খেলাধুলো

  • খেলোয়াড়ি মানসিকতায় সংগীতের প্রভাব

ডঃ তমোঘ্নী মান্না

সবেমাত্র শেষ হয়েছে প্যারিস অলিম্পিক, ২০২৪। ভারতের ঝুলিতে এবারে সোনা এলো না। চূড়ান্ত সফলতার শেষ প্রান্তে এসেও অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এর জন্য কি শুধু দায়ী শারীরিক সক্ষমতা, না মানসিকতার জোর? ক্রীড়াবিজ্ঞানীর একজন গবেষক এবং স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার (SAI) একজন প্রাক্তন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে ব্যাপারটি আমাকে খুবই ভাবিয়ে তুলেছে।

খেলাধুলায় আমরা খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতার দিকে যতটা জোর দিয়ে থাকি, সে তুলনায় কমই দেখা হয় তাদের মানসিক দৃঢ়তার দিকটি। চাপমুক্ত সুস্থ মানসিকতার ওপর খেলাধুলার সাফল্য যে অনেকটাই নির্ভর করে তা সকলেরই জানা। দেখা যাক সংগীত এখানে কীভাবে কাজ করতে পারে।

সংগীত এবং আবেগ

২০০৫ সাল নাগাদ Beedie, Terry এবং Lane তাঁদের গবেষণায় দেখালেন, সংগীত খেলোয়াড়দের সাইকোমোটর উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। যেমন খুব দ্রুতলয়ে উচ্চস্বরের সংগীত খেলোয়াড়ের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয়ভাবে উদ্দীপ্ত করে। এর প্রভাবে হৃদস্পন্দন রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রা, পেশীর টান বেড়ে যায়। অন্যদিকে, মৃদু ধীর সংগীতে এর বিপরীত প্রভাব হতে দেখা গেছে। ভালোলাগার একটা গান শোনার মাধ্যমে খেলাধুলার ট্রেনিংয়ের সময় ইতিবাচক মানসিক প্রতিক্রিয়া জাগানো যেতে পারে।
 
সঙ্গীত এবং শারীরবৃত্তীয় কার্যকারিতা

সঙ্গীতের মতো সংবেদনশীল উদ্দীপনা শারীরিক পরিশ্রমের সাথে যুক্ত; যা শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়ার সংকেতকে বাধা দিতে পারে (রেজেস্কি, ১৯৮৫)। ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাফি (EEG) ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক কাজে দেখা গেছে যে সঙ্গীত মস্তিষ্কের সম্মুখ, কেন্দ্রীয়, প্যারিটাল এবং অক্সিপিটাল অঞ্চলে থিটা তরঙ্গ (4–7 Hz) কমাতে কার্যকর (Bigliassi প্রমূখ, ২০১৬)। এই প্রক্রিয়াটি ক্লান্তি-সম্পর্কিত লক্ষণগুলির দমনের সাথে সরাসরি যুক্ত। গবেষনায় দেখা গেছে যে, সঙ্গীত শারীরিক ক্রিয়াকলাপের সময় অক্সিজেন ব্যবহারে কিছুটা সুবিধা দিতে পারে। অর্থাৎ, কার্ডিওভাসকুলার এবং শ্বাসযন্ত্রের কার্যকারিতার উপর সঙ্গীতের উপকারী প্রভাব প্রমাণিত। দেখা গেছে, আনন্দদায়ক সঙ্গীত শোনার পরে রক্ত প্রবাহের কার্যকারিতা ২৬% বাড়ে; কিন্তু উদ্বেগ-প্ররোচিত সঙ্গীত শোনার পর তা ৬% কমে যায়। প্রাথমিকভাবে সঙ্গীতের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সবকিছু নির্ভরশীল।

এর একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা হল যে, সঙ্গীতের ছন্দময় উপাদানগুলো ব্যায়ামের সময় শারীরিক নড়াচড়ার বায়োমেকানিকাল বা নিউরোমেকানিক্যাল দক্ষতা বাড়ায় (বেকন, ২০১২)। উদাহরণস্বরূপ, সঙ্গীতের সাথে সময় মতো দৌড়ানো, স্ট্রাইড প্যাটার্নগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। যার অর্থ, আন্দোলনের ধরণগুলোতে কম মাইক্রো-অ্যাডজাস্টমেন্টের প্রয়োজন হয়, যার ফলে কাজের চাপের জন্য শক্তির খরচ কিছুটা কমে যায়। এই ধরনের প্রভাবগুলো, মাত্রায় যতই ছোট হোক না কেন, যৌক্তিকভাবে উন্নত শারীরিক কর্মক্ষমতাতে অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী, ছন্দময় এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে; যেমন, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো এবং সাঁতারে।

খেলোয়াড়দের শারীরিক এবং মানসিকভাবে চাঙ্গা করতে, ঠিকঠাক গান বা বাজনার নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। খেলার আগে তাই নিজের দেশের জাতীয় সঙ্গীতে অনুপ্রাণিত ও আবেগতাড়িত হন খেলোয়াড়রা; সেই সঙ্গে আমরা দর্শক ও সমর্থকরাও।

[লেখিকা একজন ক্রীড়া বিজ্ঞানী।]

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।