পরিবেশ ও বিজ্ঞান

ভারতে মহাকাশ গবেষণার সূচনা (দ্বিতীয় পর্ব)



সঙ্গীতা দে সরকার


শারদীয়া দেবীপক্ষের সূচনা হয় পূর্বপুরুষদের তর্পণের মাধ্যমে। এই লেখাও প্রকারান্তরে তর্পণ – মহাকাশ গবেষণায় পূর্বজদের অবদান স্মরণ। প্রথম পর্বে উঠে এসেছে মহাকাশ গবেষণায় ভারতবর্ষের প্রারম্ভিক সময়কালের কথা। একটি উন্নয়নশীল দেশে মহাকাশ গবেষণা যে শুধুমাত্র বিলাসিতার কারণে নয়, তা দেশবাসীকে বোঝাতে অনেক পরিশ্রম করেছিলেন আমাদের পূর্বসূরীরা। অক্লান্ত পরিশ্রম করে ডঃ বিক্রম সারাভাই এবং তার সহযোগীরা বিশ্বাস করাতে পেরেছিলেন যে দেশের আর্থ-সামাজিক প্রগতির জন্যই প্রয়োজন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অর্থ বিনিয়োগ। ওনাদের সেই প্রচেষ্টা, দূরদর্শিতার কথা না জানলে বর্তমানকালে আরো এগিয়ে চলা সম্ভব না। সেই ধারণা থেকেই এই লেখার শুরু। দ্বিতীয় পর্বে আসবে "দূর-সংবেদন" (রিমোট সেন্সিং) প্রযুক্তিতে ভারতবর্ষের হাতেখড়ির কাহিনী। সত্যি হলেও সে যেন এক রূপকথার গল্প। ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, তবু নিধিরাম সর্দার জিতেছে – এর থেকে বড় রূপকথা আর কি!

রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির শুরু হয় ১৮৫৮-তে ফোটোগ্রাফি আবিষ্কারের সাথে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ে। মহাকাশ গবেষণায় অগ্রগতির সাথে সাথে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির প্রয়োগের নানা দিক খুলে যায়। ডঃ সারাভাই দূরদর্শিতার মাধ্যমে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির কল্যাণকর প্রয়োগ যে সম্ভব তা বুঝতে পেরেছিলেন। সবে যখন উন্নত দেশগুলি যেমন আমেরিকা, সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তি নিয়ে উচ্চতর গবেষণা শুরু করছে, সারাভাই চেয়েছিলেন আমাদের দেশও পিছিয়ে থাকবেনা। এই উদ্দেশেই ১৯৬৯-এ সারাভাই, অধ্যাপক রামানাথান, অধ্যাপক ও কৃষিবিদ এম. এস. স্বামীনাথনের নেতৃত্বে কিছু বিজ্ঞানী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওনাদের প্রস্তাব ছিল যে, নতুন উদ্ভাবিত রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে (যেমন কৃষি, ভূতত্ত্ব ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, আবহাওয়া) প্রয়োগ করা হোক, যার ফলে ভারতের উন্নতি আরও গতি পাবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমতি দিলে এটা ওনারা হাতেকলমে পরীক্ষা করে প্রমাণ করে দেখাতেও পারেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন প্রধানমন্ত্রী তাদের সমস্ত আলোচনা উৎসাহের সঙ্গে শুনলেও কোনো মন্তব্য করেননি। সারাভাইয়ের কাছে এই নীরবতাই ছিল সম্মতির লক্ষণ। সুতরাং শুরু হল রিমোট সেন্সিং এ হাতেখড়ির আয়োজন।

