পরিবেশ ও বিজ্ঞান

পরিবেশ: আমাদের বেঁচে থাকার ঠিকানা



নরেশ মণ্ডল


মানুষের সভ্যতার ইতিহাস প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কের ইতিহাসও। পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের পর দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে বেঁচেছে। নদী তাকে জল দিয়েছে, মাটি দিয়েছে খাদ্য, অরণ্য দিয়েছে আশ্রয় ও নানা প্রয়োজনীয় উপাদান। বৃষ্টি, ঋতু, গাছপালা, পশুপাখি — সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতিই ছিল মানুষের জীবনের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে মানুষ প্রকৃতিকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাতে শুরু করেছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভোগের প্রসার মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে পরিবেশের ওপর তৈরি করেছে প্রবল চাপ। আজ পরিবেশের সঙ্কট আর কেবল প্রকৃতির সমস্যা নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

পরিবেশ বলতে শুধু গাছপালা, নদী বা অরণ্যকে বোঝায় না। বায়ু, জল, মাটি, জীবজগৎ, জলাভূমি, সমুদ্র, অরণ্য এবং মানুষের তৈরি বসতি — সব মিলিয়েই আমাদের পরিবেশ। এই উপাদানগুলি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি নদী দূষিত হলে তার প্রভাব শুধু নদীর জলে সীমাবদ্ধ থাকে না; মাছ, জলজ উদ্ভিদ, কৃষি, মানুষের স্বাস্থ্য এবং নদীনির্ভর জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অরণ্য ধ্বংস হলে শুধু গাছের সংখ্যা কমে না, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও নষ্ট হয়, মাটির ক্ষয় বাড়ে এবং জলচক্রেও পরিবর্তন আসে।

বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম বড় পরিবেশগত সমস্যা হলো বায়ুদূষণ। বিশেষ করে বড় শহরগুলিতে যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজের ধুলো, বর্জ্য পোড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাতাসের মানকে খারাপ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বায়ুদূষণকে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ফলে পরিষ্কার বাতাস কেবল আরাম বা সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত।

জলদূষণের সমস্যাও কম গুরুতর নয়। নদী, পুকুর, খাল এবং জলাভূমিতে অপরিশোধিত নিকাশি, শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক জমতে থাকলে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ভারতের বহু নদী দীর্ঘদিন ধরে দূষণের সঙ্গে লড়ছে। বাংলার ক্ষেত্রেও নদী ও জলাভূমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা ও তার আশপাশের পূর্ব কলকাতা জলাভূমি শুধু শহরের একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি বর্জ্যজল পরিশোধন, মাছচাষ এবং কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ ব্যবস্থা। তাই জলাভূমি ভরাট করে নির্মাণ করা মানে শুধু জমির চরিত্র বদলানো নয়, একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়া।

