সাক্ষাৎকার

 

  • কবিতা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ শিল্প, শীর্ষ শিল্পঃ কৃষ্ণা বসু

কবি কৃষ্ণা বসু-র সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় 'ডটপেন ডট ইন' ই-পত্রিকা

[কবি কৃষ্ণা বসু বাংলা সাহিত্যের একজন অতি শ্রদ্ধেয়া এবং প্রতিষ্ঠিত কবি। তাঁর মননশীল কবিতায় নারীবাদ, সামাজিক বঞ্চনা ও মানবতার কথা সবসময় বাঙালী পাঠককে ভাবিয়েছে, কাঁদিয়েছে। কবিতা তাঁর কাছে আত্মার আত্মীয়, প্রাণের আরাম। জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, বঞ্চনা-প্রতিবাদ, আশা-নিরাশা সর্বক্ষেত্রেই তিনি কবিতাকে একান্ত সঙ্গী করে সৃষ্টি করে চলেছেন এক একটি মানব দলিল। তিনি মনে করেন কবিতাই পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ শিল্প। মাত্র আট বছর বয়সে মা-বাবার পরম উৎসাহে তাঁর কবিতা লেখা শুরু। স্কুল-জীবনে দিদিমনি 'বড় হয়ে কি হতে চাও' শীর্ষক রচনা লিখতে দিলে তিনি লিখলেন - "বড় হয়ে আমি কবি ও লেখক হবো। হবোই।" এই 'হবোই'-এর জোর দেখে বোঝা যায় ওই ছোট্ট বয়স থেকেই তাঁর কবিসত্তা কতটা সুদৃঢ় হয়েছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি অধ্যাপনাকে জীবিকা হিসাবে বেছে নেন এবং পাশাপাশি কবিতা লেখাও চালিয়ে যান। এই সময় বাংলা সাহিত্য ও কাব্য জগতের দিকপাল সব ব্যক্তিত্ব - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ প্রমুখদের স্নেহ সান্নিধ্য লাভ করেন। এখনও পর্যন্ত ৪০টি বই তিনি লিখেছেন। নানান সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। কাব্যপ্রেমী বাঙালী পাঠক আজও তাঁর কবিতার বই কেনেন, পড়েন, ভালবাসেন, কাঁদেন এবং বারবার নিজ কন্ঠে তাঁর স্বরচিত কবিতা শুনতে চান। আজও প্রতিদিনই তাঁকে কোনও না কোনও সাহিত্য সভা, কবিতা পাঠের আসরে উপস্থিত থাকতেই হয় কাব্যপ্রেমী মানুষের আবদার মেটাতে, আর তিনিও ভালবাসেন মানুষের সঙ্গ পেতে। কিন্তু অতি সম্প্রতি এক দুর্ঘটনায় তিনি পড়ে গিয়ে মেরুদন্ডের হাড়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন, অস্ত্রোপচার হয় এবং আপাতত বাড়ীতেই থাকেন।


আমরা 'ডটপেন ডট ইন' পত্রিকার প্রতিনিধিরা উপস্থিত হই কৃষ্ণা বসুর ফ্ল্যাটে এক সন্ধ্যায় তাঁর একটি ছোট ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য। তাঁর সঙ্গে ঘন্টা দুয়েকের আলাপচারিতায় আমরা মুগ্ধ। কি অমায়িক তাঁর কথাবার্তা ও ব্যবহার। সন্ধাবেলা চা-মুড়ি-চপ সহযোগে তাঁর সঙ্গে কথা শুরু হল। আলাপচারিতার পরতে পরতে উঠে আসে অতীতের স্মৃতি বিজড়িত মন ভালো করে দেওয়া সব টুকরো টুকরো মুহুর্ত আর ওঁনার দৃপ্ত কন্ঠে সেইসব কালজয়ী কবিতা। এই বয়সেও কি সাবলীল তাঁর কবিতা পাঠ, কি অসাধারণ স্মৃতিশক্তি - সামনে থেকে যিনি দেখবেন একমাত্র তিনিই অনুভব করবেন। আমরা 'ডটপেন ডট ইন'-এর দুই প্রতিনিধি ঘন্টা দুয়েক কৃষ্ণাদির সঙ্গে কাটিয়ে অভিভূত। 'ডটপেন ডট ইন'-এর পাঠকদের সঙ্গে আমরা ভাগ করে নিতে চাই সেইসবই ইতিপূর্বে অশ্রুত কিছু কথোপকথন।
]

মেয়েবেলার কথা...

আমরা স্মৃতিজীবী মানুষ। যে উৎস যে প্রেরণা আমাদের জীবনের দিকে এগিয়ে দেয়, সৃজনশীলতার দিকে এগিয়ে দেয় তা হল স্মৃতি। স্মৃতি-সম্ভব মানুষ আমরা সবাই। ছোটবেলাকার স্মৃতি আমার এইটাই যে আমাদের বাড়িতে মধ্যবিত্ত বাড়ি কিন্তু সেখানে সাহিত্য সংস্কৃতির পরিবেশটি খুব সুন্দর ছিল। প্রচুর বই পত্র-পত্রিকা আসত। আমার মা খুব সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ ছিলেন। আমাদের বাড়িতে 'পরিচয়' আসত, 'এক্ষণ' আসত, 'দেশ' আসত। এখন 'দেশ' যেমন পনেরো দিন অন্তর বেরোয় তখন প্রতি সপ্তাহে বেরোত। এছাড়াও হেন কাগজ নেই যা আসত না। মনে পড়ছে 'অনুষ্টুপ' নামে একটা পত্রিকা ছিল সেটাও আসতে দেখেছি। সবকটার নাম মনে নেই। আমরা ছোটরা ভাইবোনেরা সেই পত্রিকাগুলো কাড়াকাড়ি করে পড়তাম। তাছাড়া খবরের কাগজ পড়া বা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা যেগুলো চেনা পরিচিতরা দিয়ে যেত সেগুলো পড়া... ফলে পত্র-পত্রিকা পড়ার মধ্য দিয়ে একটা মুক্ত পরিবেশের মধ্যে বড় হয়েছি আমরা।

ইস্কুলবেলার গোধূলিলগন...