পূর্বসূরীরা কী অসাধ্য সাধন করেছিলেন তা বুঝতে গেলে আগে জেনে নিতে হবে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তিটা কী? সহজে বললে, দূরে থাকা কোনো বস্তুকে স্পর্শ না করে তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করাই হল রিমোট সেন্সিং অর্থাৎ 'দূর সংবেদন'। আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে তিনটি ইন্দ্রিয় – চক্ষু কর্ণ এবং নাসিকা প্রকৃতিগতভাবেই দূর সংবেদী অর্থাৎ দূর থেকে অনুভব করতে সক্ষম। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তো কবেই গেয়েছেন – "আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি"। তাহলে রিমোট সেন্সিং বলতে নতুন আর কি হল? হল না তো। তবে দূরত্ব আরও বাড়লে যখন আমাদের ইন্দ্রিয় জবাব দেয়, তখন দরকার এই নতুন প্রযুক্তির অর্থাৎ অনুভবের মাত্রা বাড়ে রিমোট সেন্সিং প্রয়োগের ফলে। যেমন আমরা চোখ দিয়ে আলোর কিছু তরঙ্গ দৈর্ঘ্য (বেনিয়াসহকলা: বেগুনি থেকে লাল পর্যন্ত) দেখতে পাই । লাল রঙের থেকে বেশি (অবলোহিত) অথবা বেগুনি রং এর থেকে কম (অতিবেগুনি) তরঙ্গ দৈর্ঘ্যদের খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু রিমোট সেন্সরের মাধ্যমে এই অবলোহিত তরঙ্গকে দেখা সম্ভব। এখানে 'দেখা' বলতে অবশ্য অবলোহিত আলোর প্রতি সংবেদনশীল এরকম বিশেষ রঙিন ফিল্ম দিয়ে ছবি তোলার কথা বোঝানো হচ্ছে। সেই ফিল্মকে ডার্করুমে বিশেষ ভাবে ডেভেলপ করলেই একমাত্র ওই ছবি দেখা সম্ভব। এই প্রযুক্তি তখন সবে প্রয়োগ হচ্ছে কৃষিক্ষেত্রে। কারণ দেখা গেছে যে, গাছ এই অবলোহিত তরঙ্গকে খুব কম শোষণ করতে পারে। ফলে অধিকাংশ অবলোহিত তরঙ্গই গাছ থেকে প্রতিফলিত হয়ে যায়, ঠিক যেন আয়নার মতন। কিন্তু গাছের কোনো অসুখ হলে এই বৈশিষ্ট্য পাল্টায়। অসুখের ধরন, কতটা অসুখ ছড়িয়েছে তার উপর নির্ভর করে গাছ কতটা ভালো প্রতিফলন করতে পারবে। যেমন ধরা যাক একটি নারকেল গাছের 'ঢলে পড়া' (Wilt ডিসিস) রোগ হয়েছে। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে তখন কাণ্ডের ভেতর আঠা জাতীয় পদার্থ জমা হয়ে জল চলাচল বন্ধ হতে থাকে। কাণ্ড কেটে জলে ডোবালে সাদা দুধেল কষ (Bacterial Ooze) বের হতে দেখা যায়। রোগগ্রস্ত গাছের কোষে জলের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তারা খুব বেশি অবলোহিত তরঙ্গকে প্রতিফলিত করতে পারে না। ফলে কেউ যদি একটি সুস্থ এবং একটি রোগগ্রস্ত গাছ থেকে প্রতিফলিত অবলোহিত তরঙ্গ সংগ্রহ করে সেই বিশেষ ফিল্মের সাহায্যে তাহলে ওই ছবি দেখেই বোঝা যাবে কোন গাছ কতটা তরঙ্গকে ফেরত পাঠিয়েছে। প্রতিফলনের আলাদা পরিমাণ থেকেই বোঝা সম্ভব কোন গাছ কতটা অসুস্থ। এমন কিন্তু নয় যে, চোখে দেখে এই রোগ বোঝা যায়না। জল না পেয়ে গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়, কান্ড শুকিয়ে গিয়ে ঢলে পড়ে। তবে এগুলো দেখতে পাওয়ার প্রায় মাসখানেক আগেই রিমোট সেন্সিংয়ের মাধ্যমে গাছের এই রোগ সনাক্ত করা যায়। একমাসের গুরুত্ব অনেক – এই সময়কে কাজে লাগিয়ে রোগটি ছড়িয়ে পড়া আটকানো যায়, অন্য গাছের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে। তাই চোখে দেখে বোঝার থেকে রিমোট সেন্সিং প্রক্রিয়াটি বেশি সুবিধাজনক – লোকবল, সময়, সর্বোপরি ফসল বাঁচে।