প্লাস্টিকের ব্যবহার পরিবেশের ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি করেছে। প্লাস্টিক সস্তা, হালকা এবং ব্যবহারিক হওয়ায় দৈনন্দিন জীবনে তার ব্যবহার ব্যাপক। কিন্তু একবার ব্যবহারের পর অনেক প্লাস্টিক যথাযথভাবে সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার করা হয় না। তা নালা, নদী এবং সমুদ্রে পৌঁছে যায়। প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণাও পরিবেশে দীর্ঘ সময় থেকে যেতে পারে। তাই সমস্যার সমাধান শুধু নিষেধাজ্ঞায় নয়; ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহার এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যেও রয়েছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। শহর যত বড় হচ্ছে, মানুষের ব্যবহার ও ভোগ যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে কঠিন বর্জ্যের পরিমাণ। রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য, কাগজ, কাচ, ধাতু, প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য — সবকিছুকে একইভাবে ফেলে দিলে সমস্যা আরও বাড়ে। বর্জ্যকে উৎসস্থলেই আলাদা করা, জৈব বর্জ্য থেকে সার তৈরি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস পুনরায় কাজে লাগানো এবং ক্ষতিকর বর্জ্য আলাদাভাবে প্রক্রিয়াকরণ করা পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পরিবেশ রক্ষায় গাছের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই, তবু বাস্তবে আমরা প্রায়ই তা ভুলে যাই। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ ছায়া দেয়, কার্বন শোষণে সাহায্য করে, বহু প্রাণীর আবাস তৈরি করে এবং শহরের তাপ কমাতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু নগরায়ণের চাপে রাস্তা, বাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন ও অন্যান্য নির্মাণের জন্য নির্বিচারে গাছ কাটা হয়। বৃক্ষরোপণ অবশ্যই দরকার, কিন্তু একটি পুরানো গাছ কেটে তার বদলে কয়েকটি নতুন চারা লাগালেই পরিবেশগত ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ হয় না। তাই নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান বড় গাছ সংরক্ষণ জরুরি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্ন। পৃথিবীতে অসংখ্য উদ্ভিদ, পাখি, কীটপতঙ্গ, মাছ ও অন্যান্য প্রাণী রয়েছে, যাদের প্রত্যেকেরই পরিবেশ ব্যবস্থায় কোনও না কোনও ভূমিকা আছে। কোনও একটি প্রজাতির সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের অন্য অংশেও পড়তে পারে। বন ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট, অতিরিক্ত শিকার, দূষণ এবং আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার ফলে বহু প্রজাতি আজ বিপন্ন। মানুষের উন্নয়ন যদি অন্য প্রাণীর বেঁচে থাকার অধিকারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত সেই উন্নয়নও বেশিদিন ঠিকে থাকতে পারে না।

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান পরিবেশ সঙ্কটকে আরও গভীর করেছে। শিল্পবিপ্লবের পর বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়েছে। এর সঙ্গে পৃথিবীর উষ্ণায়নের সম্পর্ক বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো নানা পরিবর্তন মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করছে। ভারতও এর বাইরে নয়। কৃষি, জলসম্পদ, উপকূলীয় অঞ্চল এবং শহুরে জীবন — সব ক্ষেত্রেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

জলবায়ু সঙ্কটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক বৈষম্য। পরিবেশের ক্ষতি সবাইকে সমানভাবে আঘাত করে না। যে মানুষ নদী, কৃষিজমি, বন বা সমুদ্রের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল, তার জীবনে পরিবেশগত পরিবর্তনের অভিঘাত অনেক বেশি হতে পারে। নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে দূষিত পরিবেশ থেকে নিজেদের রক্ষা করাও অনেক সময় কঠিন। তাই পরিবেশ রক্ষাকে সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে।

কৃষিক্ষেত্রেও পরিবেশের ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটির স্বাভাবিক গুণ নষ্ট করতে পারে এবং জলাশয়ে দূষণ বাড়াতে পারে। মাটিকে কেবল ফসল উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে জীবন্ত সম্পদ হিসেবে রক্ষা করা দরকার। জৈব পদার্থের ব্যবহার, ফসলের বৈচিত্র্য এবং জলসাশ্রয়ে কৃষিপদ্ধতি এই ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

বাংলার সুন্দরবন পরিবেশ ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার এক অনন্য উদাহরণ। ম্যানগ্রোভ অরণ্য উপকূলকে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন এবং জীবিকার সঙ্কট সুন্দরবনের মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই সুন্দরবন রক্ষা মানে শুধু একটি অরণ্য রক্ষাই নয়; একটি বৃহৎ জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনব্যবস্থাকে রক্ষা করা।

শব্দদূষণকেও পরিবেশের আলোচনায় গুরুত্ব দিতে হবে। যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজ এবং অতিরিক্ত শব্দ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অস্বস্তি তৈরি করে। শান্ত ও সুস্থ পরিবেশও মানুষের জীবনমানের অংশ। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন বন্ধ করে দেওয়া কোনও সমাধান নয়। মানুষের জন্য বাড়ি, রাস্তা, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, শিল্প এবং কর্মসংস্থান দরকার। কিন্তু উন্নয়নের ধরনটি হতে হবে পরিবেশ-সচেতন। একটি রাস্তা তৈরি করার আগে তার পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা, শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা, শহরে পর্যাপ্ত সবুজ ও জলাভূমি রাখা এবং জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা — এসবই পরিকল্পিত উন্নয়নের অংশ হওয়া উচিত।