আমার যখন আট বছর বয়স... আমি তখন চন্দননগরের একটা স্কুলে পড়ি... ক্লাসের সবাইকে দিদিমণি লিখতে দিয়েছিলেন যে বড় হয়ে কে কি হবি লেখ। কেউ লিখেছিল ডাক্তার হবে, কেউ লিখেছিল শিক্ষক হবে, কেউ বলেছিল ঘর-সংসার করবে। আমি লিখেছিলাম "কবি ও লেখিকা হব" দাঁড়ি "হবই" আবার দাঁড়ি। তো সেই দিদিমণি দীর্ঘদিন বেঁচেছিলেন। পরে দেখা হলে বলতেন, "ওরে আমার হবই রে হয়েই ছেড়েছে"। এই যে ছোটবেলা থেকে একটা শিশুর প্রবণতা এটা বোঝা যায় তাকে লক্ষ্য করলে এবং এই লেখাটা... ছোটবেলায় একবার খুব বৃষ্টির দিনে স্কুলে যাইনি। একটা পদ্য লিখেছিলাম। এই লেখাটা লেখার পরে মা-কে ডেকে প্রথম শোনাই। মা শুনে বাবার কাছ থেকে একটা নতুন ফাউন্টেন পেন আর একটা ডায়েরি আমার হাতে তুলে দেন। বলেন, "যখন যা মনে আসবে লিখে রাখবে হারিয়ে যেতে দেবে না"। এটা সাংঘাতিক কথা ও পুরস্কার একটা আট বছরের শিশুর কাছে। এই অমোঘ কথাটা আমাকে বিদ্ধ করে চালিত করে প্রেরণা দেয়। আমি সেই সময় থেকেই আমার কবিসত্তাটা অনুভব করি। সেই থেকে সারাজীবনই লিখে চলেছি। এই যে গত সেপ্টেম্বরে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ডের হাড়টা ভেঙে গেল। তারপর অপারেশন হল। আমি কিন্তু একবারের জন্যও লেখা বন্ধ করিনি। এত কষ্টের মধ্যেও লেখা চলেছে আমার। তার কারণ লেখাটা আমার কাছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো অনিবার্য স্বাভাবিক। এই লেখাটাই আমার কাছে প্রাণ এবং প্রেরণা। একেকটা মানুষের একেকটা জিনিসের থেকে উৎস উৎসারিত হয়। জীবন প্রেরণা প্রাণিত করে। আমার কাছে সেটা সাহিত্য কবিতা। তখন আমার বারো-তেরো বছর বয়স, পরে মা বলতেন তখন আমি নাকি বলতাম, "কবিতাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ শিল্প।" সেটা পরে বড় হয়েও আমি বলেছি। কোনো জিনিস খুব সুন্দর হলে অনেকেই বলেন আহা কী সুন্দর ঠিক যেন কবিতার মতো।

এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। একবার চলচ্চিত্র উৎসব চলছে। নন্দনে আমি মাধবীদি (মাধবী মুখোপাধ্যায়) আমরা সব পাশাপাশি বসে ফিল্ম দেখছি... মাধবীদি আমার কবিতা খুব পছন্দ করেন... 'জোজো' বলে একটা সিনেমা। একটি ছোট ছেলের কাহিনী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার বাবা-মা মারা গেছে। সে তার ঠাকুরদা-ঠাকুমার কাছে এবং তার শিকড়ের কাছে ফিরতে চাইছে। সিনেমাটা দেখার পরে মাধবীদি চুপ করে বসে আছেন। আমি বললাম, "দিদি এবার ওঠো। চা খাবে না..."। বললেন, "চা খাবো কী রে কৃষ্ণা কী দেখলাম! এ তো কবিতার মতো!" তখন কথাটা আমাকে খুব বিদ্ধ করল। এই যে কবিতা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ শিল্প এটা অনেকেই স্বীকার করে। তার কারণ কবিতা কম কথার মধ্যে দিয়ে গভীর জীবনের ব্যঞ্জনাকে প্রকাশ করে। সমগ্র মানব জীবনকে ধরে ফেলে। এ ক্ষমতা কবিতারই আছে। জগতে অনেক জিনিস লুপ্ত হয়ে যায়। কবিতা লুপ্ত হয় না। আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে বেদ লেখা হয়েছিল। আমরা এখনও সেই বেদ-এর লাইন মনে রেখেছি। কতদিন আগে 'রামায়ণ', 'মহাভারত' লেখা হয়েছিল। আমরা মনে রেখেছি। কতদিন আগে 'বৈষ্ণব পদাবলী' লেখা হয়েছিল। আমরা মনে রেখেছি, হারাতে দিইনি। কবিতা হচ্ছে এরকম অমোঘ অনিবার্য অবিস্মরণীয় শিল্প। আমি সেই শিল্পে গভীরভাবে বিশ্বাসী।

শুধু কবিতার জন্য...

