ভ্রমণ

সিয়াম, শ্যামদেশ ভ্রমণ



লিনু হক


'অনেক তিয়াশে করেছি ভ্রমণ
জীবন কেবলই খোঁজা
'...

জীবন এক যাত্রাপথ — যাত্রাপথের পথিক আমরা, এ যাত্রার বিনিয়োগ যেমন নিজের জন্য, তেমনি অপরের জন্য। পৃথিবীর বৈচিত্র্য দেখার সুযোগ ঋদ্ধির গভীরতায়, সিদ্ধির উৎকর্ষতায় নিজেকে পৌঁছে দেয়। ঠিক তেমনি, প্রকাশের মধ্যে দিয়ে অপরকে জানার, সমৃদ্ধ হবার সুযোগ করে দেয়।

এবার যাত্রার গন্তব্য ছিল 'শ্যামদেশ' — বর্তমানে 'থাইল্যান্ড' নামকরণ হয় ১৯৪২ সালে। ভ্রমণ তালিকায় ছিল আয়ুথায়া, ব্যাংকক, পাতায়া।

আয়ুথায়া থাইল্যান্ডের প্রাচীন দ্বিতীয় রাজধানী। ব্যাংকক থেকে ৫৫ মাইল উত্তরে ঐতিহাসিক স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে ১৯৯১ সালে। প্রথম পরিদর্শন ছিল 'আয়ুথায়া' রাজবাড়ি। রাজা প্রাসাদ থং-এর ১৬২৯ থেকে ১৬৫৬ সময়কালে চাও ফ্রায়া নদীর ব্যাং পা দ্বীপে একটি প্রাসাদ নির্মাণ ছিল। ১৬০৫ থেকে ১৬১১ সালের মধ্যে রাজা এথোৎসরাদের যৌবনকালে তার একটি জাহাজ এই দ্বীপে ভেঙে পড়েছিল। দ্বীপে অবস্থানকালে তিনি দ্বীপের এক নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।সেই নারীর গর্ভে তার একটি 'সোম' নামে অবৈধ পুত্র সন্তান ছিল। সোম বড়ো হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হয় এবং সিংহাসন দখল করেন। তিনি তার মায়ের জমিতে এই প্রাসাদ নির্মাণ করে একটি পুকুর খনন করে বিস্তীর্ণ জায়গা নিয়ে 'আইসোয়ান থিয়াফো' নামে রাজকীয় প্রাসাদের নাম লিপিবদ্ধ করেন। প্রাসাদ নির্মিত হয়েছে ১৬৫৬ থেকে ১৬৮৮ সালের দিকে। আয়ুথায়া পতন পর্যন্ত জায়গাটি ব্যবহার হয়েছিল কিনা জানা যায়নি।

১৮০৭ সালের দিকে রাজ্যের শ্রেষ্ঠ কবি সু ন থাং ফু বাংপাকে অতিক্রম করার সময় প্রাসাদটি অবহেলিত অবস্থায় দেখতে পান। ভাক্রিদনাস্তির চতুর্থ রাজারাম প্রসাদ, প্রাসাদটি পুনরুজ্জীবিত করেন। রাজা চুলালংকর্ন দ্বারা ১৮৭২ থেকে ১৮৮৯ সাল পর্যন্ত এখানে আরো অনেক প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল যা এখনও দাঁড়িয়ে আছে।বর্তমানে একটি প্রাসাদ রানি সিরিকিত অভ্যর্থনা ভোজ সভার জন্য ব্যবহার করে থাকেন। প্রাসাদ পরিদর্শন করতে টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়, স্যান্ডেল পরে ভিতরে প্রবেশ নিষিদ্ধ, জুতা পরে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। বিস্তীর্ণ জায়গা নিয়ে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে ছোটো ছোটো সৌন্দর্যমণ্ডিত অনেকগুলো প্রাসাদ ভিতরে সময়কে ধারণ করে আছে।

'হিংসার উপরে কালো ঘাস'
তার মাঝে পোড়া মূর্তি।

প্রাসাদ থেকে গন্তব্য ছিল 'আয়ুথায়া'র পোড়াদহ নগরকেন্দ্র, যা আড়াইশত বছর ধরে ক্ষতচিহ্ন নিয়ে আজও টিকে আছে। সেখানে প্রবেশ করতেই, অবাক বিস্ময়ে হারিয়ে গেলাম কয়েকশত বছর আগের আয়ুথায়া কিংডমের ধ্বংসস্তুপে বিধ্বস্ত সারি সারি স্থাপনাগুলো দেখে। সহজেই অনুমান করা যায় কেমন ছিল, সিয়ামের প্রাচীন রাজধানী আয়ুথায়া।