ডঃ সারাভাই এই পরীক্ষাই হাতেকলমে ভারতে করে দেখাতে চেয়েছিলেন। ভারতবর্ষে সবুজ বিপ্লবের জনক কৃষিবিদ স্বামীনাথন জানতেন যে বিভিন্ন সময়ে কেরালায় নারকেল ক্ষেতে Wilt disease মহামারীর আকার ধারণ করছে। এই রোগ যদি সহজে সময় থাকতে সনাক্ত করা যায় তাহলে কেরালা নারকেল-নির্ভর শিল্পে আরও উন্নতি করবে। সমস্ত বিজ্ঞানীদের মনে হয়েছিল এই পরীক্ষায় সফল হলে ভারতের মতো কৃষিপ্রধান দেশে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি নিয়ে আর কোন সন্দেহের অবকাশ থাকবেনা। দায়িত্ব দেওয়া হল বিখ্যাত পদার্থবিদ, আবহাওয়াবিদ অধ্যাপক পি. আর. পিসারোটি কে যিনি পরবর্তীতে ভারতে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির জনক হিসাবে খ্যাত হয়েছেন। ডঃ সারাভাইয়ের উদ্যোগে অধ্যাপক পিসারোটি এবং আরও কিছু বিজ্ঞানীরা আমেরিকায় নাসার গবেষণা কেন্দ্রে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির কৌশল শিখে এলেন। কিন্তু শুধু তো জ্ঞান সঞ্চয় করলেই হবেনা, প্রয়োগ করতে গেলে প্রয়োজন উন্নত উপগ্রহ ব্যবস্থা, অবলোহিত আলোর বিশ্লেষণ করার জন্য উপযুক্ত ফিল্ম, পরীক্ষাগার যেগুলির সবকিছুই অপ্রতুল। প্রকৃত অর্থেই নিধিরাম সর্দার। শুধু কম পড়েনি মেধা, দেশপ্রেম। নয় থেকে হয় করতে লেগে পড়লেন তারা। দেশের তিনটি সংস্থাকে ইসরো, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কেরালার নারকেল গবেষণা কেন্দ্র, এক সূত্রে কাজ করতে হয়েছিল। ডঃ সারাভাইয়ের প্রশাসনিক দক্ষতা সরকারি লাল ফিতের ফাঁস এড়িয়ে কাজে গতি এনেছিল। এছাড়াও ওনার আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ফলেই আমেরিকা ও ফ্রান্সের সাহায্য পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। স্বামীনাথনের কৃষি সংক্রান্ত জ্ঞানপ্রয়োগ আর অধ্যাপক পিসারোটির উদ্যোগে এগোচ্ছিল পরীক্ষাটি। ঠিক হয়েছিল একটি ক্যামেরাকে হেলিকপ্টারের মধ্যে বসিয়ে নারকেল ক্ষেতের উপরে ওড়ানোর সময় ছবি তোলা হবে গাছের। ক্ষেতের কতটা অংশের ছবি তোলা হবে, কোন হেলিকপ্টার ব্যবহার করা যাবে, কত উচ্চতায় ওড়ানো সম্ভব এবং সবথেকে বেশি কত বেগে উড়লে ছবি স্পষ্ট থাকবে তার নিখুঁত হিসাব করতে হয়েছিল বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ এবং প্রযুক্তিবিদদের। পরীক্ষার কোনো ধাপের পুনরাবৃত্তি করা যাবেনা বলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা করতে হয়েছিল। যেহেতু এইরকম পরীক্ষা দেশে প্রথমবার হচ্ছে, তাই পরীক্ষার ফলাফল অন্যভাবে যাচাই করার কথাও মাথায় রাখতে হয়েছিল। কৃষিবিদরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে ফিল্ড সার্ভে করা হোক একইসাথে। স্বামীনাথনের নেতৃত্বে কৃষিবিদ ও কৃষকরা ঐ ক্ষেতের পরীক্ষাধীন প্রতিটি নারকেল গাছের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) বানিয়েছিলেন। আগেই বলেছি, ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে রোগগ্রস্ত গাছের কান্ড কেটে জলে ডোবালে সাদা সুতোর মতো দুধেল রস বের হতে দেখা যায়। এইভাবে পরীক্ষা করেই কৃষিবিদরা সুস্থ এবং রোগগ্রস্ত নারকেল গাছকে আলাদা করেছিলেন। রিমোট সেন্সিংয়ের জন্য ভারতবর্ষে প্রথম আমেরিকা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল অবলোহিত আলোর প্রতি সংবেদনশীল ফিল্ম। নিয়ে আসার ঝক্কিও কম নয়। কারণ সাধারণ আলোতে এবং তাপমাত্রাতে ফিল্ম থাকলেই সঙ্গে সঙ্গে কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষভাবে অন্ধকার করা ফ্রিজের মধ্যে রেখে নিয়ে আসা হয়েছিল ফিল্ম, সেইরমভাবেই সংরক্ষণ ও করতে হয়েছিল পরীক্ষার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত। এবারে হেলিকপ্টারের মধ্যে ক্যামেরা নিয়ে বসলেন অধ্যাপক পিসারোটির সঙ্গে বিজ্ঞানী দল। অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে নিখুঁত ভাবে পরীক্ষাটি সম্পন্ন করতে হয়েছিল। পরীক্ষার পর সেই ফিল্মকে বিশেষ ভাবে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ডেভেলপ করা হল। অল্প একটু তাপমাত্রার হেরফের হলেই ফলাফল উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু তা হয়নি। অদম্য ইচ্ছাশক্তির বলে জয়ী হয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। রিমোট সেন্সিংয়ের ফলাফল আর কৃষিবিদদের পরিচয়পত্র কাঁটায় কাঁটায় মিলে গেছিল।

এই পরীক্ষার সফলতার পরেই ভারতবর্ষে শুরু হল রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা। উপগ্রহ বানানোর অনুমতি পাওয়া গেল। ১৯৭২-এ প্রতিষ্ঠিত হলো মহাকাশ বিভাগ (Department of Space)। প্রথম উপগ্রহ আর্যভট্ট (১৯৭৫) আর পরবর্তীকালে ভাস্কর-১ (১৯৮১), ভাস্কর-২ (১৯৮২) থেকে শুরু হয়ে ১৯৮৮-তে প্রথম ভারতীয় রিমোট সেন্সিং উপগ্রহ (IRS-1) উৎক্ষেপণ হল ইসরোর নেতৃত্বে।


References:

1. https://www.isro.gov.in
2. https://www.nasa.gov
3. From Fishing Hamlet to Red Planet: India's Space Journey - by Indian Space Research Organization, 2015.
4. India in Space: Between Utility and Geopolitics by M. Aliberti, Springer, 2018.

ছবি সৌজন্য:
1. ISRO
2. https://blog.aerospacenerd.com

পরিচিতি: অধ্যাপক, গবেষক।