এই কবিতার জন্য আমি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কেউ ডাকলেই ছুটে গেছি। কবিতার জন্য বহু সময় রাত্রি জেগেছি। কোনো কবিতা পড়ে বা কবিতার দ্বারা প্রাণিত হয়ে প্রিয় কবিদের ফোন করে জানিয়েছি। চিঠি লিখে জানিয়েছি। কবিতা আমার কাছে অক্সিজেন। কবিতা আমার কাছে প্রাণ এবং প্রেরণা।

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কবিতা লিখেছি। আমার কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। গত বইমেলা নিয়ে সবসুদ্ধ আমার চল্লিশটা বই বেরিয়েছে। আমি খুব গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে আমার সবচেয়ে বড় আশ্রয় এবং অবলম্বন হল কবিতা।

একবার কবিতাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখেছিলাম 'দেশ' পত্রিকায় এটা বেরিয়েছিল। তখন আমার বয়স অনেক কম।

কবিতা...

কবিতার কাছ থেকে চলে গেছি বহুদূরে
তাই তুই আমাকে চাস না আর
তোর একান্ত ভুবন দুলে ওঠে মোহনমুদ্রায়
নাচঘর বাতাবি লেবুর গন্ধ
পরাক্রান্ত মোহ দিয়ে
জীবন রঙীন রেলের গাড়ি
নীল জ্যোৎস্নার বুক চিরে
ছুটে যায় গুঁড়ো এরোপ্লেন
সকালবেলার নদী
টলোমলো নৌকার ওপর
অনারব্ধ সোনালী পিকনিক
এইসব ফেলে আমি চলে গেছি দূরে
অনায়াস একা একা যাওয়া
এই যাওয়া কতখানি বিঁধেছিল তোকে
তুই কি বৃক্ষের স্বভাব থেকে নেমে
একবার ঘন অন্বেষণে খুঁজেছিস
কেন এই চলে যাওয়া?
কবিতার কাছ থেকে এই নিম্নাচার
এই পলায়ন তোর বুকে ঘুণপোকা
তোর বুকে হনণপ্রবণ রোগ
তোর মনজুড়ে শীতকাতরতা
তাই নিয়ে বুনেছিস বিস্বাদ-জীবন
তাই এই চলে যাওয়া
সুদূর হাঁসের মতো
যাযাবরী বেদেনীর মতো
এই ভ্রাম্যমানতা আমার
কবিতা মাকড়সা ফাঁদ
পাতা আছে জীবন ব্যাপারজুড়ে
কাঠামো অবধি
তাকে ফেলে তাকে ভুলে
কতদূর যাবি?

বিস্ময়ে তাই জাগে...

আর একটা জিনিস আমার না বিস্ময় লাগে! তোমরা বলতে পারো এর কোনো কারণ আছে কিনা... আমি এই কবিতাটা যে বললাম সেটা অনেকদিন আগের লেখা বলতে আরম্ভ করে মনে হল, বলতে আরম্ভ করছি মনে পড়বে তো? তারপর দেখলাম পুরোটাই মনে পড়ে গেল! এটা কি স্মৃতিশক্তি? বলতে পারো জীবন থেকে নেওয়া বলে। একটা গাছ যেমন মাটি ভেদ করে ওঠে কবিতাটা তেমনি উৎস থেকে উঠছে।

তখনকার দিনে মেয়েদের দুর্দশা প্রসঙ্গে...

আমার দাদুর কথা একটু বলি। শ্যামবাজারে থাকতেন আমার মা, দাদু, মামা-রা, মাসি-রা। আমার মা (চামেলি বসু) উত্তর কলকাতার 'ডাফ স্কুল'-এ পড়তেন। তখনকার দিনে উত্তর কলকাতা মানেই তো কলকাতা। আমার মা ১৪ পেরিয়ে ১৫-য় পড়েছেন। ওখানকার লোকেরা দাদুকে বলল, তোমার মেয়ে আমাদের চোখের সামনে হয়েছে। ১৫ বছর বয়স হল। এখনও যদি বিয়ে না দাও তোমার ধোপা নাপিত কাজের লোক সব বন্ধ করে দেবো। দাদু মানে আমার মায়ের বাবা মন্মথনাথ সিংহ তিনি রেলের ইস্টার্ন জোনের ম্যানেজার ছিলেন। তখনকার দিনের অনার্স গ্রাজুয়েট। তখনকার দিনে ১৪০০ টাকা মাইনে পেতেন। কিন্তু পাড়ার লোকেদের চাপে এতো বিপন্ন বোধ করলেন ঘটক লাগিয়ে এক মাসের মধ্যে মায়ের বিয়ে দিলেন। যে মেয়ে ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড হয় তাকে পড়াশোনা করানো উচিৎ ছিল না কি? তাকে তো জীবনে দাঁড়াতে দেওয়া উচিৎ। মা কান্নাকাটি করেছিল। দরজায় খিল দিয়ে আটকে ছিল ঘরে। কিন্তু মায়ের কাকিমারা মা-কে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিলেন। কিচ্ছু করেননি আমাদের এখানে মেয়েদের জন্য কেউ কিচ্ছু করেনি।

জ্যাঠামশাই-এর কথা...