পরিবেশ রক্ষায় প্রযুক্তিও ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, শক্তিসাশ্রয়ী যন্ত্র এবং দূষণ পরিমাপের আধুনিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব। তবে প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন তার সঙ্গে থাকবে সঠিক পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সদিচ্ছা এবং নাগরিকের সচেতনতা।

পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন তাই কেবল গাছ লাগানোর আন্দোলন নয়; এটি আমাদের জীবনদর্শন বদলের আন্দোলন। প্রকৃতির সম্পদ সীমাহীন নয় — এই সহজ সত্যটি মেনে নিয়েই আগামী দিনের পরিকল্পনা করতে হবে। আজ যে সিদ্ধান্ত আমরা নেব, তার ফল ভোগ করবে আগামী দিনের মানুষ। তাই এখনই সচেতন হওয়াই সবচেয়ে জরুরি। এটাই আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।

পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সরকারের যেমন, সাধারণ মানুষেরও তেমন। আইন তৈরি এবং তার যথাযথ প্রয়োগ জরুরি, কিন্তু আইন একা পরিবেশ বাঁচাতে পারে না। অপ্রয়োজনীয়ী জল ও বিদ্যুৎ অপচয় কমানো, আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা, একবার ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীর ব্যবহার কমানো, গণপরিবহন ব্যবহার করা এবং স্থানীয় গাছপালা ও জলাশয় রক্ষায় সচেতন হওয়া — এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলির সম্মিলিত প্রভাব বড় হতে পারে।

সবচেয়ে জরুরি হলো পরিবেশকে জীবনের বাইরে কোনও আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখা। পরিবেশ নিয়ে আলোচনা কেবল বিশ্ব পরিবেশ দিবসের অনুষ্ঠান বা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিদ্যালয়ে পরিবেশ শিক্ষা, পরিবারে সচেতনতা এবং নাগরিক জীবনে দায়িত্ববোধ — সবকিছুর মধ্যেই পরিবেশ চেতনা গড়ে তুলতে হবে। শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই নদীকে আবর্জনার জায়গা নয়, জীবনের অংশ হিসেবে চিনতে শেখে, গাছকে শুধু কাঠ নয়, জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখতে শেখে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে।

প্রকৃতি মানুষের শত্রু নয়, আবার মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নয়। মানুষ প্রকৃতিরই একটি অংশ। তাই পরিবেশ রক্ষার অর্থ প্রকৃতির ওপর কোনও অনুগ্রহ করা নয়; নিজের অস্তিত্বের ভিত্তিকে রক্ষা করা। আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে জল পান করি, যে মাটিতে খাদ্য উৎপন্ন হয় এবং যে পরিবেশে আমাদের সন্তানরা বড় হবে — সবই আমাদের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত।

আজকের পৃথিবীর সামনে তাই প্রশ্ন একটাই — উন্নয়ন কি এমন হতে পারে না, যেখানে মানুষের প্রয়োজন মিটবে অথচ প্রকৃতিও বেঁচে থাকবে? উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের জীবনযাপনের ধরন, উৎপাদন ও ভোগের পদ্ধতি এবং উন্নয়নের ধারণা — সবকিছুকেই নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া কোনও অতিরিক্ত দায়িত্ব নয়; এটি বর্তমান প্রজন্মের নৈতিক কর্তব্য। পরিবেশকে রক্ষা করা মানেই শেষ পর্যন্ত মানুষকে রক্ষা করা — নিজেদেরও, আগামী দিনের পৃথিবীকেও।

পরিচিতি: লেখক, কবি, সাংবাদিক এবং 'সব্যসাচী' পত্রিকার দীর্ঘদিনের সম্পাদক। নিবাস: কলকাতা।