সংস্কৃতি ও বিনোদন


  • গুয়াহাটিতে গণশিল্পী দিলীপ শর্মা জন্মশতবর্ষ সমাপনী অনুষ্ঠান

কমলেশ গুপ্ত

অসমিয়া আধুনিক সংগীতের পুরোধা, ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অন্যতম সংগঠক, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা-বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা-হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সান্নিধ্যধন্য, রবীন্দ্রসংগীত এবং জ্যোতিসংগীতের একনিষ্ঠ সাধক গণশিল্পী দিলীপ শর্মার জন্মশতবর্ষ সমাপনী উৎসব গত ১৪ জুন গুয়াহাটির প্রাগজ্যোতি সাংস্কৃতিক প্রকল্পের প্রেক্ষাগৃহে সারাদিনব্যাপী সাংস্কৃতিক সমারোহের মাধ্যমে পালিত হয়েছে। এই উপলক্ষে একটি সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সরকারি প্রশাসনের বাধাদানের ফলে তা বাতিল করতে হয়। প্রশাসনের এই কাজের প্রতিবাদ জানায় বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং সংগঠন। অসমের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গণনাট্য সংঘের সাংস্কৃতিক কর্মীরা নিজনিজ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মসূচি সমবেত বিশাল দর্শকমণ্ডলীর সামনে উপস্থাপন করেন এবং সেগুলি প্রশংসিত হয়েছে।এই সাংস্কৃতিক সমারোহকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে গণনাট্য সংঘ পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। সমাপ্তি উৎসবের আগে দিলীপ শর্মা জন্মশতবর্ষ রাজ্যজুড়ে পালনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল।

সেই কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবে ১৪ জুন, ২০২৫ গুয়াহাটির বিবেকানন্দ কেন্দ্রে একটি আলচনাসভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেটা ছিল শতবর্ষ উদ্‌যাপনের শুভারম্ভ। অনুষ্ঠান উদ্‌বোধন করেছিলেন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ডঃ হীরেন গোহাঁই। মূল বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন গণনাট্য সংঘের সংগঠক বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার। অনুষ্ঠানে গণনাট্য সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন মনোগ্রাহী সাংস্কৃতিক কর্মসূচি পরিবেশন করেছিলেন।

তারপর থেকে গুয়াহাটির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন সহ গণনাট্যের শাখাগুলো বছরের বিভিন্ন সময়ে রাজ্যের নানা স্থানে দিলীপ শর্মার গানের কর্মশালা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনাসভা প্রভৃতি আয়োজন করে। এরমধ্য দিয়ে জন্মশতবর্ষে দিলীপ শর্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি তাঁর শিল্পীসত্তা ও কর্মরাজির অবলোকন এবং চর্চা করা হয়।