৬০-৭০ দশকে অধ্যাপকদের মাইনে ছিল সাকুল্যে ৩০০ টাকা। এখন ভাবলে অবাক লাগে। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে আসছে। আমার জ্যাঠামশাই তুলসিদাস বসু বর্ধমান রাজ কলেজে সংস্কৃতের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। জ্যাঠামশায়ের একটি অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ এসেছিল। তাঁর সেই মহিলাকে পছন্দ হয়। তখন তিনি নবীন অধ্যাপক। কিন্তু ওই মাইনে শুনে মেয়ের বাবা বিয়ে দিতে রাজি হননা। জ্যাঠামণি আর বিয়েই করলেন না!

বাবার কথা...

তখনকার দিনে অধ্যাপকদের বেতন খুবই কম ছিল। অথচ একজন অধ্যাপক সমাজ তৈরির মূল কারিগর। আমার বাবা, বিভূতিভূষণ বসু কেন্দ্রীয় সরকারের একজন সরকারি অফিসার ছিলেন। ১৯৪২ সাল। তখন আমি জন্মাইনি। আমার দাদা-দিদিরা জন্মেছে। বাবা তখন কংগ্রেস করতেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দেন। ব্রিটিশ সরকার খবর পেয়ে বলল, তোমাকে আমরা রাখব কেন? তুমি আমাদের কর্মচারী। এখান থেকে বেতন পাও! সেকথা শোনামাত্র ব্যাগ থেকে কাগজ বের করে ইস্তফাপত্র দিয়ে চলে আসেন। বাবা তখন ৮০০ টাকা মাইনে পেতেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে এলেন। চাকরি নেই, টাকা নেই। তারপরে অনেক খোঁজাখুঁজির পরে একটা স্কুলে হেডমাস্টারের চাকরি পেলেন। বাবার তখন ১১০ টাকা মাইনে। একটা কথা সেই অবস্থাতেও কিন্তু তখনকার সমাজে শিক্ষকদের প্রতি সমাজের সব অংশের মানুষের সম্মান যা ছিল ভাবা যায় না। বাবাকে দেখলে ছাত্ররা পায়ে লুটিয়ে পড়ে প্রণাম করত। আবার তারা বাড়িতে মাঝে মাঝে পড়তে আসত। বাবা টাকা নিতেন না তাদের কাছ থেকে। বলতেন, "বিদ্যা বিক্রি করাই অন্যায়। স্কুলের মাইনে থেকে সংসারটা চলে। ওদের কাছ থেকে টাকা নেবো না।"

স্বামীর কথা...

আমি ছোটোবেলা থেকেই লিখি। আট বছর বয়স থেকে লিখি। বিয়ের পরে... লিখতাম... আর আমার স্বামী (অপরাজিত বসু) কথা বলতো পাশে বসে... আরে কি লিখছো? জানো এই হয়েছে। জানো অমুকে অমুক বলল। শোনো না আজ এই লিখলাম কাল ওই লিখলাম। এসব করত। আমি তখন বললাম, তুমি তো বিজ্ঞানের ভালো ছাত্র ছিলে। তুমি তো বিজ্ঞান নিয়ে লিখতে পারো। মানুষের কাছে বিজ্ঞানকে পৌঁছে দিতে পারো। যেটা তোমার বোধ তোমার অভিজ্ঞতা। কলম তোলো... কলম তোলো...। সেই থেকে আরও নিবিড়ভাবে লেখা শুরু করল।

আকাশভরা সূর্য-তারা...

শক্তিদা কম বয়সে বলেছিলেন আমাকে... সত্তর দশকে। তখন আমরা সব নবীন কবি। চুঁচড়োর একটা কালী মন্দিরের সামনে একটা বড় চাতাল ছিল। মাঘ মাস। শীতের দুপুরবেলা ৩টে থেকে সাহিত্য সভা আরম্ভ হয়েছে। আমাদের জুনিয়র কবিদেরও ডেকেছে। ওদিকে শক্তিদা, সুনীলদা আসছেন কলকাতা থেকে। আমি চন্দননগরে থাকতাম। উদ্যোক্তারা আমাদের ছোটদের বলেছে দুটি করে কবিতা পড়বে। তারপরে শক্তিদা আর সুনীলদা অনেকগুলো কবিতা পড়বেন। তারপর ওখানে মহসীন কলেজের একজন অধ্যাপক এসেছেন। তিনি কোনো একটা বিষয়ে আলোচনা করবেন... একটা গান হবে তারপর অনুষ্ঠান শেষ হবে। আমাকে যখন কবিতা পড়তে বলেছে। আমি তো আগে থেকেই সব জানি। সেইমতো দুটো কবিতা বলেছি। ইতিমধ্যেই কলকাতা থেকে শক্তিদারা এসে গেছেন। শক্তিদা শুনে বললেন, "আরও শুনবো আরও। সুনীল ও কিন্তু লিখতেই এসেছে, চলে যেতে আসেনি।" একজন নবীন কবির কাছে সেটা একটা বড় পাওয়া।

কবিতা ফিরে ফিরে আসে...