১৩৭৪ সালে রাজা প্রাসাট থং চাই ওয়াথথানারাম নির্মাণ করেছিলেন, যার অর্থ থাই বৌদ্ধমঠ বা মন্দির। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ছিল। এই বৌদ্ধ মন্দির রাজপ্রাসাদের কাছাকাছি রাজকীয় মঠ। এখানে প্রার্থনার সাথে সাথে রাজকীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান সস্পাদন করতেন রাজা। রাজ্যের বৌদ্ধ ধর্মের কেন্দ্র বিন্দু ছিল এই মন্দির। ১৭৬৭ সালে বার্মিজ সৈন্যরা আক্রমণ করে, লুটপাট তছনছ করে পুড়িয়ে দেয় এ নগরী। সাত দিন ধরে পুড়েছিল এ নগর।

ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন ছিল রাজধানী ব্যাংককে, মূল আকর্ষণ ছিল বুদ্ধমূর্তি পরিদর্শন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বুদ্ধমূর্তি দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। 'সুখোথাই ট্র্যামিট ' খাটি সোনার গোল্ডেন বুদ্ধা, যা বিবেচনা করা হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ সোনার মূর্তি । এটি 'মারাজয়ী' মনোভাবের একটি প্রতিমা। শিল্পশৈলী তখনকার, যখন 'সুখোথাই'( সময়কাল ১৩ থেকে ১৪ শতাব্দী) ছিল থাইল্যান্ডের রাজধানী। এর সৌন্দর্য অতুলনীয়।মূর্তিটির ব্যাস ১২ ফুট ৫ ইঞ্চি, উচ্চতা ৯ ইঞ্চি, ওজন ৫.৫ টন। মূল্য ২৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড। এর বয়স ৭০০ বছর। এটি থাইল্যান্ড এবং বৌদ্ধধর্মের মূল্যবান ধন।

স্বর্ণের বৌদ্ধমূর্তি দেখার পর আমরা চলে গেলাম শায়িত বুদ্ধকে দেখতে। এই মূর্তিটি আছে ওয়াট ফো নামের এক মন্দিরে। রাজা প্রথম রামা এই মন্দির নির্মাণ করেন এবং এরপর তৃতীয় রামা'র সম্প্রসারণ করেন। শায়িত বুদ্ধের দৈর্ঘ্য ৪৬ মিটার, একমুখী পথে ঢুকে হেঁটে হেঁটে বের হয়ে যেতে হয় বুদ্ধকে দেখতে দেখতে। তবে এই কক্ষে ঢোকার আগে জুতা একটি ব্যাগে ভরে হাতে নিতে হয়। কক্ষটিতে অনেক ভিড়, এর মাঝেও ছবি তুলেছিলাম আমরা বেশ কয়েকটা। দুই বিখ্যাত বুদ্ধকে দেখার ফাঁকে থাইল্যান্ডের বর্তমান আধুনিক রাজপ্রাসাদ দেখে আসলাম, যদিও প্রচণ্ড গরমের কারণে খুব বেশি সময় থাকা হয়নি।

দিনের বেলা অনেক ভঙ্গিমার বুদ্ধ দর্শনের পর সন্ধ্যাবেলা আমরা গেলাম চাও ফ্রায়া নদীতে প্রমোদতরী ভ্রমণে। নদীর ঘাটটি অসম্ভব সুন্দর, একটি অত্যাধুনিক শপিং কমপ্লেক্সের ধারে বানানো। প্রমোদতরীর অপেক্ষা করতে করতে দেখতে পেলাম ওদের সংক্রান উৎসব, আমাদের নববর্ষের সাথে একইদিনে এই উৎসব। একে অপরকে পানি ছিটিয়ে ওরা আনন্দ উৎসব করে এই দিনে। প্রমোদতরী থেকে রাতের ব্যাংকককে অন্যভাবে দেখলাম, সবচাইতে নয়নাভিরাম ছিল ওয়াট অরুণ মন্দিরকে রাতের আলোয় দেখা। সেই সাথে থাইল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত নানা ধরনের ডিশ বুফে খাওয়ার সুব্যবস্থা। এভাবেই আমাদের দ্বিতীয় দিনের পরিসমাপ্তি ঘটলো।

তৃতীয় দিন আমাদের দর্শনের স্থান ছিল পাতায়ার সমুদ্র সৈকত এবং সত্য যাত্রার অভয়ারণ্য জাদুঘর।

'আয়ুথায়া ' পোড়া নগরীর বিষণ্ণতা কাটিয়ে, মন ভালো করে দিলো একজন মানুষ সৃষ্ট, সত্যকে ধারণ করার 'অভয়ারণ্য' জাদুঘর। সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি, সাতটি সত্য বার্তা দিচ্ছে কারুকার্য খচিত দৃশ্যগুলো।

সৃষ্টির শুরুতে মানুষ মাত্রই শাশ্বত প্রশ্ন — কে আমি? কোথা থেকে এসেছি? কীভাবে বেঁচে থাকি? জীবনের উদ্দেশ্য কী? উত্তর ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি ভিন্ন, তাদের পটভূমির উপর নির্ভর করে। সত্যের অভয়ারণ্য জাদুঘরের চারপাশে ভাস্কর্যের মাধ্যমে জীবনের সাতটি সত্য অন্বেষণ করার জন্য দর্শকরা অপেক্ষমাণ।