দিলীপ শর্মার জন্ম ১৯২৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর অসমের পাঠশালার বামুনকুছি গ্রামে। পিতা ডাঃ দীননাথ শর্মা পেশায় একজন চিকিৎসক হয়েও ছিলেন অসমের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। কলকাতা থেকে প্রকাশিত কালজয়ী 'আবাহন' সাহিত্য পত্ৰিকার তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাপক এবং সম্পাদক। কর্মসূত্রে তাঁকে কলকাতায় বাস করতে হয়েছিল। দিলীপ শর্মার জন্মের কিছু দিন পর থেকেই তিনি সপরিবারে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। দিলীপ শর্মার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় কলকাতার সাউথ সাবার্বান স্কুলে।সেখান থেকে ১৯৪২ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভরতি হন। ছোটোবেলা থেকেই তাঁর সংগীতের প্রতি ছিল বিশেষ আগ্রহ। পিতা এটা লক্ষ করে তাঁর সংগীত শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। সময়টা ছিল বিয়াল্লিশের গণআন্দোলনের জোয়ারের সময়। দিলীপ শৰ্মার কৈশোর-যৌবনের সূচনাপর্ব অতিবাহিত হয়েছে স্বাধীনতার সংগ্রামের উত্তাল জোয়ারের মাঝে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের উদ্‌বেগজনক সময়ে। সে বছরই অর্থাৎ ১৯৪২ সালে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে আধঘণ্টার একটি অসমিয়া অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। ফলে প্রবাসী অসমিয়া কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবার সুযোগ পান। ওই অনুষ্ঠানে প্রথম অসমিয়া গান গেয়েছিলেন বেলা মুখোপাধ্যায় (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী)। তাঁর গাওয়া গান দু'টি শিখিয়েছিলেন দিলীপ শর্মা। দ্বিতীয় শিল্পী ছিলেন দিলীপ শর্মা। তিনিই ছিলেন আকাশবাণীর অনুষ্ঠানের প্রথম অসমিয়া শিল্পী। অনুষ্ঠানে দিলীপ শর্মা দুটি জ্যোতিসংগীত পরিবেশন করেন। জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা তখন কলকাতায় আত্মগোপনে রয়েছেন। তাঁকে দিয়ে দুটি গান লিখিয়ে সুর করিয়ে পরিবেশন করেছিলেন।১৯৪২ সালেই এইচএমভি তাঁর গানের প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশ করে।১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয়,৪৬ সালে তৃতীয়,৪৭ সালে চতুর্থ রেকর্ড প্রকাশিত হয়। কলকাতায় থাকার সময় তিনি অসমিয়া সাহিত্য ও সংস্কৃতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা, লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া, পুরুষোত্তম দাস, পদ্মনাথ গোহাঁঞিবরুয়া, বিরিঞ্চি কুমার বরুয়া, লক্ষ্মীনাথ শর্মা, হলিরাম ডেকা, অমূল্য বরুয়া,আনন্দিরাম দাস, ভবানন্দ দত্ত, প্রফুল্ল গোস্বামী প্রমুখের সংস্পর্শে এসেছিলেন। কলকাতায় অধ্যয়নকালে তিনি বাংলার সংগীত ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সাথে অতি গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন ঠিকই, কিন্তু অসমিয়া সংস্কৃতির গভীরতাও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

জ্যোতিপ্রসাদ তাঁর প্রতিভার পরিচয় পেয়ে ১৯৪৯ সালে তাঁর সৃষ্ট প্রথম অসমিয়া চলচ্চিত্র 'জয়মতী'তে দিলীপ শর্মাকে সহকারী সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং নেপথ্যে গান গাওয়ার দায়িত্ব দেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বোন আরতি শর্মা এবং সহধর্মিনী সুদক্ষিণা শর্মার সঙ্গে অসংখ্য অসমিয়া আধুনিক ও রোমান্টিক গান রেকর্ড করেছিলেন। সেই গানগুলো ষাটের দশকে অসমিয়া সংগীত জগতে নতুন জোয়ার এনেছিল। ডঃ ভূপেন হাজারিকার বোন এবং দিলীপ শর্মার সহধর্মিনী সুদক্ষিণা শর্মা ছিলেন তাঁর সংগীতজীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাঁরা একসাথে সংগীত নাটক আকাডেমি পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।