আসলে কীরকমভাবে লেখাগুলো আমাদের কাছে আসে। যে কোনো ঘটনা দেখার পর ভিতর থেকে উৎসারিত হয়। জীবন থেকেই এর রসদ নেওয়া। এর তো কোনো ব্যাখ্যা নেই আমাদের কাছে। একটা ঘটনার কথা বলি। সালটা সম্ভবত ১৯৮৮। একদিন আমি মফস্বলের দিকে একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরছি। সন্ধ্যের আগে শীতকাল। একটা বড় খালের ওপর দিয়ে আসছিলাম। এক জায়গায় অনেক লোক দেখি খালের নীচে ঝুঁকে কী দেখছে! আমি আমার গাড়ির চালককে জিজ্ঞাসা করলাম, কি রে ওখানে কি? সে বলল, দিদি ওখানে একটা মেয়েলোকের ডেডবডি। বললাম, সেকি রে! দাঁড়াতো দেখি। আমি গাড়ি থেকে নামলাম। দেখলাম ওখানে একটা মহিলার মৃতদেহ খালের জলে ভাসছে। ওটা ছিল নদীর মতো বেশ বড় একটা খাল। অনেকেই ঝুঁকে দেখছিল। তাদের একজন বলল, ওই কলোনীতে থাকত খুব দুঃখী মেয়েলোক ছিল গো... ওটা দেখে তারপরে ওদের সঙ্গে দু' একটা কথা বলে গাড়িতে উঠে বাড়ি চলে এলাম। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। আমি একটু চা-টা খেয়ে, পড়াশোনা করে শুয়ে পড়েছি। হঠাৎ ওই মহিলার মৃতদেহটা ভেসে ভেসে উঠছে। উঠে পড়লাম। একটা ঘোরের মধ্যে পাশের ঘরে আমার পড়ার টেবিলে এসে বসলাম। লিখলাম 'মেয়েমানুষের লাশ' -

সাঁকোর কিনারে এসে আটকে আছে লাশ,
মেয়েমানুষের লাশ;
আটকে আছে, বেরোতে পারছে না।
তার মুখ ফেরানো রয়েছে সন্তানের দিকে,
তার মুখ ফেরানো রয়েছে সংসারের দিকে,
তার মুখ ফেরানো রয়েছে পুরুষের দিকে,
প্রহারে প্রহারে তাকে পর্যুদস্ত করে গেছে যে পুরুষ
তার মুখ ফেরানো রয়েছে তার দিকে।

বোকা, অভিমানী, আদর-কাঙালী মুখ
ফেরানো রয়েছে আজও জীবনের দিকে।

সাঁকোর কিনারে এসে আটকে আছে লাশ,
মেয়েমানুষের লাশ,
আটকে আছে, বেরোতে পারছে না।

যখন লেখা শেষ করলাম উপলব্ধি করলাম আমার দু'চোখ জলে ভরে গেছে। আমি এটা খুব বিশ্বাস করি লেখাটা ভালো হবে কমিউনিকেট করবে। একটা কোনো সংযোগ সেতু থাকবে। কী লিখলাম কেউ কিচ্ছু বুঝল না, সে লেখার কোনো মানে হয় না।

প্রাণ নেই, তবু জীবনেতে বেঁচে থাকা...

একদিন আমার জ্বর হয়েছে। আমি কলেজে পড়াতে যাইনি। শুয়ে আছি। আমার কন্যাকে কাজের মাসি খাওয়াতে খাওয়াতে বকছে, "এত ভাত নষ্ট করস... দু'টা ভাতের জন্য পরের বাড়ি খাটতে এসেছি"। কথাটা আমার মর্মে গিয়ে লাগল। উঠে পড়লাম। গায়ে একটু জ্বর ছিল তখনও। আমার কাছে ব্যাগে সবসময় একটা ছোট ডায়েরী থাকে। বার করলাম। লিখলাম 'অন্নব্রহ্ম' -

সাদা ভাত জুঁই ফুল সাদা ভাত, ঘরে ঘরে ফুটে ওঠো। ঝাঁ ঝাঁ
খিদের সময়, খাক বিধবা মায়ের রোগাভোগা ছেলে। হাপুস
হুপুস খাক ধানের মাটির গন্ধমাখা চাষা। কলিঙ্গে যে মহানদী
প্রবাহের পাশে রুখা সুখা ভুখা গ্রাম আছে, তার গাঁও-বুড়াদের
মলিন দু'চোখ জুড়ে স্বপ্ন নেমে আসে, ঢেরদিন পর তাদের
শিশুরা আজ ভাতের গন্ধের মিষ্টি মেখে খেলছে উঠোনে;
আহা লক্ষ্মী এসে হেসেছেন কাঁসার থালায়! আহা ভাত, আহা
লক্ষ্মী, কে তোমাকে অস্থির চঞ্চলা বলে? শিশুর হাসির মতো
ঘরে ঘরে হেসে ওঠো মাটির সানকিতে আর এনামেল পাত্র
জুড়ে স্টিলের তৈজস ভরে পোর্সিলিন থালার ওপর, আহা
ভাত, হেসে ওঠো তুমি। এই দেশ বড় ফাঁকা, প্রতিধ্বনি উঠে
আসে এরকম ফাঁকা, তোমার হাসির ধ্বনি, প্রতিধ্বনি হয়ে ভরে
দিক রুগ্ন গ্রাম, সামন্ত সভ্যতা আর নগরজীবন। সাদা ভাত,
আহা ভাত, রক্তবীজ সৈন্যের মুদ্রায় হাজারে হাজারে এসো,
লক্ষ কোটি অযুত নিযুত ভাত ঢেকে ফেলো তৃতীয় বিশ্বের এই
কঙ্কাল-শরীর। স্তূপ হয়ে বুফে ডিনারের মতো ভারি হয়ে সেজে
ওঠো ক্ষুধার সন্মুখে। মহার্ঘ ব্যঞ্জন নেই, নেই আমিষ-প্রস্তাব,
শুধু অল্প নুন আছে শুভ্র তীব্র খিদের মতন, সুখের তাম্বুল নেই
শেষে, পাঞ্চালীর শাকান্নের মতো তুচ্ছ পবিত্র কিন্তু মহীয়ান ভাত
সেজে ওঠো বর্ষীয়সী এদেশের কোলে। এসো ভাত, অন্নব্রহ্ম
জেগে ওঠো দরিদ্র এদেশে।

'বুধসন্ধ্যা'র আসর প্রসঙ্গে...

