শরীর-স্বাস্থ্য ও মন

মন ভালো রাখার সহজ বিজ্ঞান: শরীরচর্চা, পুষ্টি, হ্যাপি হরমোন ও ইতিবাচক জীবনযাপন



ডঃ তমোঘ্নী মান্না


সুখ, আনন্দ ও মানসিক প্রশান্তি মানুষের সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যস্ততা, কাজের চাপ, ব্যক্তিগত সমস্যা, ঘুমের অভাব ও অনিয়মিত জীবনযাত্রায় মন খারাপ বা উৎসাহ কমে যেতে পারে। 'হ্যাপি হরমোন' কথাটি প্রচলিত হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে এটি শুধু হরমোন নয়; নিউরোট্রান্সমিটার, নিউরোপেপটাইড ও হরমোনের জটিল কার্যকলাপের সঙ্গে আনন্দ, প্রেরণা, আবেগ ও সামাজিক বন্ধনের সম্পর্ক রয়েছে।

চারটি প্রধান 'হ্যাপি কেমিক্যাল': সেরোটোনিন – মেজাজ, ঘুম, ক্ষুধা, ব্যথা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। ডোপামিন – প্রেরণা, লক্ষ্যপূরণ, পুরস্কার-সম্পর্কিত শেখা ও প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত। অক্সিটোসিন – সামাজিক বন্ধন, বিশ্বাস, মাতৃত্ব, প্রসব ও স্তন্যদানে ভূমিকা রাখে। এন্ডোরফিন – শরীরের নিজস্ব ওপিওয়েড পেপটাইড; ব্যথা কমাতে এবং কিছু পরিস্থিতিতে স্বস্তির অনুভূতিতে সাহায্য করে। চারটির কাজ আলাদা হলেও তারা পরস্পর-সম্পর্কিত স্নায়বিক ব্যবস্থায় কাজ করে।

নিয়মিত ব্যায়াম

ব্যায়াম পেশি, হাড় ও হৃদ্যন্ত্রের পাশাপাশি মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা উদ্বেগ কমাতে, ঘুমের মান উন্নত করতে ও মন ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটা দিয়ে শুরু করা যায়; পরে দ্রুত হাঁটা, হালকা জগিং, সাইকেল চালানো বা নাচ যোগ করা যায়। ব্যায়ামের সময় এন্ডোরফিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। যোগব্যায়াম, ধ্যান ও নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস কিছু মানুষের উত্তেজনা ও চাপ কমাতে সাহায্য করে; তবে কোনো নির্দিষ্ট কৌশল সরাসরি নির্দিষ্ট 'হ্যাপি হরমোন' বাড়ায় – এমন নিশ্চয়তা নেই।

পর্যাপ্ত ঘুম

ঘুম আবেগ নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতি, মনোযোগ ও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঘুমের অভাবে বিরক্তি, উদ্বেগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা হতে পারে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো-ওঠা, প্রাপ্তবয়স্কদের ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমের সুযোগ রাখা, শোবার শান্ত-অন্ধকার ঘর, বিকেল-সন্ধ্যায় ক্যাফেইন সীমিত করা এবং দিনের বেলা সক্রিয় থাকা উপকারী।

সুষম খাদ্য

মস্তিষ্কের জন্য শক্তি, অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন, খনিজ ও প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড দরকার। কোনো একটি খাবার খেলেই সঙ্গে সঙ্গে সুখের রাসায়নিক বেড়ে যায় – এমন প্রমাণ নেই। ট্রিপটোফ্যান – সেরোটোনিন তৈরির পূর্বসূরি। এর উৎস দুধ, দই, ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, শিম, বাদাম, বীজ, ভাত, আটার রুটি, ওটস, ডাল। মাছ, আখরোট, তিসি ও চিয়া বীজ ওমেগা-৩-এর উৎস। ভিটামিন বি৬, বি১২, ফোলেট, আয়রনসহ পুষ্টি উপাদান স্বাভাবিক স্নায়বিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় ও সামাজিক বন্ধন

পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী ও প্রিয়জনের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক একাকিত্ব ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। মনখুলে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়া, হাঁটা, আনন্দদায়ক কাজ করা, অনুভূতি প্রকাশ, অন্যের কথা শোনা ও প্রয়োজনে সাহায্য করা উপকারী। অক্সিটোসিন সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হলেও ভালোবাসা ও বিশ্বাস কেবল অক্সিটোসিনের ওপর নির্ভর করে না। সামাজিক চাহিদা ব্যক্তিভেদে আলাদা; নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।

ছোট ছোট লক্ষ্য ও ডোপামিন

ডোপামিন প্রেরণা, পুরস্কার-সম্পর্কিত শেখা ও প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত। বড় লক্ষ্যকে ছোট ভাগে ভাগ করা, কাজ শেষের অগ্রগতি লিখে রাখা, নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা কমানো এবং বই পড়া, গান, ছবি আঁকা, বাগান বা নতুন দক্ষতার মতো আনন্দদায়ক কাজের জন্য সময় রাখা সহায়ক হতে পারে। তবে কাজ সম্পন্ন করলেই ডোপামিন নির্দিষ্ট পরিমাণে বাড়বে – এমন সরল নিয়ম নেই।