১৯৫০ সালে দিলীপ শর্মা কলকাতা থেকে গুয়াহাটিতে ফেরার পর ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। গণনাট্যের আদর্শ, দর্শন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে গভীরভাবে উদ্‌বুদ্ধ করেছিল। জীবনের অন্তিম দিন পর্যন্ত তিনি গণনাট্যের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।১৯৫৩ সালে মুম্বাই শহরে অনুষ্ঠিত গণনাট্য সংঘের সর্বভারতীয় সম্মেলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাস,নগেন কাকতি এবং দিলীপ শর্মা সর্বভারতীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।১৯৫৫ এবং ১৯৫৯ সালে গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত গণনাট্যের রাজ্য সম্মেলনে তিনি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাথে সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। প্রচণ্ড আর্থিক অনটনের মধ্যেও দিলীপ শর্মা অসমের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটেছেন গণনাট্যের সাংগঠনিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ছড়িয়ে দেবার লক্ষ্যে। শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে গান গেয়ে কেবলমাত্র দেশের মাটিতেই নয় – চীন, পোল্যান্ড প্রভৃতি বিদেশের মাটিতেও সমাদৃত হয়েছিলেন তিনি। এসবের মূলে ছিল তাঁর নিরহংকার স্বভাব, সস্তা চমক এবং গ্ল্যামারের মোহ থেকে নিজেকে দূরে রেখে জনতার একজন হিসেবে এবং প্রকৃত দায়বদ্ধতা নিয়ে মানুষের পক্ষে গান গাওয়ার আন্তরিক আগ্রহ।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রবীন্দ্রসংগীতের প্রণালীবদ্ধ চর্চা, প্রচার ও প্রসারে দিলীপ শর্মার ছিল বিশাল অবদান। অসমিয়া ভাষায় রবীন্দ্রসংগীতের অনুবাদ অসমের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে করানো এবং সেগুলো গাওয়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে।একইভাবে জ্যোতিসংগীতের বিশুদ্ধ চর্চাতেও তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে। অসম সরকারের সাংস্কৃতিক অধিদপ্তরের দুটি খণ্ডে প্রকাশিত জ্যোতিসংগীতের স্বরলিপি রচনা করার বিশেষজ্ঞ সমিতির অন্যতম সদস্য হিসাবেও তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি পারিবারিক সূত্রে 'আবাহন' পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়া পত্রিকাটি গুয়াহাটি থেকে পুনঃ প্রকাশ এবং সম্পাদনার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। এছাড়াও তিনি চিত্রবন,প্রবাহ প্রভৃতি কয়েকটি সাময়িকীর প্রকাশনার সাথেও যুক্ত ছিলেন।

দিলীপ শর্মা ছিলেন আদর্শে অবিচল, নির্ভীক,অতি সাহসী প্রকৃতির একজন বিপ্লবী শিল্পী। অসম আন্দোলনের সময় যখন গণতন্ত্র বা যুক্তির পরিবর্তে উগ্রজাতীয়তাবাদী আবেগ আন্দোলনকারী একাংশকে আচ্ছন্ন করেছিল, তখন বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মীরা যেমন আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেই দলে দিলীপ শর্মা – সুদক্ষিণা শর্মাও ছিলেন। তাঁদেরও গান গাওয়া বন্ধের ফরমান জারি হয়েছিল। তাঁদের বিহুর অনুষ্ঠানে বয়কট করা হয়েছিল। তথাপিও তিনি আদর্শ চ্যুত হননি। আদর্শে অবিচল থাকার ফলেই পরবর্তী সময়ে তাঁকে বর্জন করা মানুষেরাই আবার তাঁর গানকে মন থেকে গ্রহণ করেছিলেন।

সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার-অন্ধবিশ্বাস জনগণের মুক্তি আন্দোলনের প্রধান বাধা, সেকথা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তাই ইলোরা বিজ্ঞান মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কুসংস্কার বিরোধী আন্দোলনের শরিক হয়েছিলেন।

একইভাবে ধর্মান্ধতা,উগ্র জাতীয়তাবাদ,উগ্র নৃ-গোষ্ঠীবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং ফ্যাসিবাদী প্রবণতাগুলোর তীব্র বিরোধিতা করেছেন সারা জীবন। এই দায়বদ্ধতা, সমাজচেতনা এবং বস্তুনিষ্ঠ একাগ্রতা দিলীপ শর্মাকে অনন্য গণশিল্পী করে তুলেছিল। দিলীপ শর্মার বিশাল জীবনবীক্ষার সামগ্রিক আলোচনা সীমিত পরিসরে সম্ভব নয়। তথাপি এই প্রতিবেদনে তার যৎসামান্য উল্লেখ করে জন্মশতবর্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদিত হলো।

পরিচিতি: নিবন্ধকার। অসমিয়াতেও ‌লেখেন। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মী। নিবাস: গুয়াহাটি, অসম।