একবার 'বুধসন্ধ্যা'-র আসর বসেছে। ঘরে একটাই মাত্র বেঞ্চের মতো ছিল। আমি একটু আগে আসাতে সেই বেঞ্চের একপাশে বসেছি। পরে পুলু মানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এসে বেঞ্চের অন্যদিকে জায়গা পেয়ে বসল। হঠাৎ পুলু শক্তিদাকে উদ্দেশ্য করে আমাকে দেখিয়ে বলল, "সাহিত্যের অগ্নিকন্যা বসে আছে আমার গায়ে আঁচ লাগছে। দয়া করে আমাকে অন্য কোথাও বসতে দিন।" এরকম রসিক ছিল। আমিও একদিন রসিকতা করে সুনীলদাকে বললাম, "বুধসন্ধ্যায় দেবো নাকি একটা চন্দ্রবিন্দু লাগিয়ে"? সবাই অবাক হলেন। আমি বললাম, "কেন বুঁদসন্ধ্যা..."। সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে...

ডটপেন ডট ইনঃ আপনাদের কয়েকজনের 'সই' নামে একটা সংগঠন ছিল না?

কৃষ্ণা বসুঃ হ্যাঁ। নবনীতাদির বাড়িতে বসতাম আমরা। সেখানে আড্ডা হতো, গান হতো, নাটক হতো... সবই তো উঠে গেল। 'সই' উঠে গেল... 'বুধসন্ধ্যা' উঠে গেল।

বিশ্বভরা প্রাণ...

একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমি বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। এবছরও ওঁরা ডেকেছিল। কিন্তু শারীরিক কারণে যেতে পারলাম না। সেবার ১৯৯৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অনুষ্ঠান হচ্ছে। তো সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর দেখছি লোকে থইথই করছে। বিরাট চত্বর। আমাকে যখন ওঁরা ডাকছেন যে ভারতবর্ষ থেকে এসেছেন কবি কৃষ্ণা বসু। আমরা তাঁর কবিতা শুনব তাঁর কথা শুনব। আমার পাশে বসেছিলেন 'ইত্তেফাক'-এর সম্পাদক। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, "কত লোক উপস্থিত আছেন এখানে?" উনি বলেন, "বেশি হইব না হাজার দশেক হইব"। আমি অবাক! দশ হাজার লোক এসেছেন ফেব্রুয়ারি মাসের সকালে সাহিত্য সভায় যোগ দিতে। কবিতা শুনতে। নিজের ভাষার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা না থাকলে এ দৃশ্য দেখা যায় না। বাংলাদেশের মানুষের সাহিত্যপ্রাণতা কবিতাপ্রাণতা অনেক বেশি। এখনও বাংলাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি তো ওরাই দিয়েছে। সম্প্রতি একটা রিপোর্টে পড়ছিলাম এবছর রাত্রি একটার সময়ও শহিদ মিনার চত্বর লোকে লোকারণ্য। উৎসবের মতো ব্যাপার।

ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান...

একসময় পয়লা বৈশাখে অনেক অনুষ্ঠানে গিয়েছি। প্রতি বছরই। এখন তো শারীরিক কারণে ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারি না। অনেক জায়গায় ডাক পড়ত... পড়তই। ওইদিন কলেজ স্ট্রিটে খুব আড্ডা হতো আমাদের। একদিন কলেজ স্ট্রিটে কফি হাউসে গিয়েছি। দেখি একটা জায়গায় টেবিলকে ঘিরে অন্তত আঠেরো-কুড়িজন বসে আছেন। সেখান থেকে একজন হাত নেড়ে আমায় ডাকছে। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি মাঝখানে বসে আছেন শামসুর রহমান। আমাকে বসতে বলল সেখানে। তার একটু পরেই দেখি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় চলে এসেছেন। তারপর সে এক অদ্ভুত আড্ডা শুরু হল। আমরা চারপাশে জুনিয়র কবিরা।

তোমার সৃষ্টি, আমার সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্টির মাঝে...

ডটপেন ডট ইনঃ কখনও কি মনে হয়েছে যে ক'দিন কবিতা আর লিখব না। কয়েকদিনের জন্য একটু ছুটি নিই...

কৃষ্ণা বসুঃ না... না... কখনই মনে হয়নি ওকথা। কবিতায় কখনও আমি ক্লান্ত নয় পরিশ্রান্ত নয় আর কখনও কবিতাকে ছেড়ে যাবার কথা ভাবতেও পারি না। কবিতা আমার সবচেয়ে পরম আশ্রয়। সবচেয়ে বড় অবলম্বন। জীবনের গভীরতম কথাকে স্বল্পতম উচ্চারণে অনন্ত ব্যঞ্জনায় ধরতে পারে কবিতা। একমাত্র কবিতাই পারে।

এখন মাঝে মাঝে তোমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে উদযাপন...

ডটপেন ডট ইনঃ কোনোদিন শুধুই গদ্য লিখতে ইচ্ছে করেনি?