সূর্যালোক ও প্রকৃতির সংস্পর্শ

দিনের আলো ও প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো মানসিক স্বস্তি এবং দৈনিক জৈবঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। সকালে হাঁটা, বারান্দা/বাগানে বসা, গাছের পরিচর্যা বা পার্কে সময় কাটানো যেতে পারে। সূর্যালোককে সেরোটোনিন বাড়ানোর নিশ্চিত পদ্ধতি মনে করা উচিত নয় এবং অতিরিক্ত রোদ ও ত্বকের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দরকার।

ধ্যান, কৃতজ্ঞতা ও ইতিবাচক চিন্তা

মাইন্ডফুলনেসে বর্তমান মুহূর্তের চিন্তা, অনুভূতি ও শারীরিক সংবেদনকে বিচার না করে লক্ষ্য করা হয়। প্রতিদিন ৫ মিনিট শান্তভাবে বসে স্বাভাবিক শ্বাসে মনোযোগ দেওয়া এবং মন সরে গেলে আবার ফিরিয়ে আনা দিয়ে শুরু করা যায়। এটি কোনো হরমোন বাড়ানোর নিশ্চিত পদ্ধতি নয়, বরং মনোযোগ ও চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। প্রতিদিন তিনটি কৃতজ্ঞতার বিষয় লিখে রাখা ইতিবাচক অভিজ্ঞতা লক্ষ্য করতে সাহায্য করতে পারে। তবে, দুঃখ বা হতাশার মতো আবেগ অস্বীকার করার নয়। নেতিবাচক চিন্তার সময় বাস্তব তথ্য, বিকল্প ব্যাখ্যা, ছোট পরবর্তী পদক্ষেপ ও অন্যকে কী পরামর্শ দিতাম – এসব ভাবা যেতে পারে। গুরুতর সমস্যায় প্রশিক্ষিত পেশাদারের সাহায্য প্রয়োজন।

গান, হাসি, সৃজনশীলতা ও আনন্দ

গান শোনা, গান করা, নাচ, ছবি আঁকা, রান্না, লেখালেখি বা পছন্দের সৃজনশীল কাজ চাপ থেকে সাময়িক বিরতি ও আনন্দ দিতে পারে। পছন্দের সংগীত আবেগ, স্মৃতি ও পুরস্কার-সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অঞ্চল সক্রিয় করতে পারে। বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে হাসি-আনন্দও সহায়ক হতে পারে; তবে কাউকে জোর করে হাসতে বা সবসময় ইতিবাচক থাকতে বলা উচিত নয়।

অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ

দীর্ঘস্থায়ী চাপ ঘুম, ক্ষুধা, মনোযোগ ও আবেগে প্রভাব ফেলে এবং কর্টিসলসহ স্ট্রেস-সম্পর্কিত হরমোনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তাই শুধু 'হ্যাপি কেমিক্যাল' নয়, চাপের উৎসও চিহ্নিত করা জরুরি। কাজের তালিকা, বিরতি, প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়া, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব নেওয়া, বিশ্রাম ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা কার্যকর কৌশল।

প্রতিদিনের সহজ সুখকর জীবনযাপনের পরিকল্পনা

সকাল ৭-৮টা: ঘুম থেকে ওঠা, দিনের আলো ও ১৫-২০ মিনিট হাঁটা/হালকা ব্যায়াম। সকাল ৮-৯টা: সুষম প্রাতরাশ ও দিনের কাজের পরিকল্পনা। দুপুর ১-২টা: পুষ্টিকর খাবার, ও প্রয়োজনে বিরতি। বিকেল ৪-৬টা: পছন্দের শারীরিক কার্যকলাপ, পরিবার/বন্ধু বা সৃজনশীল কাজ। সন্ধ্যা ৭-৯টা: কাজের চাপ থেকে বিরতি, রাতের খাবার ও পরিবারের সঙ্গে কথা। রাত ৯-১০টা: পরদিনের প্রস্তুতি। পর্যাপ্ত ঘুম, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত ৭-৯ ঘণ্টা জরুরি।

যে অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলা উচিত

অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও অন্যের সঙ্গে অযথা তুলনা কমানো উচিত। সন্ধ্যা/রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইন ঘুম নষ্ট করতে পারে। অ্যালকোহল ও অন্যান্য মাদককে মানসিক চাপ কমানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। সেরোটোনিন বা ডোপামিন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নিজে থেকে ওষুধ/সাপ্লিমেন্ট নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। অতিরিক্ত ব্যায়াম ক্লান্তি, আঘাত ও পুনরুদ্ধারের সমস্যা তৈরি করতে পারে; ধীরে মাত্রা বাড়ানো ও বিশ্রাম জরুরি।

কখন পেশাদার সাহায্য নেওয়া জরুরি?

দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে অধিকাংশ সময় মন খারাপ, আগের পছন্দের কাজে আগ্রহ কমে যাওয়া, ঘুমের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, ক্ষুধা/ওজনের অনিচ্ছাকৃত পরিবর্তন, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা, নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া বা দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা থাকলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত। বিষণ্নতা চিকিৎসাযোগ্য; প্রয়োজনে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও চিকিৎসকের নির্দেশিত ওষুধ কার্যকর হতে পারে। আত্মহত্যা বা নিজের ক্ষতি করার চিন্তা হলে দ্রুত বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে জানিয়ে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে। সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন একে অপরের পরিপূরক। প্রতিদিনের ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই ধীরে ধীরে তৈরি করতে পারে আরও প্রাণবন্ত, ভারসাম্যপূর্ণ ও আনন্দময় জীবন।

পরিচিতি: অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ক্রীড়া বিজ্ঞানী।