নির্মাণ শুরু ১৯৮১ সালে থাই ব্যবসায়ী লেক ভিরিয়াফান এর ডিজাইনে, নির্মাণ এখনো চলছে, দর্শকদের হেলমেট পরিধান করিয়ে ৫০০ বাথ জনপ্রতি টিকেটের বিনিময়ে প্রবেশাধিকার আছে।

গ্রেট ক্যাসেলের পাঁচটি শিখর থেকে শুরু যা মানুষের পাঁচটি মিশনকে বোঝায়।

এক, দেবদূতের হাতে একটি ঝুলন্ত পদ্মফুল যা প্রতীক হিসাবে স্বর্গ এবং পৃথিবীর মধ্যে মনোজগত স্থাপনের কাজ করে। ভালো কাজের সংকল্প এবং শান্তি স্থাপন।

দুই, একজন দেবদূতের হাতে একটি ধর্মগ্রন্থ (কোনো বিশেষ ধর্মের নয়), অতীত থেকে সেরা বিজ্ঞানের উত্তরাধিকারী আমরা যেন বুঝতে পারি কোথা থেকে এসেছি, কীভাবে আমরা জীবন যাপন করি?

তিন, অ্যাঞ্জেল ধরে আছে একটি শিশুর হাত। পরস্পরকে সাহায্য করার শাশ্বত শান্তি, ভালো আচরণ এর প্রকাশ। যা একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি করে।

চার,একটি দেবদূত যার বাহুতে একটি পাখি এবং একটি ধানের শীষ, যা একটি ভালো আচরণের প্রকাশ।

পাঁচ, দেবদূত একটি ঘোড়ায় চড়ে একটি পবিত্র ফুল হাতে ঘুঘু নিয়ে সমাজকে শান্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার উপরোক্ত চারটি গুণের সংমিশ্রণের প্রকাশ।

জাদুঘর পর্যন্ত সিঁড়িটি মহান দুর্গে জোয়ারের বিপরীতে জলজ প্রাণীর সাঁতারের প্যাটার্ন দিয়ে খোদাই করা। দুর্গটি জীবনের সত্যর সাথে তুলনা করা হয়েছে। দুর্গ হতে প্রবাহিত জলকে সামাজিক প্রবণতার সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর যে মাছগুলো সাঁতার কাটে তারা আমাদের মতো সারা জীবনের সত্যের দিকে ফিরে তাকানোর জন্য সামাজিক প্রবণতার দিকে ফিরে যাওয়া । যখন সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাবে, মানুষ জোয়ারের বিপরীতে সাঁতার কেটে জীবনের সত্য খুঁজে পাবে। আমরা আসলে কে? আমরা কোথা থেকে এসেছি? আমরা কীভাবে বাস করি? আমাদের জীবন কীভাবে চলছে এবং জীবনের উদ্দেশ্য কী?

৭টি সত্যর প্রথম সত্য কে আমরা? কোথা থেকে এসেছি? এই সত্য মানব সমতার ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে। আপনি যতই ধনী হোন না কেন,আপনি কোথা থেকে এসেছেন,কোনো ধর্মে বিশ্বাস করেন না কেন, আমরা সবাই এক এবং চারটি মৌলিক উপাদান পৃথিবী, বায়ু, আগুন এবং জলের সমন্বয়ে গঠিত। তাই প্রত্যেক মানুষই সম্মানের যোগ্য।

পৃথিবীর উপাদান মাটি, জমি, এবং বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থলের একটি ভাস্কর্য। জলের উপাদান তরঙ্গ, গাছপালা এবং জলজ প্রাণীর। বায়ুর উপাদান বাতাসের আঘাতে আঘাতে দুলতে থাকা একটি কাপড়ের ভাস্কর্য। এভাবেই ভাস্কর্য, চিত্রকলা, আর রূপকের মাধ্যমে সত্য আর শান্তির বার্তা তুলে ধরা হয়েছে নিপুণভাবে। বাকি সবার মতো আমরাও গেস্ট বুকে স্বাক্ষর করলাম মন্তব্য সহ। সারা পৃথিবীতে ধর্ম আর জাতিসত্তা নিয়ে এত মারামারি আর যুদ্ধ বিগ্রহ তার বিপরীতে সত্যের এই অভয়াশ্রম ভ্রমণ এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা। মন্দির ভ্রমণ শেষে বিশ্বখ্যাত পাতায়া সমুদ্র সৈকত দেখে আর শেষবেলার শপিংয়ের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো আমাদের সংক্ষিপ্ত থাইল্যান্ড ভ্রমণ।

পরিচিতি: কাজী ফেরদৌসী হক লিনু লেখালেখি করেন 'লিনু হক' নামে। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। বাসস্থান: ঢাকা, বাংলাদেশ। প্রকাশিত গ্রন্থ: 'মেয়ে বিচ্ছু', 'অবরুদ্ধ নগরের গেরিলা ৭১', 'প্রথম পুরুষ', 'মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্রে বাংলার নারী'।