কৃষ্ণা বসুঃ কখনও কখনও লিখি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রাণের আরাম পাই কবিতা লিখে। গদ্যও লিখেছি কিছু। এখনও লিখি। কিন্তু কবিতা লেখার মধ্যে যে আনন্দ তা বলে বোঝানো যাবে না।

স্মৃতি শুধুই স্মৃতি...

জানো আমার তখন বছর পনেরো বয়স জ্যোৎস্না রাত একটা কবিতা লিখতে ইচ্ছে হল। ...কিছুদিন আগে তখন নবনীতাদি বেঁচে... নবনীতাদিকে, আমাকে আর দেবারতি মিত্রকে একটা সভায় সম্বর্ধনা দিয়েছিল। যিনি সঞ্চালনা করছিলেন তিনি বললেন, আমরা শুনেছি কৃষ্ণাদির স্মৃতিশক্তি খুব ভালো। কৃষ্ণাদির কবিতা তো আমাদের প্রাণে চলে যায়। যদি একটা পুরোনো কবিতা বলেন। আমি বললাম, আচ্ছা দেখছি। আমার একটা বছর পনেরো বয়সে লেখা কবিতা তখন সবাই খুব প্রশংসা করেছিলেন। অনেকে খুব পছন্দ করেছিল। কিন্তু সেটা বলা হয়নি। এখন চেষ্টা করছি মনে করে বলার -

কে বসালো জ্যোৎস্নার পাথর তার স্বপ্নের ওপর
আর এই তীব্র সংক্রমণ যেন এর জাদুতে
ভরে যাচ্ছে অঙ্গ-প্রতঙ্গ সর্বস্ব আমার
সাপ যেভাবে ফণা তুলে দোলে
মৃদু মৃদু নেশা যেন তেমনইভাবে ভিতরে
দুলছে এক ঘোর সংক্রমণ
একি সুখ নাকি পুনর্বার নির্বাসন
বিরুদ্ধ রুটিন ভেঙে নিয়ে যাও
কে এভাবে নিয়ে যাচ্ছে আমায়
নিয়ে যাচ্ছে কোথায়
ভাঙা বাড়ি বিশাল চত্বর
জ্যোৎস্নায় মূর্ছিত স্থির বোবা মেয়ে যেন
তেমনই সম্মোহনে এই গুঁড়ো সাপ
জেগে উঠছে আবার
আবার আমার মধ্যে জন্ম নিচ্ছে গান
গানের গুঞ্জরণ রীতি
অসবদ্ধ উচ্চারণ কবিতা আমার
অসবদ্ধ যেহেতু লৌকিক সংসার
আছে ঘোর তর্জনী উঁচিয়ে
তাই এইরূপ উচ্চারণ রীতি
শিখেছি নিজের কাছে
যাবতীয় পরিহাস বাঁ পায়ে রেখেছি
ডান পায়ে দেখাচ্ছি লৌকিক খেলা
ঘোর শিশুকালে।
আর আমার হাত যা রয়েছে
অসীম শূন্যের দিকে নীলাক্রান্ত
মরণ জানে না সে
দুর্নিবার ক্রোধে সে ধরেছে
অলৌকিক লেখনীকে তার
শূন্যে ফুলের মুদ্রায় সে ভাসিয়েছে
লাবণ্য কুসুম তার হাসি
পরিহাস কতটুকু ছোঁয় তাকে
সংসারের মর্কট আঙুল তাকে
কখনও ছোঁবে না।
সে শুধু জেনেছে
জ্যোৎস্নার পাথর তার স্বপ্নের ওপর।

...দেখলাম গোটাটাই মনে আছে! আমি নিজেও একটু অবাক হয়ে যাই।

এমন মানব জমিন রইলো পতিত...

বর্তমান সময়ে বাংলাকে তো অবজ্ঞা করা হচ্ছে। বাংলা ভাষা খুবই অবজ্ঞাত খুবই অপবাদিত। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবার তারা জীবনে প্রতিষ্ঠিত, তারা বাংলা মাধ্যমে পড়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে দেখা যাচ্ছে তারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছে। বাংলা চর্চার মধ্যে না থাকায় বাংলা জানেই না তারা।

তুমি কি কেবলই ছবি...

ডটপেন ডট ইনঃ এই যে ছবি, সেটা আলোকচিত্র হোক কি পেইন্টিং সেটাও তো শিল্পের একটা মাধ্যম। কখনও কি এমন হয়েছে যে কোনো ছবি দেখে আপনি কোনো কবিতা লিখেছেন?

কৃষ্ণা বসুঃ ছবির একটা অভিজ্ঞতা ছোটবেলা থেকে আমার আছে। তার কারণ 'চাঁদের পাহাড়'-এর ছবি যিনি এঁকেছেন শ্যামল কৃষ্ণ বসু তিনি আমার বড়দাদা। আর আমার ছোটবেলায় আমাদের চন্দননগরের বাড়িতে সত্যজিৎ রায় এসেছিলেন। উনি এলেন, গল্প করলেন, দুপুরে খাওয়া দাওয়া করলেন। শীতকাল ছিল। শেষ দুপুরে বিকেলের দিকে চন্দননগরের গঙ্গার ধারটা অসাধারণ সুন্দর... স্ট্রান্ড আছে বাঁধানো... বেঞ্চ আছে বসার। সেখানে গেলেন। আমরাও ছোটরাও ওঁনার সঙ্গে সঙ্গে গেলাম। দাদা ছবি আঁকতেন বলে আর্টিস্টরাও আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমরা চন্দননগর থেকে ছবির এগজিবিশন দেখতে কলকাতায় 'অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস'-এ চলে আসতাম। এই যে ছবির প্রতি আমাদের একটা আনুগত্য একটা আকর্ষণ ছবি যে শিল্পের একটা অন্যতম বড় মাধ্যম সেটা আমি খুবই বিশ্বাস করি।

