত তিনি অসমিয়া ভাষার নিজস্ব রীতিতে অত্যন্ত সুমধুরভাবে অনুবাদ করেছিলেন। বীরেন্দ্রনাথ দত্ত, দিলীপ শর্মা, মৃদুলা দাস, পুলক ব্যানার্জি , ঋজুশ্রী শর্মা মজুমদার প্রমুখ শিল্পী তাঁর অনূদিত বেশ কয়েকটি গান রেকর্ড, সিডি এবং আকাশবাণীর গুয়াহাটি কেন্দ্রে ধারণ করেছিলেন।

অন্যদিকে, ক্ষিতিমোহন সেনের 'হিন্দু-মুছলমানর যুক্ত সাধনা' গ্রন্থটিও তিনি অসমিয়ায় অনুবাদ করেছিলেন। সাহিত্য অকাদেমি তাঁর অনূদিত 'নজরুল ইছলামৰ কবিতা' প্রকাশ করেছে। বিদেশি সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য অনুবাদ হলো রুশ কবি পুশকিনের কবিতা 'আহত মরাল' এবং গ্যেটের বিখ্যাত রচনা 'ফাউস্ট'। সাহিত্য অকাদেমি তাঁর অনূদিত 'ওয়াল্ট হুইটমেনর এশ কবিতা' গ্রন্থটিও প্রকাশ করেছে। তাঁর একটি হৃদয়স্পর্শী ভ্রমণকাহিনিও রয়েছে। বইটির নাম 'দেশে দেশে মোর দেব' (১৯৮৯)।

অসমিয়া সাহিত্যের এই প্রখ্যাত কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও শিশুসাহিত্যিক নবকান্ত বরুয়া ২০০২ সালে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর জন্মশতবর্ষে অসম তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে। আমরাও তাঁর প্রতি জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য।


[মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ: সন্দীপ দে]

পরিচিতি: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, চিন্তাশীল লেখক, গ্রন্থ প্রণেতা। নিবাস: গুয়াহাটি, অসম।