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় (Frankfurt Book Fair) আমাকে ডেকেছিল রবীন্দ্রনাথের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আলোচনার জন্য। আর কবিতা পড়ার জন্য। আমার স্বামীও গিয়েছিলেন সঙ্গে। সেখানে এক অসাধারণ বইমেলা দেখলাম। আমাদের কলকাতা বইমেলা তো বড়, তার অন্তত চারগুণ বড় হবে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা। সেখানে অসংখ্য লোক বসে আছে। আমাকে মঞ্চে ডেকেছে। আমি প্রধান বক্তা। তারপর কবিতা পড়লাম। তারপরে ওরা আমাকে ক্লদে মনে (Claude Monet)-র আঁকা একটা বাঁধানো ছবি উপহার দিল। যেটা আমি আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছি। ছবি কথা বলে। ছবির সবচেয়ে বড় গুণ হল ছবির আন্তর্জাতিক ভাষা। অনুবাদের দরকার হয় না। আমার কবিতাটা অনুবাদ না হলে অন্য ভাষার লোক বুঝবে না। ছবির ক্ষেত্রে কিন্তু তা নয়। অনেক শিল্পী আছেন যাঁরা কবিতা পড়ে ছবি এঁকে দিতে পারেন। আবার তেমনি অনেক কবিও আছেন যাঁরা একটা ছবি দেখে কবিতা লিখে দিতে পারেন। ছবি আর কবিতা পরস্পরের পরিপূরক।

দাঁড়াবার মতো চাই যেভাবে দাঁড়ায় মানুষেরা...

একবার আমাদের কালিন্দীর বাড়িতে শঙ্খ ঘোষ এসেছিলেন। ওঁনার নিকটাত্মীয়দের অনেকেই এখানে থাকেন। সেখানেই এসেছিলেন। বললেন, "ফেরার পথে একবার দেখা করতে এলাম"। আমি তো ওঁনাকে ঘরে বসতে অনুরোধ করলাম। তৎক্ষণাৎ উনি বললেন, "চলো বাইরে বারান্দায় গিয়ে বসি"। সেখানে বসে উনি আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা কথা বলেছিলেন, যেটা আজও আমার কানে বাজে। উনি বললেন, "কৃষ্ণা ওটা অন্তর্বিশ্ব আর এটা বহির্বিশ্ব। মন খুলে কথা বলা যাবে"। সবসময়ই প্রকৃতির মাঝে খোলা হওয়ায় থাকতে পছন্দ করতেন।

সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ...

সেদিন পবিত্র সরকার বলছেন যে, কৃষ্ণা তুই তো বাংলা ভাষার একজন অন্যতম প্রধান কবি। আমরা সবাই মান্য করি স্নেহ করি। অনেক কবিতা পড়েছিস অনেক অনুষ্ঠানে গেছিস। এখন এরকম বিপদ হয়েছে, মেরুদণ্ডের হাড় ছ' জায়গায় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে... প্লেট বসানো হয়েছে। তুই এখন কিছুদিন বেরোস না। ঘরে বসে কবিতা লেখ আর টেলিফোনে যোগাযোগ কর।

জানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান...

ডটপেন ডট ইনঃ এখনকার প্রজন্মের নবীন কবি সাহিত্যিকদের প্রতি কোনো বার্তা দেবেন কি?

কৃষ্ণা বসুঃ বাঙালি সাহিত্যপ্রাণ জাতি। তরুণ কবিরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে লিখতে এসেছে। তারা লিখছে পত্র-পত্রিকায় ছাপছে। সাহিত্য সভায় যোগ দিচ্ছে। তাদের সম্বন্ধে শুধু আমার একটাই কথা - লেখাটা যেন মনের ভিতর থেকে উৎসারিত হয় আর লেখার যে ছন্দগত বা আঙ্গিকগত দক্ষতা সেটাকে অর্জন করতে হবে, শিখে নিতে হবে। এটা কিন্তু অনেক সময় তরুণ কবিরা জানে না। বাংলায় যে প্রধান কয়েকটা ছন্দ, অক্ষরবৃত্ত, বিভিন্ন ধরণের মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত মানে ছড়ার ছন্দ। তাছাড়া গদ্যছন্দ। পয়ার... এটা অবশ্য অক্ষরবৃত্তর মধ্যেই পড়ে। তো এই এতরকমের ছন্দের যে বৈচিত্র সেটা অনেক সময় দেখি তরুণ কবিরা জানে না বা জানবার সুযোগ পায় না। এগুলো তাদের শিখে নিতে হবে। স্বশিক্ষিত মানুষ মাত্রই সুশিক্ষিত। নিজেকে শিখতে হবে।

ডটপেন ডট ইনঃ আমাদের সময় দেবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি সুস্থ থাকুন... আমাদের আরও কবিতা ও লেখা উপহার দিন। নববর্ষ ভালো কাটুক আপনার।

কৃষ্ণা বসুঃ ধন্যবাদ তোমাদেরও... সবাই মিলে বেশ আড্ডা হল। 'ডটপেন ডট ইন'-এর উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি। নববর্ষ ভালো কাটুক সবার।

চিত্রঋণঃ নিজস্ব ও অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।